সাইমুম ৬৫ – শান্তির দ্বীপে সংঘাত – আবুল আসাদ
প্রকাশক – তৌহিদুর রহমান
পরিচালক, বাংলা সাহিত্য পরিষদ ৫৬ সোনালিবাগ, মগবাজার,
প্রথম প্রকাশ – জুলাই ২০২৪
প্রচ্ছদ – এ তাসনিম রহমান
.
ফ্ল্যাপের লেখা
প্রেসিডেন্ট ডিওডোন ডেভিনের মেয়ে সারাসোনিয়ার জেরার মুখে পড়ল আহমদ মুসা। কেন তিনি শুধু মুসলমানদের স্বার্থে কাজ করেন?
আহমদ মুসা বলল, ‘বিশ্বের মুসলমানদের পাশে আমাকে বেশি দেখা যাবার কারণ, গোটা দুনিয়ায় মুসলমানরাই আজ বেশি নির্যাতিত। মুসলমানরা আজ দুনিয়ায় শতরকম নির্যাতনের শিকার। এমনকি জাতিসংঘ তাদের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করে। পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের সশস্ত্র খ্রিস্টান মুক্তিকামীদের বলা হয় স্বাধীনতা যোদ্ধা, কিন্তু ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরের মুক্তিকামীরা সন্ত্রাসী। বিশ্বে আজ মুসলমানরা অসহায় মজলুম। তাইতাদের পাশে আমাকে বেশি দেখা যাবারই কথা। কিন্তু হিসাব করলে দেখা যাবে আমার সাধ্য ও সুযোগ অনুসারে আমি অমুসলিমদের জন্যে যা করেছি এবং মুসলিমদের জন্যে যা করেছি তার একটার চেয়ে অন্যটা খুব কম কিছু নয়। আসল কথা হলো, আমি মানুষের পরিচয়ের চেয়ে কেজালেম আর কে মজলুম- এটাই বড় করে দেখেছি। আমার ধর্মের এটাই শিক্ষা।’……
আহমদ মুসার পরশে লোহাও যে খাঁটি সোনায়পরিণত হয় তা আবার প্রমাণিত হলো।…
আহমদ মুসাকে নিষ্ক্রিয় রেখে মাত্র কয়েকজন সন্ত্রাসী রুখে দিল দিল অন্য আরেক দল ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীকে। ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষা পেল আহমদ মুসাসহ ইদি আসুমানি মোহাম্মদের গোটা পরিবার। কিন্তু কেন, কীভাবে?… এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা প্রবাহ সামনে নিয়ে হাজির হলো ‘শান্তির দ্বীপে সংঘাত’।
.
এই বইয়ের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র সম্পূর্ণ কাল্পনিক। জীবিত অথবা মৃত কোন ব্যক্তি বা ঘটনার সাথে এর কোন প্রকার সম্পর্ক নেই। -লেখক
Book Content👉
শান্তির দ্বীপে সংঘাত – ১
১
বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট ডিওডোন ডেভিন ইউভান অফিসের জন্যে তৈরি হয়ে এসে বসল তার স্টাডি কাম কম্যুনিকেশন কক্ষে।
সোফায় একটু গা এলিয়ে দিল। চোখ দুটিও তার বুজে এলো। তার গম্ভীর মুখে কিছুটা দুশ্চিন্তার ছাপ।
তার চিন্তা বুরুন্ডির ঘটনা প্রবাহ নিয়ে। রাজধানী বুজুমবুরায় কি ঘটছে, সেটা তার কাছে আর খুব অস্পষ্ট নয়। কিন্তু সব সংবাদ আন্তর্জাতিক প্রেসে গেল কি করে?
বাতিস্তা সান্ড্রি, স্টিফেন ফোবিয়ান, কলিন ক্রিস্টোফাররা এত পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক এই প্রেসগুলোর মুখ তারা বন্ধ করতে পারল না কেন?
ভাবনায় ডুবে গেছে প্রেসিডেন্ট ডিওডোন ডেভিন।
ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করল তার মেয়ে সারা সোনিয়া। বাবার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘বাবা, তুমি নিশ্চয় ঘুমাওনি?’
তার বাবা প্রেসিডেন্ট ডিওডোন ডেভিন ধীরে ধীরে চোখ খুলল। বলল, ‘না মা ঘুমাইনি।’ বলে প্রেসিডেন্ট সোফায় সোজা হয়ে বসল।
‘বসবো বাবা? নাকি তুমি রেস্ট নিচ্ছ?’ বলল মেয়ে সারা সোনিয়া।
সারা সোনিয়া প্রেসিডেন্টের একমাত্র মেয়ে। তিন ছেলের পর প্রেসিডেন্ট দম্পতি পেয়েছে সারা সোনিয়াকে। বাবা, মা ও ভাইদের চোখের মণি সে। চোখের মণি হলেও চোখের মণির মতো সে কালো নয়। সে তার মায়ের চেহারা পেয়েছে। তার মা জার্মান। জার্মানিতে পড়ার সময় তার বাবার সাথে তার মায়ের বিয়ে হয়। সারা সোনিয়া বুজুমবুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেবার পর এখন পিএইচডি করছেন জার্মানিতে।
‘না মা, আমি রেস্ট নিচ্ছি না। আমি প্রোটোকলের অপেক্ষা করছি। বসো মা।’ বললো প্রেসিডেন্ট
বসলো সারা সোনিয়া সামনের এক সোফায়। বলল, ‘বাবা, সকাল থেকে তুমি খুব টেনশনে আছো বলে মনে হচ্ছে। বুরুন্ডি সম্পর্কে যে খবর বেরিয়েছে, যে খবর ব্রডকাস্ট হয়েছে, সেটাই কি কারণ বাবা?’
‘হ্যাঁ মা। নিউজের ব্লেমটা সরাসরি সরকারের ঘাড়েই এসে পড়ে।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘না বাবা, ব্লেমটা সরাসরি খ্রিস্টান সংগঠনগুলোর উপর পড়ে। পোপ ভিক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা তাদেরই হাতে।’ সারা সোনিয়া বলল।
‘তা ঠিক মা। কিন্তু এসব দেখা, প্রতিবিধানের দায়িত্ব তো সরকারের। বলল প্রেসিডেন্ট।
‘সরকার এর প্রতিবিধান করেনি কেন? তোমরা কি জানতে না বাবা?’ সারা সোনিয়া বলল।
‘আসলেই এ ব্যাপারে আমরা একদম অন্ধকারে ছিলাম। মাত্র এক দিন আগে আমরা কিছুটা জানতে পারি। আজ মিডিয়ার মাধ্যমে সবটাই জানলাম।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘মাত্র একদিন আগে কী করে জানতে পারলে? আরো আগে জানতে পারলে না কেন? আর প্রেসই বা সব কথা কিভাবে জানতে পারল?’ সারা সোনিয়া বলল।
‘সে আর এক কাহিনী মা। আমাদের বুজুমবুরায় একজন লোক এসেছে। সে আসার পরই খ্রিস্টান সন্ত্রাসী সংগঠনের অর্জনের সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। পঞ্চাশেরও বেশি সন্ত্রাসী এ পর্যন্ত লোকটির হাতে মারা গেছে। মারা যাওয়া লোকেরা যে সন্ত্রাসী এবং তারা যে গোপন একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী দলের সদস্য সেটা আমরা লোকটির মাধ্যমে জানতে পারি।
বলে প্রেসিডেন্ট এ পর্যন্ত যা ঘটে গেছে তার একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিল মেয়েকে।
‘লোকটির নাম কি বাবা? নিশ্চয় অসাধারণ কেউ সে হবে।’ সারা সোনিয়া বলল।
‘তার নাম সে প্রকাশ করতে চায় না। তার নাম শুধু আমিই জানি। দ্বিতীয় লোক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছি। আমি জেনেছিলাম আমেরিকা ও চীনের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে। তারা লোকটিকে সহযোগিতা করার জন্য আমাকে অনুরোধ করেছিল। এখন দেখছি, সন্ত্রাসীরাও তাকে চেনে এবং নাম জানে। বলল প্রেসিডেন্ট।
‘আমেরিকা ও চীনের প্রেসিডেন্ট তোমাকে অনুরোধ করেছিল লোকটিকে সহযোগিতা করার জন্য। সাংঘাতিক ব্যাপার! লোকটি কে? বলো বাবা। বলতেই হবে?’
‘লোকটি তার নাম বলেছিল ‘আবু আব্দুল্লাহ’। তার পাসপোর্টেও এটাই লিখা। কিন্তু তার আসল নাম ‘আহমদ মুসা। বলল প্রেসিডেন্ট।
‘আহমদ মুসা’ চাপা উচ্চস্বরে নামটার দ্বিরুক্তি করল সারা সোনিয়া। বলেই দুহাতে মুখ ঢাকল সারা সোনিয়া তার উচ্ছ্বাস আড়াল করার জন্যে।
কয়েক মুহূর্ত। মুখ খুলল সারা সোনিয়া দু’হাতের আড়াল থেকে।
বিস্ময়, আনন্দ উপচে পড়ছে যেন তার মুখ থেকে।
‘বাবা আমি বিস্মিত হচ্ছি আহমদ মুসা আমাদের বুরুন্ডিতে, আমাদের বুজুমবুরায়! ব্যাপারটা অনেকটা আকাশের চাঁদ মাটিতে নেমে আসার মতো! বাবা, সেই সাথে আমার বিরাট আনন্দ লাগছে, তাকে চাক্ষুষ দেখার আমার বহুদিনের ইচ্ছা এবার পূরণ হতে পারে।’ সারা সোনিয়া বলল।
‘মা, তুমি কিভাবে চেনো তাকে?’ জিজ্ঞাসা প্রেসিডেন্টের।
‘বাবা, তাকে চেনার মতো ভাগ্য আমাদের নয়। পত্র-পত্রিকা ম্যাগাজিন ও ইন্টারনেট ঘেঁটে আমি তাকে জানি মাত্র। জানা থেকেই দেখার আগ্রহ। যিনি পরোপকারে হাতেম তাই, বীরত্বে রবিন হুড, তীক্ষ্ণবুদ্ধিতে শার্লকদের বহু যোজন পেছনে ফেলেছেন, সেই কিংবদন্তীকে দেখার ইচ্ছা কার হবে না, বাবা?’ বলল সারা সোনিয়া।
‘ঠিক বলেছ মা। আমরাও এমনটাই শুনেছি। গত কয়েকদিনে বুজুমবুরায় তিনি যা ঘটিয়েছেন, তার কোনো তুলনা নেই। কিন্তু তার দেখা পাওয়া ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল। তিনি কোথায় থাকেন, আমাদের কেউ তা জানে না। তিনি টেলিফোনে যোগাযোগ করেন, প্রয়োজন হলে দেখাও করেন। কিন্তু আমরা চাইলে দেখাও করতে পারি না, যোগাযোগও করতে পারি না।’ প্রেসিডেন্ট বলল।
‘কেন, টেলিফোনের সূত্র ধরে তার লোকেশন তো সরকার বের করতে পারে।’ বলল সোনিয়া
‘তার টেলিফোনের কোনো নাম্বার নেই মা।’ প্রেসিডেন্ট বলল। ‘এটাই হবার কথা বাবা। তার সবই অসাধারণ। তবে বুরুন্ডিকে নিয়ে যে নিউজ আইটেম ব্রডকাস্ট হলো, রিপোর্ট প্রকাশ পেল, সে বিষয় নিয়ে তার সাথে তোমার সরকারের অবশ্যই কথা হবে, দেখা হবে। তোমার সাথেও দেখা হতে পারে। এরই মধ্যে কোনোভাবে তার সাক্ষাৎ আমি পাই কিনা, সেটা তোমাকে দেখতে হবে বাবা। তাকে মাত্র তিনটি প্রশ্ন করার এবং উত্তর পাবার সময়টুকু আমি তার কাছ থেকে নিতে চাই।’ বলল সারা সোনিয়া।
‘ঠিক আছে। দেখব মা।’ প্রেসিডেন্ট বলল।
‘আরেকটা কথা বাবা, এই একটা খ্রিস্টান গ্রুপের অপকর্ম নিয়ে তোমরা কী ভাবছ? কী করতে চাচ্ছো তোমরা?’ সারা সোনিয়া বলল।
‘মা, ব্ল্যাক ক্রস নামের গোপন সংগঠনটি খ্রিস্টান নাম ভাঙিয়ে গোটা দুনিয়ায় কাজ করছে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্যে। ওদের শেকড় খুব গভীরে। পশ্চিমা অনেক প্রভাবশালী সরকারের সাথে তাদের গোপন সম্পর্ক রয়েছে। সরকারগুলো তাদের পক্ষে এমনকি অর্থনৈতিক, সামরিক চাপ প্রয়োগ করতে পারে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের করার তেমন কিছু নেই। দুনিয়ার মানবাধিকার সংস্থাগুলো সোচ্চার হয়েছে। দেখা যাক কি হয়। আমাদের দেশের যারা, তাদের বিরুদ্ধে কিছু আমরা করতে পারি।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘বাবা, তোমরা একটা সুযোগ পেয়েছ, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তুমি অনেক কিছুই করতে পার। এ ধরনের সুযোগ বার বার আসে না।’ সারা সোনিয়া বলল।
‘তা ঠিক মা। দেখি মন্ত্রীসভার বৈঠক ডেকেছি দুপুর দুটায়। তার আগে আমি প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বসব। যাই করি, সবার সাথে পরামর্শ করেই করতে হবে মা।’
বলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল প্রেসিডেন্ট ডিওডোন ডেভিন
উঠে দাঁড়াল সারা সোনিয়াও। বলল, ‘বাবা, চিন্তা করো না।’
‘এ পর্যন্ত আহমদ মুসা কোথাও হারেনি। যে দেশে পা দিয়েছে, সেখানেই পরিবর্তন এসেছে। আমি আশা করি বাবা আমাদের বুরুন্ডিতেও সে জয়ী হবে। সে জয়ী হওয়া মানে বুরুন্ডি জয়ী হওয়া।’
প্রেসিডেন্ট হাসল। বলল, ‘বাবাকে সাহস দেবার জন্যে যা বলছ তা যদি সত্য হয়, তাহলে আমাদের ধর্মের বিস্তার যে বন্ধ হবে মা। সেটা ভেবেছ?’
‘ষড়যন্ত্র করে, সন্ত্রাস করে ধর্মের বিস্তার ঘটাতে হবে! যে ধর্ম এতটা অসহায়, বলতে হবে তার গ্রহণযোগ্যতার দিন শেষ বাবা।’ বলল সারা সোনিয়া।
‘ধর্ম সম্পর্কে এভাবে কথা বলে না মা। এ ধর্ম তো তোমারও।’ প্রেসিডেন্ট বলল। তার কণ্ঠ গম্ভীর।
‘স্যরি বাবা। অন্য ধর্ম সম্পর্কে এমন কথা বলি না। নিজের ধর্মকে জানি বলেই এই কথা বলতে পারলাম।’ বলল সারা সোনিয়া।
প্রেসিডেন্ট আবার হাসল। বলল, ‘ওরা এসেছে, চলি মা।’
‘বাই বাবা।’ বলে সারা সোনিয়া চলল নিজের ঘরের দিকে।
.
‘টিভি ব্রডকাস্ট ও পত্রিকার রিপোর্ট মিলিয়ে একটা বিস্তারিত সামারি দাঁড় করাবার কথা ছিল, সেটা তৈরি হয়েছে?’
বলল প্রেসিডেন্ট ডিওডোন ডেভিন প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে। প্রধানমন্ত্রী জোসেফ জুলেস হাকিজিসানা একবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল প্রেসিডেন্টকে, ‘ইয়েস এক্সিলেন্সি মি. প্রেসিডেন্ট, তৈরি হয়েছে। আমি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দু’জনেই সামারির উপর নজর বুলিয়েছি।’
‘জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনসহ দুনিয়ার মানবাধিকার সংস্থাগুলো, ওআইসি, আরবলীগ, আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং ভ্যাটিক্যান যে বিবৃতি দিয়েছে, সেগুলো কি কম্পাইল করা হয়েছে?’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘এক্সিলেন্সি মি. প্রেসিডেন্ট, সেগুলোরও একটা সামারি দাঁড় করানো হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলল।
‘জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন, কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা, ওআইসি-সহ যারা বুরুন্ডিতে আসতে চাচ্ছে, তাদের সফরসূচি পাওয়া গেছে?’ জিজ্ঞাসা প্রেসিডেন্টের।
‘এক্সিলেন্সি মি. প্রেসিডেন্ট, সবাই যোগাযোগ করেছে, কিন্তু সফরসূচি কারোরই পাওয়া যায়নি।’ প্রধানমন্ত্রী জোসেফ হাকিজিসানা বলল।
‘তাদের আসার আগে আমাদের বেশ কিছু কাজ আছে। যাক। মি. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বারনাবি মোনিসপা, ‘ব্রডকাস্ট ও রিপোর্টের’ সামারিটা পড়ুন।
‘ধন্যবাদ এক্সিলেন্সি!’ বলে পড়া শুরু করল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ‘পশ্চিম আফ্রিকায় খ্রিস্টান নামের সন্ত্রাসী সংস্থাগুলো ক্যামেরুনসহ কয়েকটি দেশে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল, হাজার হাজার একর জমি দখল করেছিল এবং বাস্তুচ্যুত করেছিল হাজার হাজার মানুষকে, খ্রিস্টান নামের ঐ ধরনের সংগঠন মধ্য ও পূর্ব আফ্রিকা অঞ্চলে শিক্ষা ও সেবাকর্মের জাল পেতে নানা ষড়যন্ত্র, কৌশল ও চাপ প্রয়োগ করে ধর্মান্তরের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কৌশল, ষড়যন্ত্র ও চাপে কাজ না হলে হত্যা ও কিডন্যাপের আশ্রয় নিচ্ছে। সাম্প্রতিককালে মুসলিমরা, বিশেষ করে প্রতিভাবান মুসলিম ছাত্র এবং প্রভাবশালী মুসলিমরা তাদের হত্যা, গুমের শিকার হচ্ছে। কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো :
‘হেনরি বুফোর্ট-এর মুসলিম নাম হোসেইন মুইজি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় তাকে খ্রিস্টান নাম নিতে বাধ্য করা হয়। সে খুব ভালো ছাত্র ছিল। আর খেলাধুলায়ও ছিল অতুলনীয়। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় গেমসে সাত ইভেন্টে সে প্রথম হয়ে চ্যাম্পিয়নশীপ অর্জন করে। মেডেল, ক্রেস্টসহ এক লাখ ডলার পুরস্কার পায়। চার্চ কাউন্সিলও তাকে এক লাখ বুরুন্ডিয়ান ফ্রাংক পুরস্কার দেয়। পরের দিনই সে বিকেলে তাঁর বাড়ির পাশে পার্কে তার আবাল্য বান্ধবী ও সহপাঠী সারা সুসান রোজসহ বসা অবস্থায় দুজনেই খুন হয়। সারা সুসানের মুসলিম নাম সাবিনে কেল্লাহ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় তাকেও নাম পাল্টাতে হয়। তাদের লাশের উপর ‘M23’ নামের একটি চিরকুট খুঁজে পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে পোপ ভিক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যান। পুলিশ প্রধানও আসেন। ভিসি তার নানা কথার মাধ্যমে পুলিশকে একথা গেলাতে চেষ্টা করেন যে, কঙ্গোর সন্ত্রাসী সংস্থা ‘M23’ তাদেরকে খুন করেছে, তবে এ কথা গোপন রাখার জন্য পুলিশকে তিনি চাপ দেন। পুলিশ প্রধান মেধাবী ছাত্র হেনরি বুফোর্ট সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইলে তিনি বলেন যে, পুলিশ প্রধান যেন ভিসির অফিসে যান। তার অফিসই ঠিক করে দেবে কাদের সাথে কথা বলতে হবে। হেনরি বুফোর্ট ও সারা সুসান হত্যার ঘটনার আগের কিছু ঘটনাকে চাপা দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আসল অপরাধী বা অপরাধীদের আড়াল করার জন্যে। হত্যার আগের দিন সন্ধ্যায় সারা সুসান ভিসির অফিস থেকে ফেরার সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হেনরি বুফোর্টকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পান। সারা সুসান লেখাপড়া ছাড়াও ভিসির অফিসে বিকেল পাঁচটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খণ্ডকালীন কাজ করেন। হেনরি বুফোর্টকে কিভাবে হাসপাতালে নেবেন- এ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত সারা সুসান পাশের রাস্তায় ট্যাক্সি দেখে সেখানে ছুটে যান। এ সময় ওদিক দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর যাচ্ছিলেন। প্রক্টর সারা সুসানের কাছে সব শুনেন। পরে ট্যাক্সিওয়ালা, প্রক্টরসহ তিনজন ধরাধরি করে হেনরি বুফোর্টকে ট্যাক্সিতে তোলেন। প্রক্টর ভাড়া ও অন্যান্য খরচের জন্য সারা সুসানকে পাঁচশ ফ্রাংক দেন। বুজুমবুরা ইভানজেনিক্যাল হাসপাতালে হেনরি বুফোর্টকে ভর্তি করা হয়। পরদিন বিকেলে হেনরি বুফোর্ট হাসপাতাল থেকে তার বাসায় যান।
হেনরি বুফোর্ট হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে ছিলেন। ওয়ার্ডে ছিলেন- এই ঘটনার কোনো হদিস হাসপাতালে নেই। হাসপাতালের ইমারজেন্সি ও ওয়ার্ডের দুটি রেজিস্টারই গায়েব করা হয়েছে। হেনরি বুফোর্ট ভিসি সাহেবের অফিসের অদূরে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলেন, সে ঘটনাও চাপা দেয়া হয়েছে। তবে ওই দিন সন্ধ্যার পর ভিসি সাহেব হেনরি বুফোর্টকে ডেকেছিলেন, কথা বলেছিলেন, কিছু দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সে বিষয়টা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মুখে মুখে। ভিসি সাহেব যে দায়িত্ব হেনরি বুফোর্টকে দিয়েছিলেন, সে দায়িত্ব পালন না করে ভিসিকে হেনরি বুফোর্ট অপমান করেছে, তাও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বহুল আলোচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হেনরি বুফোর্টকে কি দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সেটাও জানা গেছে। ওই সন্ধ্যার পরদিন রোম থেকে কার্ডিনাল লিও ম্যালানাস আসবেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন চার্চের উদ্বোধন ও প্রথম প্রার্থনা পরিচালনা করবেন। কার্ডিনাল লিও রোম থেকে যীশুর একটা মূর্তি নিয়ে আসবেন। ভিসির পক্ষ থেকে দায়িত্ব দেয়া হয় যীশুর মূর্তিকে বিশ্ববিদ্যালয় চার্চের যথাস্থানে নিয়ে বসাতে হবে হেনরি বুফোর্টকে। তাকে আরও দায়িত্ব দেয়া হয় কার্ডিনাল পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় চার্চের প্রথম প্রার্থনাসভায় প্রার্থনার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র হিসেবে হেনরি বুফোর্টকে কিছু বলতে হবে। হেনরি বুফোর্ট এই দুই দায়িত্বের কোনোটাই পালন করতে রাজি হয়নি বা পালন করেনি। কিভাবে করবে? সে তো মুসলিম। এক নাম পরিবর্তনে বাধ্য হওয়া ছাড়া তার অন্য সব মুসলিম পরিচয় ঠিক আছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চেয়েছিল, ঐ দুই দায়িত্ব পালন করিয়ে হেনরি বুফোর্ট যে খ্রিস্টান, একথা জনসম্মুখে প্রকাশ ও প্রচার করতে। হেনরি বুফোর্ট তা হতে দেয়নি। এই পরিস্থিতিতেই হেনরি বুফোর্ট খুন হন। কঙ্গোর ‘M23’ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রুপটির নেতা একটি বড় ঘটনায় ধরা পড়ে এখন আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের সম্মুখীন হবার পর গ্রুপটির সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া গ্রুপটি বুরুন্ডির অভ্যন্তরীণ ঘটনা প্রবাহের সাথে কোনো সময় যুক্ত হয়নি। তাদের বর্তমান অবস্থায় যুক্ত হবার কোনো প্রশ্নই উঠে না। এই অবস্থায় মনে করা হচ্ছে, খ্রিস্টান নামের সন্ত্রাসীরা তাদের অপরাধ আড়াল করা এবং পুলিশের চোখ অন্যদিকে সরিয়ে নেয়ার জন্যই ‘M23’-এর ঘটনা সাজিয়েছে।’
দ্বিতীয় বিষয় হলো, ‘প্রতিভাবান ছাত্র আবিউলা আমাদী মাকা হত্যার ঘটনা। আবিউলা আমাদী মাকা মাকাম্বা কবিলার একজন মুসলিম ছাত্র। ‘আবিউলা’
‘আব্দুল্লাহ’ শব্দের একটি আফ্রিকী অপভ্রংশ। সে গতবারের সেকেন্ডারি অ্যাডভান্সড লেভেল পরীক্ষায় স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সকল রেকর্ড ভেঙে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অফার ও প্রলোভন উপেক্ষা করে বুজুমবুরা সরকারি স্টেট কলেজে সে ভর্তি হয়। স্টেট কলেজ প্রিন্সিপালের লিখিত অনুরোধে পোপ ভিক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আবিউলা আমাদীকে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ব্যবহারের লিখিত অনুমতি দেন। আবিউলা আমাদী একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ব্যবহারকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার পাঁচজন ব্যাটনধারী ছাত্র আবিউলাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে নিয়ে যায়। তারা চিৎকার করে বলে, ‘প্রভু যীশুর শত্রু, মা মেরির শত্রু এই শয়তান আমাদের লাইব্রেরি ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে আমাদের তথ্য পাচার করে, আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। এই শয়তানকে আর কোনো অপকর্ম করতে আমরা দেব না। শেষ পর্যন্ত ছেলেটি নিহত হয়। এই হত্যার ষড়যন্ত্র ও হত্যার দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উপর বর্তায়।
তৃতীয় বহুল আলোচিত ঘটনা হলো, ‘বুজুমবুরার সবচেয়ে প্রাচীন ও সম্মানিত আসুমানি পরিবারের দুই মেয়ে সাফিয়া সাঈদা ও সাফা সাবিয়া তাদের বাড়ির গেটের সামনে ট্রাক চাপায় নৃশংসভাবে নিহত হওয়া। এই দুই যমজ বোন সাফিয়া সাঈদা ও সাফা সাবিয়া এবারের সেকেন্ডারি স্কুল অ্যাডভান্সড পরীক্ষায় যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল। আবিউলার ক্ষেত্রে যা হয়েছিল, এ ক্ষেত্রেও তাই হয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় দুই বোনকে ছাত্রী হিসেবে পাবার জন্য নানা রকম অফার ও প্রলোভন দেখায়। কিন্তু তারা সবকিছু উপেক্ষা করে বুজুমবুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। ভর্তি হবার পর নিহত হবার আগের রাতে পোপ ভিক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো প্রশাসন ভবন এলাকা থেকে করা একটা টেলিফোনে তাদের পরিবারকে থ্রেট করা হয়। বলা হয়, এর ফল ভালো হবে না। পরে জানা গেছে, ওই পুরনো প্রশাসনিক ভবনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আশ্রয়ে খ্রিস্টান পরিচয়ের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংস্থা ব্ল্যাক ক্রসের একটা গ্রুপ আড্ডা গেড়ে বসেছিল। মনে করা হচ্ছে আসুমানি পরিবারের দুই মেয়ের হত্যাকাণ্ড এই গ্রুপেরই কাজ। আসুমানি পরিবারের বড় মেয়েকেও দুইবার কিডন্যাপের চেষ্টা করা হয়। দুই ঘটনায় সন্ত্রাসীরা সবাই মারা যায়। চাওসিকোর ও আনা আরিয়ার দুই ঘটনায় যে সন্ত্রাসীরা মারা যায়, তারা এবং এরা সবাই ব্ল্যাক ক্রস গ্রুপের সদস্য। তবে এই গ্রুপ বুরুন্ডিতে SCA ( Saviour of Central Africa) নামে কাজ করছে। যেসব সন্ত্রাসী মারা গেছে তাদের কলার ব্যান্ডে মেড ইন স্টিকারে SCA বর্ণ তিনটি লিখিত আছে।
চতুর্থ ঘটনা হিসেবে চাওসিকো ও আনা আরিয়ার বিষয়টা উল্লেখ করা হয়েছে। চাওসিকো ও আনা আরিয়া ব্ল্যাক ক্রস-এর মৃত্যু ফাঁদ থেকে…..’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে থামিয়ে প্রেসিডেন্ট ডিওডোন ডেভিন বলে উঠলো, ‘চাওসিকো ও আনা-আরিয়ার ঘটনাটা থাক। তাদের ঘটনার সবকিছুই আমরা ইতিমধ্যে জানতে পেরেছি এবং ওরা তা স্বীকার করেও নিয়েছে। এখন পড় ওদের পরবর্তী কথার সামারিটা।
‘ইয়েস এক্সিলেন্সি, পড়ছি।’ বলে আবার পড়া শুরু করলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘পোপ ভিক্টর ইউনিভার্সিটি অফ সেন্ট্রাল আফ্রিকা তার শিক্ষা কার্যক্রম চালাবার সাথে সাথে ছাত্রদের খ্রিস্টান দেখাবার এবং খ্রিস্টান বানাবার ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে, কিছু পরিসংখ্যান দিয়ে তা প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সব বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম, খ্রিস্টান ও নানা আদিবাসী গোত্রীয় ধর্মাবলম্বী ছাত্ররা ভর্তি হয়। কিন্তু খ্রিস্টান বিশ্ববিদ্যালয় উদ্দেশ্যমূলকভাবে মুসলিম ও আদিবাসী গোত্রীয় ধর্মের ছাত্রদের বেশি বেশি ভর্তি করার চেষ্টা করে। মুসলিম ও আদিবাসী গোত্রীয় ধর্মের ছাত্রদের ভর্তির সময় নাম পাল্টাতে বাধ্য করার মাধ্যমে খ্রিস্টিয়করণের প্রথম কাজ শুরু হয়। নিজে ঠিক থাকলে নাম পাল্টালে কি আর হবে, এই চিন্তা করে অধিকাংশই সুযোগ-সুবিধার লোভে নাম পাল্টাতে রাজি হয়ে যায়। মুসলিম বা আদিবাসী যারা নাম পাল্টাতে রাজি হবে না মনে করা হয়, তাদেরকে ষড়যন্ত্রের জালে আটকে নাম পাল্টাতে বাধ্য করা হয়। চাওসিকো বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে এক্সট্রা অর্ডিনারি ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। তার রেকর্ডে মুগ্ধ হয়ে বেলজিয়ামের একটি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে অফার দেয়। তার ভর্তির সব ফর্মালিটি কমপ্লিট হয়ে যায়। তার এয়ারলাইন্স টিকেটও হয়ে যায়। ঠিক তার ফ্লাই করার আগের রাতে তার ঘরে ডাকাতি হয়। তার শিক্ষাসংক্রান্ত সব কাগজপত্র, টিকিট ও টাকা ডাকাতরা নিয়ে যায়। তাদের বাড়ির গেটম্যান খুন হয় এবং চাওসিকো আহত হয়। চাওসিকো সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর বেলজিয়ামের বিশ্ববিদ্যালয়টির সাথে যোগাযোগ করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে কোনো সাড়া পায় না। হতাশ চাওসিকো ইউরোপের যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সাবজেক্ট আছে, সেসবের সাথে যোগাযোগ করে। কিন্তু তারাও তার আবেদনে কোনো সাড়া দেয় না। আফ্রিকার দুটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে চেষ্টা করেও সে একই ফল পায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটি শক্তিশালী পক্ষের চেষ্টাতেই ইউরোপের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও আফ্রিকার দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ভর্তির সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়। বিমূঢ়, বিপর্যস্ত চাওসিকো তার শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার স্বার্থে বুজুমবুরার পোপ ভিক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো ডাকে সাড়া দিয়ে সেখানেই ভর্তির জন্য যায়। ভর্তির সময় তার নাম পরিবর্তনে তাকে বাধ্য হতে হয়। তার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির শুরু থেকে তাকে খ্রিস্টান বানাবার কাজ শুরু হয়ে যায়। চাওসিকোর মতো ছেলেকে যদি নাম পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়, তাহলে সাধারণ ছেলে মেয়েদের ক্ষেত্রে কি হয় তা বলা বাহুল্য।
খোঁজ নিতে গিয়ে এই বিষয়ে এক এলার্মিং চিত্র পাওয়া গেছে। বুজুমবুরায় খ্রিস্টান কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় সেখানকার সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে বুরুন্ডিয়ান ছাত্রছাত্রীদের খ্রিস্টান নাম অনেক অনেক কম। পোপ ভিক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ে শতকরা আশি ভাগ বুরুন্ডিয়ান ছাত্রের আংশিক বা পূর্ণ খ্রিস্টান নাম। অথচ বুজুমবুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ২০ ভাগ বুরুন্ডিয়ান ছাত্রের নাম খ্রিস্টান। বুরুন্ডিয়ান মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীর নাম পরিবর্তনের তথ্য নিয়ে দেখা গেছে তাদের অবস্থা আরো খারাপ। পোপ ভিক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ে বুরুন্ডিয়ান মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের শতভাগ নামের মধ্যে নব্বই ভাগের নামই খ্রিস্টান। অথচ এর পাশেই দেখা যাচ্ছে বুজুমবুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র দশ ভাগ বুরুন্ডিয়ান মুসলিম ছাত্র- ছাত্রীর খ্রিস্টান নাম। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে খ্রিস্টান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদেরকে আংশিক বা পূর্ণ খ্রিস্টান নাম গ্রহণে বাধ্য করা হয়।
‘এক্সিলেন্সি মি. প্রেসিডেন্ট, রিপোর্টের সর্বশেষ অংশ পড়ছি, ‘বুরুন্ডিতে কার্যরত সন্ত্রাসীরা হত্যা, গুম ইত্যাদি ঘটনার সরকারি তদন্তে হস্তক্ষেপ করে। হত্যা, গুম ইত্যাদি বেড়ে গেলে বুরুন্ডি সরকার চেয়েছিল সিআইডি দিয়ে আগের ঘটনাসহ সব হত্যা, গুমের ঘটনার পুনঃতদন্ত করতে। কিন্তু হত্যা, গুমের সব ঘটনার সিআইডি দিয়ে পুনঃতদন্তের উদ্যোগ থেকে বিরত থাকতে সরকারকে চাপ দেয় খ্রিস্টান সংগঠনগুলো। খ্রিস্টান নামের সন্ত্রাসীরা সিআইডির বিস্তারিত তদন্তে তাদের নাম বেরিয়ে পড়বে এই ভয়েই পুনঃতদন্তের সরকারি উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করে। খ্রিস্টান সংগঠনগুলো চাইলে দেশে বিভেদ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে, সরকারের পতন ঘটানো তাদের পক্ষে সম্ভব, এই আশঙ্কাতেই সরকার তার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়।’ দীর্ঘ রিপোর্টের সামারি পড়া শেষ হলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর।
সবাই চুপচাপ। বিস্ময় প্রেসিডেন্টের চোখে। বলল, ‘একমাত্র চাওসিকোর কিছু ঘটনা ছাড়া অন্যান্য ঘটনার যে বিবরণ প্রকাশ পেয়েছে তার তো কিছুই আমরা জানি না। আমাদের পুলিশ জানতে পারল না, অথচ অন্যরা এতটা বিস্তারিত জানলো কি করে? কে অনুসন্ধান করল? আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় কে প্রকাশ করল? আর আন্তর্জাতিক মিডিয়াই বা এমন বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করল কেন?’
‘ঘটনার চেয়ে এটাই আমার কাছে বড় বিস্ময়, এক্সিলেন্সি। কিছু খ্রিস্টান সংগঠনের এমন ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা আমাদের বুরুন্ডিতে ঘটেছে তা শুধু নয়, এমন ঘটনা আফ্রিকার অনেক দেশেই ঘটছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মিডিয়া বিষয়টাকে এইভাবে ফাঁস করে দেয়ার ঘটনা একেবারেই নতুন। নিশ্চয়ই…।’
প্রধানমন্ত্রীর কথার মাঝখানে প্রেসিডেন্ট বলে উঠলো, ‘মি. জোসেফ জুলেস, পশ্চিম আফ্রিকার ক্যামেরুন অঞ্চলের ঘটনা একশ্রেণির খ্রিস্টান সংগঠনের ষড়যন্ত্র আন্তর্জাতিক মিডিয়া ফাঁস করে দিয়েছিল।’
‘ধন্যবাদ মি. প্রেসিডেন্ট, সেই ঘটনা ছিল ভূমি দখল ও স্থানীয়দের উচ্ছেদ সংক্রান্ত অন্যদিকে আমাদের এখানকার ঘটনা কৌশলে ও বাধ্য করে ধর্মান্তরকরণ এবং এতদসংশ্লিষ্ট গুম-খুন সংক্রান্ত। তবুও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় যাওয়ার ক্ষেত্রে দুই ঘটনার মধ্যে মিল আছে।’ বলল প্রধানমন্ত্রী জোসেফ জুলেস।
‘দুই ঘটনার মধ্যে আরেকটা মিল আছে স্যার। পশ্চিম আফ্রিকার ক্যামেরুন অঞ্চলে ওই ঘটনার সময় আহমদ মুসা সেখানে হাজির ছিলেন, আমাদের এখানেও বর্তমানে আহমদ মুসা হাজির আছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।
‘ধন্যবাদ মি. বারনাবী। একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন আপনি। আহমদ মুসা দুনিয়ার বড় বড় রাজধানীতে গ্রহণযোগ্য একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। আন্তর্জাতিক অনেক মিডিয়ার উপর তাঁর প্রভাব থাকা স্বাভাবিক। আমার এখন নিশ্চিত মনে হচ্ছে, আমাদের সরকার তাকে সহযোগিতা করার ব্যাপারে অপারগতা জানানোর পর তিনি সহযোগিতা পাওয়ার বিকল্প পথ বেছে নিয়েছেন। ষড়যন্ত্রমূলক ও মানবাধিকার বিরোধী এই ঘটনা বিশ্ব মিডিয়ায় আসার পর দুনিয়ার মানবাধিকার সংগঠনগুলো ও অনেক প্রভাবশালী সরকার এখানে ছুটে আসবে প্রতিকারের জন্য।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘এক্সিলেন্সি মি. প্রেসিডেন্ট, দৃশ্যত আহমদ মুসার এ. কাজ আমাদের বুরুন্ডির জন্যে বিব্রতকর হলেও তিনি বুরুন্ডি সরকারকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন এক্সিলেন্সি। তার এই রিপোর্ট থেকে পরিষ্কার, কিছু খ্রিস্টান সংগঠনের ষড়যন্ত্র ও তার ফলাফল সম্পর্কে বুরুন্ডি সরকার কিছুই জানতো না। জানার জন্য বিস্তারিত গোয়েন্দা তদন্তের যে উদ্যোগ সরকার নেয়, তাকেও ওই খ্রিস্টান সংগঠনগুলো বাধাগ্রস্ত করে। সরকার পতনের হুমকির কারণে বুরুন্ডি সরকার তাদের বাধা মেনে নেয়, সেটাও রিপোর্টে বলে দেয়া হয়েছে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।
‘আসলেই আহমদ মুসা খুব ভালো মানুষ। সন্ত্রাসীদের চাপে পড়ে আমরা আহমদ মুসাকে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করেছিলাম। কিন্তু সে সন্ত্রাসীদের সাথে আমাদের ব্রাকেটেড করেনি, বরং আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে। বলল প্রধানমন্ত্রী।
‘এই সত্যনিষ্ঠ রিপোর্টের জন্যে তার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। আমরা যা পারিনি, তাই তিনি করেছেন। কিন্তু আমি ভাবছি, এত ডিটেইল ঘটনা তিনি জানলেন কি করে? বিশেষ করে আমাদের সরকারের উপর সন্ত্রাসীরা যে চাপ দিয়েছে, সেটা তিনি জানলেন কি করে?’ প্রেসিডেন্ট বলল।
‘তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান। আমাদের কথাবার্তা এবং অসহায়ত্ব দেখে তিনি সেটা আঁচ করেছেন। আর বুরুন্ডির রাজনীতির উপর নিশ্চয়ই তার ভালো স্টাডি আছে। তিনি সত্যি জানার জন্য নিশ্চয়ই অনেক পরিশ্রম করেছেন। ভিকটিমদের পরিবারের সাথে তিনি যোগাযোগ করেছেন। আর এক্সিলেন্সি মি. প্রেসিডেন্ট, চাওসিকো ও আনা আরিয়ার কাছ থেকে নিশ্চয়ই অনেক সাহায্য পেয়েছেন। আনা আরিয়া তার পিতার সূত্রে নিশ্চয়ই অনেক কিছুই জানতেন। প্রধানমন্ত্রী বলল।
ঠিক মি. জোসেফ জুলেস, আনা আরিয়াকে হাত করতে পারা আহমদ মুসার জন্য একটা বড় পাওয়া।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘এক্সিলেন্সি, আমাদের গোয়েন্দা রিপোর্ট হলো, আনা আরিয়া অনেক আগে থেকেই চাওসিকোর প্রতি দুর্বল।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।
‘সেক্ষেত্রে আনা আরিয়া তার পরিচয় ও স্ট্যাটাস অনুসারে নিজের ধর্মের দিকেই চাওসিকোকে টানতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। সেই গেছে চাওসিকোর ধর্মে।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘ইসলামের এই শক্তি আছে এক্সিলেন্সি। এর প্রমাণ অসংখ্য এক্সিলেন্সি। প্রধানমন্ত্রী বলল।
‘থাক এসব কথা প্রধানমন্ত্রী মি. জোসেফ জুলেস। আমাদের সরকারের একটা প্রতিক্রিয়া এখনই দিতে হবে। সেটা কি হবে, আসুন সেটা আলোচনা করি। আচ্ছা, যতগুলো আন্তর্জাতিক বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া এসেছে, তার মূল কথাটা কি?’ বলল প্রেসিডেন্ট।
সন্ত্রাস ও একটা সম্প্রদায় কর্তৃক তাদের অনুসারী বৃদ্ধির জন্য হিংসাত্মক ও মানবতাবিরোধী ষড়যন্ত্রের কঠোর নিন্দা ও ত্বরিৎ প্রতিকার দাবি করা হয়েছে। বুরুন্ডি সরকারের দুর্বলতা ও নিষ্ক্রিয়তায় দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে এবং দ্রুত সরকারের আইনানুগ পদক্ষেপ দাবি করেছে সবাই।’ বলল প্রধানমন্ত্রী।
‘শীঘ্রই কি তাদের কারো বুরুন্ডিতে আসার সম্ভাবনা আছে? জিজ্ঞাসা প্রেসিডেন্টের।
‘বেশ কয়েকটি সংগঠন শীঘ্রই বুরুন্ডিতে আসার জন্য আমাদের দূতাবাসে ভিসার আবেদন করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছে ওআইসি (OIC), হিউম্যান রাইটস ফর অল (HRA), জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস কমিশন, অর্গানাইজেশন অফ আফ্রিকান ইউনিটি (OAU) এবং ক্রিশ্চিয়ান্স ফর অল।’ বলল প্রধানমন্ত্রী।
‘এখন প্রথম করণীয়টা হলো, দ্রুত বিশ্বের সকলের জন্য আমাদের একটা প্রতিক্রিয়া দেয়া। এরপর পুরো ঘটনা প্রবাহের উপর আমাদের একটা ওয়ার্কিং পেপার তৈরি করা।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘শুধু ওয়ার্কিং পেপার তৈরি নয় এক্সিলেন্সি। আমাদের কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করতে হবে। আমার মতে, আমাদের প্রাথমিক বক্তব্যে সন্ত্রাসী ও মানবাধিকার বিরোধী সকল ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ঘোষণা থাকতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী জোসেফ জুলেস বলল।
‘তদন্তের ঘোষণা দেয়ার ব্যাপারে আমি একমত। কিন্তু কি ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, সে বিষয়টা আমাদের সামনে আসা দরকার।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘এক্সিলেন্সি, আমি মনে করি পদক্ষেপের বিষয়টা স্থির করার আগে আহমদ মুসার সাথে যেকোনো পর্যায়ে আমাদের বসা দরকার। রিপোর্টে যা প্রকাশ পেয়েছে, আহমদ মুসা তার চেয়ে অনেক বেশি জানেন। তাছাড়া সন্ত্রাসীদের সে চেনে। সুতরাং আমরা প্রত্যেকের ব্যাপারে আহমদ মুসার গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য পেতে পারি।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলল।
‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথার সাথে আমি একমত এক্সিলেন্সি। বলল প্রধানমন্ত্রী।
‘হ্যাঁ, এটা একটা ভালো প্রস্তাব। কিন্তু আহমদ মুসাকে পাওয়া যাবে কোথায়? তার নিজের কোনো টেলিফোন নাম্বার তো আমাদের কাছে নেই। প্রেসিডেন্ট বলল।
‘একটা কন্টাক্ট পয়েন্ট আছে আমাদের কাছে। দূতাবাস ক্লাবে আমরা মেসেজ দিলে তিনি পেয়ে যাবেন এবং নিশ্চয়ই তিনি তখন যোগাযোগ করবেন আমাদের সাথে।’ বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
‘ধন্যবাদ। এই চেষ্টা তাহলে করুন। তাকে যত তাড়াতাড়ি পাওয়া যায় ততই ভালো। ইতিমধ্যে আমাদের প্রতিক্রিয়া প্রেসে দেবার ব্যবস্থা আপনারা করুন। প্রেসিডেন্ট বলল।
‘ইয়েস এক্সিলেন্সি। অল্পক্ষণের মধ্যেই স্টেটমেন্টটা আপনাকে দেখিয়ে আমরা প্রেসে দিয়ে দিব। বলল প্রধানমন্ত্রী।
‘আচ্ছা মি. জোসেফ জুলেস, মি. বতুমবুরা, সন্ত্রাসী কিংবা ভিক্টর বিশ্ববিদ্যালয় অথবা মি. বাতিস্তা সান্ড্রির খ্রিস্টান সংগঠনের কোনো প্রতিক্রিয়া কি জানা গেছে?’ প্রেসিডেন্ট বলল।
‘মিডিয়া কিংবা মৌখিক কারো কোনো প্রতিক্রিয়ার খবর আমরা পাইনি। তবে এক্সিলেন্সি, একটা বড় খবর পাওয়া গেছে, বলতে ভুলে গেছি। পোপ ভিক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফাদার স্টিফেন ফোবিয়ান অপরাধের সমস্ত দায় মাথায় নিয়ে সকালে পদত্যাগ করেছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো দোষ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় সকল সাম্প্রদায়িক অপরাধ থেকে মুক্ত হোক আমি সেটা চাই। সেই সাথে আমি চাই আমাদের ক্রিশ্চিয়ানিটি কর্তৃক কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংঘটিত মানবাধিকার হরণের অপরাধ থেকে মুক্ত হোক।’ বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্ট কোনো কথা বলল না। গম্ভীর হয়ে উঠেছে সে। প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের দিকে একবার তাকিয়ে চুপ করে রইল। প্রেসিডেন্টই নীরবতা ভাঙলো। বলল গম্ভীর কণ্ঠে, ‘ফাদার স্টিফেন ফোবিয়ানকে ধন্যবাদ। আমিও যদি চিৎকার করে তার কথাটা বলতে পারতাম, তাহলে খুশি হতাম! শুধু তিনি, আমি এবং আমরা কয়েকজন চাইলেই কি ব্ল্যাক ক্রসের ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে পারবো?’
‘এক্সিলেন্সি, আগে হলে বলতাম পারবো না। কিন্তু আহমদ মুসাকে দেখার পর, তার কথা শোনার পর এখন আমার মনে হচ্ছে, তাদের ষড়যন্ত্র-বন্ধ হবে। পশ্চিম আফ্রিকায় হয়েছে, আমাদের পূর্ব আফ্রিকাতেও আহমদ মুসা তা পারবেন প্রভু যীশুর ইচ্ছায়।’ বলল প্রধানমন্ত্রী।
হাসল প্রেসিডেন্ট। বলল, ‘মি. প্রধানমন্ত্রী, আহমদ মুসা তো করবেন তার আল্লাহর ইচ্ছায়, কিন্তু আপনি যে বললেন প্রভু যীশুর ইচ্ছায়?’
প্রধানমন্ত্রীও হাসল। বলল, ‘এক্সিলেন্সি, স্রষ্টা এবং সকল কাজের কারক তো একজনই। আমি তাকেই বুঝিয়েছি। আর আমরা, মুসলমানরা এবং ইহুদিরা সকলেই তো একত্ববাদী।’
‘একটিকে আমরা অনেক সময় ‘বহু’ করে ফেলি, সেটাই সমস্যা মি. প্রধানমন্ত্রী। থাক এসব জটিল কথা-বার্তা। আসুন আমরা উঠি। মন্ত্রীসভার বৈঠকের আর দেরি নেই। বলে প্রেসিডেন্ট উঠে দাঁড়াল।
সবাই উঠল।
.
আহমদ মুসার মোবাইল বেজে উঠলো।
বাম হাত দিয়ে মোবাইল তুলে নিয়ে আহমদ মুসা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল আনা আরিয়ার নাম্বার।
চাওসিকো ও আনা আরিয়া এখন আসমানি পরিবারের সাথে থাকছে।
চাওসিকো ও আনা আরিয়ারা খুশি।
আসুমানি পরিবার আরো খুশি। চাওসিকো ও আনা আরিয়ার থাকার জন্য আহমদ মুসা যে আসমানি পরিবারকে চয়েস করেছে এতে পরিবারটি নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছে। আনা আরিয়াকে সাথী হিসেবে পেয়ে সামিরা সাদিয়া খুবই খুশি হয়েছে। বিশেষ করে আহমদ মুসার সাথে আনা আরিয়ার ছোট ছোট ঝগড়া সাদিয়ার খুব ভালো লাগে। আবার তাকে অবাকও করে। সামিরা সাদিয়া আনা আরিয়াকে বলে, ‘স্যারের সাথে অমন শাসন, অভিযোগের সুরে কথা বল, তোমার ভয় করে না, সংকোচবোধ হয় না?’ আনা আরিয়া কৃত্রিম চোখ পাকিয়ে বলে, ‘বড় বোন হলে তো আরো কত কিছু করতাম, ছোট বলে তাঁর রক্ষা।’ সামিরা সাদিয়া মনে মনে বলে, ‘আমাকেও তো বোন ডাকেন? কিন্তু আমি ওইভাবে বোন হতে পারি না কেন?’
আহমদ মুসা মোবাইলের কল অন করে বাম হাতে কানের কাছে নিল মোবাইল। বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম, আনা আরিয়া।
‘ওয়ালাইকুম আসসালাম, ভাইয়া। আপনি কি গাড়িতে, ড্রাইভে?’ জিজ্ঞাসা আনা আরিয়ার।
‘হ্যাঁ আনা আরিয়া, আমি ড্রাইভ করছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমি কি কথা বলতে পারি?’ আনা আরিয়া বলল।
‘হ্যাঁ পারো। রাস্তায় তেমন ভিড় নেই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘একটা খারাপ খবর পেয়েছি ভাইয়া।’ আনা আরিয়া বলল।
‘বল।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আম্মা অল্পক্ষণ আগে টেলিফোন করেছিলেন ভিন্ন একটা টেলিফোন থেকে। তিনি জানিয়েছেন, ওরা বাবাকে পদত্যাগ পত্র প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিয়ে বলেছে, আজ আহমদ মুসার জীবনের শেষ দিন। আজ বিকেল তিনটায় সে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে। প্রধানমন্ত্রীর অফিসে এবং চারদিকে আমরা ফাঁদ পেতে রেখেছি। এই কাজে আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছি। তাকে যদি আমরা দুনিয়া থেকে সরাতে পারি, তাহলে চিন্তার আর কিছু থাকবে না। সরকার এবং সবাইকে আমরা ম্যানেজ করতে পারবো।’ আনা আরিয়া বলল। কথা বলার সময় উদ্বেগে তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
‘ধন্যবাদ বোন। তোমার বাবা-মাকেও ধন্যবাদ। একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ খবর তারা দিয়েছেন। সুযোগ মতো আমি তাদেরকে কৃতজ্ঞতা জানাবো। চিন্তা…।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানে আনা আরিয়া বলে উঠলো, ‘কৃতজ্ঞতা জানাবার দরকার নেই। তারাই আপনার কাছে সীমাহীন কৃতজ্ঞ ভাইয়া। তাদের সন্তানকে আপনি পিতা-মাতার চেয়েও ভালভাবে আগলে রেখেছেন। তারা আপনাকে ঈশ্বরের দূত মনে করেন। আমি জানতাম না ভাইয়া, বিশেষ করে আমার বাবা আমাকে এত ভালোবাসেন। মা বলেন, আমি চলে আসার পর বাবা একদম বদলে গেছেন। সময় পেলেই আমার ঘরে গিয়ে বসে থাকেন এবং কাঁদেন। তিনি পদত্যাগও করেছেন এই কারণে। তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি তাকে অমানুষ বানিয়েছে, মেয়ের প্রতি সীমাহীন অবিচার করিয়েছে। তিনি আম্মাকে বলেছেন, সবকিছুর বিনিময়ে আমি আমার মেয়েকে চাই।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। তিনি মূলতই ভালো মানুষ। অবস্থা তাকে ভিন্ন তিনি দিকে নিয়ে গিয়েছিল। একটা আঘাত তাকে ফিরিয়ে এনেছে। পদত্যাগ করে ভালো করেছেন। তার সব দায় স্বীকারই তাকে দায়মুক্ত করবে ইনশাআল্লাহ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া। আপনি খুব সাবধান থাকবেন। আনা আরিয়া বলল।
‘চিন্তা করো না। আল্লাহ আছেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আলহামদুলিল্লাহ। আরেকটা কথা ভাইয়া, আপনি আপাকে মানে সাদিয়া আপাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন নিউজটার জন্য?’ আনা আরিয়া বলল।
‘গোটা দুনিয়া তো সাদিয়াকে ধন্যবাদ দিচ্ছে? আর নিউজটার পর সাদিয়ার সাথে আমার কোনো কথা হয়নি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনি তো কথা বলেননি।’ আনা আরিয়া বলল।
‘দরকার হয়নি আনা আরিয়া।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এত বড় ঘটনাটা কি ‘দরকার’-এর মধ্যে পড়ে না? যে ঘটনা বুরুন্ডিকে আলোড়িত করেছে, আফ্রিকাকে আলোড়িত করেছে এবং গোটা দুনিয়াকে আলোড়িত করার মতো, সে ঘটনা সৃষ্টি করার কাজ কি ‘দরকার’-এর মধ্যে পড়ে না ভাইয়া?’ আনা আরিয়া বলল। তার কণ্ঠে অনেকটাই ঝগড়াটে সুর।
‘তার কাজে আমি দারুণ খুশি আনা আরিয়া। কিন্তু সে কাজটি করেছে আল্লাহর জন্যে, কোনো প্রশংসা লাভের জন্যে নয়। তোমার আমার সবার মধ্যে এই মনোভাব থাকা দরকার।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমি আপাকে এ কথাটা বলবো ভাইয়া। কিন্তু ধন্যবাদ শুধু প্রশংসার জন্যে নয়, উৎসাহ দেয়ার জন্যেও হয়। নিউজটি প্রকাশ হওয়ার পর আপা অনেক কেঁদেছে। আনন্দের কান্না। এই সাথে এর সব কৃতিত্ব সে আপনাকে দিয়েছে। বলেছে, আপনার দেয়া নিউজটি সে মাত্র কপি করেছে। আপনি কি তাকে উৎসাহ দিয়ে বলতে পারতেন না যে, তোমার নিউজ রিমেকিংটি সুন্দর হয়েছে।’ আনা আরিয়া বলল। তার কণ্ঠটি ভারি হয়ে উঠেছিল।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘এখন আমার মনে হচ্ছে, তুমি ঠিকই বলেছ আনা আরিয়া। কিন্তু জানো তো, বড় প্রয়োজনগুলোই আমাকে বেশি ব্যস্ত রাখে।’
‘এটাই কারণ হলে আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যে, অনেকের সাথে দূরত্বকে অতি নিরাপদ করতে গিয়ে আপনি অনেকের মনে কষ্ট দেন ভাইয়া।
‘অতি নিরাপদ বলে কোনো কথা নেই আনা আরিয়া। যা অতি নিরাপদ সেটাই ‘নিরাপদ। আল্লাহ যে নিরাপত্তার সীমা বেঁধে দিয়েছেন, আমি তা রক্ষার চেষ্টা করি। কষ্ট লাগলেও এটাই ঠিক।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া, আমাদের অনেক কিছু বুঝার বাকি আছে। থাক এসব কথা। ভাইয়া, আপনি খুব সাবধান থাকবেন। নতুন যে খবরটি আপনাকে দিলাম, সেটা আমাদেরকে খুব উদ্বিগ্ন করেছে। চাওসিকো, আপাসহ বাড়ির সবাই অস্থির হয়ে উঠেছে। আল্লাহ আপনাকে নিরাপদ রাখুন। বলল আনা আরিয়া।
‘আমিন।’ বলল আহমদ মুসা।
সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে কথা তাদের শেষ হয়ে গেল।
আহমদ মুসার গাড়ি তখন পার্ক স্ট্রিট দিয়ে পশ্চিম দিকে এগোচ্ছে।
এ রাস্তা হয়ে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে আসার কথা নয় তার। লেক এভিনিউ-এর বাসা থেকে সেন্ট্রাল এভিনিউ হয়ে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে আসার সোজা ও সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ। কিন্তু এ পথে না এসে সার্কুলার রোডের ঘোরা পথে অফিস পাড়ার খুব পাশ দিয়ে পার্ক স্ট্রিটে প্রবেশ করেছে।
সেন্ট্রাল এভিনিউ এবং পার্ক স্ট্রিট সমান্তরাল। এই দুই রাস্তার মাঝেই গোটা অফিস পাড়া এবং সরকারি ভবনগুলো। প্রেসিডেন্টের বাসা, প্রধানমন্ত্রীর বাসা, পার্লামেন্ট সব এখানেই। পার্ক স্ট্রিট অনেকটাই ব্যাকডোর রোডের মতো। পার্লামেন্ট ভবন; প্রেসিডেন্ট ভবন, প্রধানমন্ত্রীর ভবনসহ প্রধান সরকারি স্থাপনাগুলোর মুখ সেন্ট্রাল এভিনিউ-এর দিকে। বলা যায় পার্ক স্ট্রিট ব্যাকডোর এক্সিটের ভূমিকা পালন করে।
সাবধানতার দিক বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে আসার জন্য আহমদ মুসা এই পথটাই বেছে নিয়েছিল। আনা আরিয়ার টেলিফোন পাওয়ার পর বুঝলো আল্লাহ তাকে পথ বাছাইয়ে সাহায্য করেছেন।
একটা বিষয় আহমদ মুসার খুবই অবাক লাগছে। প্রধানমন্ত্রী আমাকে টেলিফোন করেছেন ঘণ্টা তিনেক আগে মন্ত্রীসভার বৈঠক থেকে। আমি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে যাব এ সিদ্ধান্ত নিশ্চয় তখনই হয়েছে। এই অল্প সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে বা মন্ত্রীসভার বৈঠক থেকে সব তথ্য লিক হলো কি করে! এটা প্রমাণ করে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে এবং মন্ত্রীসভায় বড় ধরনের ফুটো আছে। যদি তা থাকে, তাহলে সেটা আরো অনেক ধরনের বিপদ ঘটাতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর অফিসে এবং মন্ত্রীসভায় সন্ত্রাসীদের বড় ধরনের অ্যাক্সেস আছে অবশ্যই।
চলছিল আহমদ মুসার গাড়ি।
প্রধানমন্ত্রীর অফিসের এ পাশের পার্ক স্ট্রিটের গেটটা তখন দেখা যাচ্ছে।
পাশে রাখা এম-১৬ মেশিন রিভলবারের ওপর একবার হাত রাখল আহমদ মুসা। আহমদ মুসার ধারণা, সন্ত্রাসীরা পার্ক স্ট্রিটের গেটের দিকে জাল পাতলেও সে জাল খুব বড় নাও হতে পারে। সন্ত্রাসীদের প্রধান টার্গেট হবে সেন্ট্রাল এভিনিউ। তারা নিশ্চিত করে ধরে নেবার কথা, আহমদ মুসা সেন্ট্রাল রোড় হয়েই প্রধানমন্ত্রীর অফিসে যাবে।
গেটটা এসে গেছে। গেট বন্ধ।
গেটের বাইরে দুজন প্রহরী দাঁড়িয়ে। বেশ লম্বা চওড়া।
আহমদ মুসার গাড়ি গেটের সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছে।
দুজন প্রহরী এগিয়ে আসছে।
তাদের উপর চোখ পড়েছে আহমদ মুসার। চোখ পড়তেই বড় একটা ধাক্কা লাগলো আহমদ মুসার মনে। তাদের গাঁয়ের ইউনিফর্ম একেবারেই মিসফিট। দোহারা শরীরের ইউনিফর্ম একহারা শরীরে উঠলে যেমনটা দেখায়, ঠিক সেরকম।
প্রহরী দুজন এগিয়ে এসে আহমদ মুসার দিকে একবার তাকিয়েই পেছন ফিরে গেট বক্সের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘বিদেশী লোক এশিয়ান হবে।’
আহমদ মুসার কিছু বুঝার বাকি রইল না।
দ্রুত আহমদ মুসা পাশে রাখা এম-১৬ জ্যাকেটের নিচের পকেটে তুলে নিল।
গেট বক্সের দিক থেকে ছুটে এলো চারজন প্রহরী। তাদের কারো হাতে উদ্যত রিভলবার। কারো হাতে ব্যারেল উঁচু করে রাখা স্টেনগান। তারা ছুটে আসছে গাড়ির দিকে।
গিয়ার চেঞ্জ করে হঠাৎ গাড়ি স্টার্ট দিল আহমদ মুসা। গাড়ি একটা লাফ দিয়ে সামনে এগোলো।
ছুটে আসা প্রহরীরা গাড়ির সামনে এসে পড়েছিল। তারা দু’পাশে লাফ দিয়ে সরার চেষ্টা করল। তারা সবাই দু’পাশে আছড়ে পড়েছে। কিন্তু দূরে সরতে পারেনি। অনেকেরই হাত, পা দেহাংশ গাড়ির তলায় পিষ্ট হবার মতো ছিল। কিন্তু আহমদ মুসার গাড়ি স্টার্ট নেয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ডেড স্টপ হয়ে যায় এবং তার সাথে সাথেই আহমদ মুসা গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।
গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়লে আকস্মিকতার ধাক্কা কাটিয়ে কেউ কেউ উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছিল এবং কেউ কেউ উঠে বসছিল।
আহমদ মুসা তাদের দিকে এম-১৬ তাক করে বলল, ‘তোমরা যে যেমন আছো, তেমনি থাক। নড়বে না। অন্যথায়…’
আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারল না। প্রহরীরা অদ্ভুত ক্ষীপ্রতার সাথে তাদের রিভলভার, স্টেনগান কুড়িয়ে নিয়ে আহমদ মুসাকে তাক করছিল।
আহমদ মুসার তর্জনী এম-১৬-এর ট্রিগারেই বসেছিল। আঙ্গুলটা ট্রিগারে রেখে চেপে ধরল মাত্র। বেরিয়ে গেল গুলির ঝাঁক।
আহমদ মুসার গাড়ির পেছনে আরো দুটি গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছিল। একটি প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সিকিউরিটি চীফ নিও আসকানোর জীপ, অন্যটি জাতীয় পরিষদের নিরাপত্তা কমিটির চেয়ারম্যান মার্টিন ভিনসেন্টের।
নিও আসকানো ও মার্টিন ভিনসেন্ট দুজনই ছুটে এসে আহমদ মুসার পাশে দাঁড়াল। আহমদ মুসাকে একটা স্যালুট দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সিকিউরিটি চীফ বলল, ‘স্যার কি ব্যাপার? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। প্রহরীরা আপনাকে গুলি করতে যাচ্ছিল কেন, আপনিই বা তাদের উপর গুলি করলেন কেন?’ তার কণ্ঠে বিস্ময় ও উত্তেজনা।
‘ভালো করে দেখুন, ওরা আপনাদের প্রহরী নয়।’ বলল আহমদ মুসা শান্ত কন্ঠে।
‘স্যার, কি বলছেন আপনি? আমাদের প্রহরী হবে না কেন?’ নিও আসকানো বলল। তার কণ্ঠে রাজ্যের বিস্ময়।
কথাটা বলেই এগোলো সে গাড়ির সামনে দুর্পাশে পড়ে থাকা প্রহরীদের লাশের দিকে। চোখ বুলালো প্রহরীদের ওপর। আশ্চর্যের বিষয় কাউকে সে চিনতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রীর অফিসে শ্বেতাঙ্গ প্রহরী প্রচুর, কিন্তু সবাই তার চেনা।
নিও আসকানো তাকালো আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘অবাক ব্যাপার, প্রহরীরা কেউ আমার চেনা নয়! অথচ আমি নিজে আজ নিরাপত্তা প্রহরীদের দায়িত্ব বন্টন করেছি। এই বিটে এই গেটে যারা দায়িত্বে থাকার কথা ছিল, তারা সকলেই আমার চেনা। কিন্তু তারা কোথায়, এরা কা…।’
নিও আসকানো কথা শেষ না করেই রাস্তার দিকে ঘুরে যাওয়া বিস্ফোরিত চোখে আহমদ মুসার দিকে ঝুঁকে ডান হাত দিয়ে প্রচন্ড একটা ধাক্কা দিল আহমদ মুসাকে।
আকস্মিক ধাক্কায় আহমদ মুসা পড়ে গেল। সেই সাথে পার্ক স্ট্রিটের ওপাশ থেকে একসাথে কয়েকটি স্টেনগানের ব্রাশফায়ারের শব্দ হলো।
আহমদ মুসাকে ধাক্কা দেয়ার পর নিও আসকানো নিজের আত্মরক্ষার জন্য সময় পায়নি। সে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। গুলিবৃষ্টিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেল তার দেহ।
অফিসের ভেতর থেকে কয়েকজন প্রহরী এবং আরো লোকজন ছুটে আসছে গেটের দিকে।
আহমদ মুসা পড়ে গিয়েই তার এম-১৬ বের করে নিয়েছিল। শুয়ে থেকেই সে রাস্তায় ওপাশে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যে গুলি বৃষ্টি শুরু করল।
রাস্তার ওপাশে সন্ত্রাসীরা গুলি করতে করতে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল গাছপালার আড়াল থেকে। তারা আহমদ মুসার এম-১৬-এর সহজ শিকারে পরিণত হয়ে গেল। এক ঝাঁক গুলি পাঁচজনের ক্ষুদ্র সন্ত্রাসী দলকে গ্রাস করল।
অফিসের ভেতর থেকে প্রহরী ও লোকজন যারা ছুটে আসছিল আহমদ মুসাদের দক্ষিণ গেটের দিকে, তারাও ‘গুলি’, ‘গুলি’ বলে চিৎকার করে উঠল। তারা দেখতে পেয়েছিল অফিস কম্পাউন্ডে পশ্চিম দিকের বাগান ও উত্তর পাশের রাস্তার দিক থেকে চৌদ্দ-পনেরোজন লোক ছুটে আসছিল। তাদের হাতে উদ্যত স্টেনগান, কারো ট্রিগারে আঙুল, কারো কারো স্টেনগান থেকে গুলি শুরু হয়ে গিয়েছিল।
গুলির শব্দ আহমদ মুসারও কানে গিয়েছিল। চট করেই তার মনে হলো, প্রহরীদের গুলি এটা হতে পারে না। এদিক লক্ষ্যে প্রহরীদের ব্রাশ ফায়ারের এখন প্রয়োজন নেই। তাহলে কি ওদিকের সন্ত্রাসীরা এদিকে আসছে?
চিন্তার সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসার দেহ বোঁ করে ঘুরে গেল। এবার আহমদ মুসার নজরে এলো গেট এবং ভেতরের কম্পাউন্ড। দেখল সে, একদল স্টেনগানধারী গুলি করতে করতে ছুটে আসছে। দক্ষিণের এই গেট তাদের লক্ষ্য। তাদের কয়েকজন প্রহরীর পোশাক পরা, অবশিষ্টদের পরনে সৈনিকের পোশাক। তবে তাদের কারো বুকে নেমপ্লেট নেই। আহমদ মুসার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
আহমদ মুসা দ্রুত গড়িয়ে কয়েকটা লাশ ডিঙিয়ে একদম গেট ঘেঁষে অবস্থান নিল। গ্রিল গেটের বটমের পুরু ও প্রশস্ত প্যানেল এবং এর সমান্তরাল স্টিল শিটের আড়াল পাওয়ায় আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।
ওদিক থেকে তখন গুলিবৃষ্টির আড়ালে সন্ত্রাসীরা ছুটে আসছিল। অফিসের ভেতর থেকে প্রহরী ও লোকজন যারা গেটের দিকে ছুটে আসছিল, তাদের যারা ঠিক সময়ে শুয়ে পড়তে পারেনি তারা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।
গেট তখন সন্ত্রাসীদের গুলিবৃষ্টির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ গুলি মাথার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে।
সন্ত্রাসীরা গুলিবৃষ্টির আড়াল নিয়ে গেটের দিকে ছুটে আসছে।
গেট তখনো বন্ধ।
আহমদ মুসাও মাটিতে গা লাগিয়ে ক্রল করে দ্রুত গেটের দিকে এগোচ্ছিল। ওদেরকে কিছুতেই গেট দখল করতে দেয়া যাবে না। গেট দখলে পেলে সন্ত্রাসীদের সুবিধা বন্ধ করা ছাড়াও পাল্টা আক্রমণের সুবিধা পাবে আহমদ মুসা।
গেট আহমদ মুসার কাছেই ছিল।
আহমদ মুসা গেটে পৌঁছেই তার এম-১৬-কে আক্রমণে নিয়ে এলো।
গেটের গ্রিল দরজার বটম বরাবর জায়গা ছয় ইঞ্চি প্রস্থের ইস্পাত শীটে ঢাকা। এটাই আহমদ মুসার জন্য ঢালের কাজ করল।
আহমদ মুসা তার এম-১৬-এর ব্যারেল ইস্পাতের শীটের উপর তুলে গুলিবৃষ্টি শুরু করল যতটা পারা যায় সামনের গেটটা কভার করে। আহমদ মুসার গুলিবৃষ্টি ছিল ওদের কাছে আকস্মিক। ওদের অনেকগুলো স্টেনগানের অব্যাহত গুলিবৃষ্টির পাল্টা কোনো জবাব না পেয়ে, ওরা ধরে নিয়েছিল এদিকে গুলি করার কেউ থাকলেও গুলি করার মতো অবস্থানে নেই। সুতরাং তারা নিশ্চিন্ত মনে শরীরটা সামনের দিকে একটু বাঁকিয়ে গুলিবর্ষণ করতে করতে ছুটে আসছিল। ফলে তারা অধিকাংশই আহমদ মুসার আকস্মিক গুলিবৃষ্টির শিকারে পরিণত হলো। যারা বেঁচে গিয়েছিল, তারা শুয়ে পড়ে গুলিবৃষ্টি অব্যাহত রাখল। আহমদ মুসাও তার গুলিবৃষ্টি বন্ধ করল না।
উত্তরের গেটের দিক থেকে হুইসেলের শব্দ পাওয়া গেল।
আহমদ মুসা আরো কিছু ভাবার আগেই গেট দিয়ে ঝড়ের বেগে প্রবেশ করল কয়েক প্লাটুন সৈনিক।
সন্ত্রাসীরা পেছন থেকে তাদের আক্রমণের শিকার হলো।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
অবশিষ্ট সন্ত্রাসীরা কয়েক ডজন সাব মেশিনগানের গুলিতে ছাতু হয়ে গেল। সৈনিকরা দ্রুত গোটা কম্পাউন্ড ঘিরে ফেলে গেটের দিকে ছুটে এলো।
ওদিকে প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে বেরিয়ে এলো একঝাঁক মানুষ। তাদের মধ্যে গার্ড পরিবেষ্টিত প্রধানমন্ত্রীকে দেখা গেল।
প্রধানমন্ত্রী জোসেফ জুলেস একজন সেনা অফিসারকে চিৎকার করে বলল, ‘গেটে দেখুন আমাদের জাতীয় পরিষদের নিরাপত্তা কমিটির চেয়ারম্যান মার্টিন ভিনসেন্ট এবং আমাদের অফিসের সিকিউরিটি চীফ নিও আসকানো গুলিবিদ্ধ।
সেনা অফিসার ছুটল দক্ষিণ গেটের দিকে।
প্রধানমন্ত্রীও এগোলো সেদিকে।
আহমদ মুসা তখন উঠে দাঁড়িয়ে তার গাড়ির আশেপাশে পড়ে থাকা চারজন দারোয়ানের লাশ পরীক্ষা করছিল।
একজন সিকিউরিটির লোক গেট খুলে দিয়েছিল।
সেনারা ছুটে এসে দক্ষিণ গেট এবং দক্ষিণ পাশের পার্ক স্ট্রিট ঘিরে ফেলল।
প্রধানমন্ত্রী আহমদ মুসার কাছে ছুটে এলো। বলল, ‘মি. মার্টিন ভিনসেন্ট, মি. নিও আসকানো কেমন আছেন? মি. আবু আব্দুল্লাহ আপনি কেমন আছেন?’
‘দুঃখিত মি. প্রধানমন্ত্রী, মি. মার্টিন ভিনসেন্ট আর নেই। বেশ কয়েকটি গুলি তাকে বিদ্ধ করেছে। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মারা গেছেন। আপনার অফিসের সিকিউরিটি চীফ গুলির মুখ থেকে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে গিয়ে নিজে সাবধান হবার সময় পাননি। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তিনি। তাকে এখনই হাসপাতালে নেয়া দরকার।
নিও আসকানো ক্ষীণ কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলল, ‘স্যার, মি. আবু আব্দুল্লাহ স্যার, ছদ্মবেশী গেট সিকিউরিটির লোকদের যথাসময়ে চিনতে না পারলে আমরা কেউ বাঁচতাম না। গেট সিকিউরিটির সবাই মি. আবু আব্দুল্লাহ স্যারের হাতে মারা যায়। কিন্তু রাস্তার ওপাশ থেকে আসা ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি এসে আমাদের ঘিরে ধরে। আমি মি. আবু আব্দুল্লাহ স্যারকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে না পারলে তিনি মার্টিন ভিনসেন্টের মতো গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যেতেন।
‘থ্যাংকস মি. নিও আসকানো। আপনি একটা বড় কাজ করেছেন। আপনার জন্য আমরা গর্বিত।’ বলল প্রধানমন্ত্রী নিও আসকানোর মাথার কাছে বসে।
অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়ালো। দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো নিও আসকানোকে।
‘আমরা মি. নিও আসকানো এবং মার্টিন ভিনসেন্টকে সামরিক হাসপাতালে নিচ্ছি। মার্টিন ভিনসেন্ট সম্পর্কে আমাদের একটা শেষ আশা আছে। বলল একজন সেনা অফিসার।
‘গড সেভ দেম। যাও মি. অফিসার কুইক।’ বলল প্রধানমন্ত্রী। একজন সেনা অফিসার ও একজন পুলিশ অফিসারের গাড়ি অ্যাম্বুলেন্সের সাথে ছুটলো দ্রুত।
‘মি. প্রধানমন্ত্রী, সন্ত্রাসীদের বডি দ্রুত চেক করার পর তাদের কেউ আহত থাকলে, তাদেরকেও হাসপাতালে নেয়া দরকার। বলল আহমদ মুসা প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে।
প্রধানমন্ত্রী তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় ও অবস্থান সত্ত্বেও আমরা তো সবাই মানুষ মানুষকে তার মানবিক অধিকার দেয়া প্রয়োজন।
বলেই প্রধানমন্ত্রী সামনের পুলিশ অফিসারকে লক্ষ্য করে বলে উঠলো, ‘আপনারা দ্রুত সন্ত্রাসীদের দেহ প্রাথমিকভাবে চেক করার কাজটা সারুন এবং আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করুন। হাসপাতালে উপযুক্ত প্রহরার ব্যবস্থা থাকতে হবে।’
নির্দেশটা দিয়েই আহমদ মুসার দিকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী বলল, ‘সন্ত্রাসীদের এই চারটা লাশ তো আপনি চেক করেছেন, কি দেখলেন মি. আবু আব্দুল্লাহ? সেই আগের ওরাই নিশ্চয়?’
‘হ্যাঁ, মি. প্রধানমন্ত্রী। এরা সবাই কলিন ক্রিস্টোফারের ব্ল্যাক ক্রসের লোক। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস অবশিষ্টরাও এরাই হবে।’ আহমদ মুসা বলল –
‘আমি বুঝতে পারছি না আবু আব্দুল্লাহ, আপনি এখানে এই সময়ে আসছেন, সেটা ওরা জানতে পারলো কি করে? আর যুদ্ধের আয়োজনের মতো এত বড় প্রস্তুতি গ্রহণ করল কখন?’ বলল প্রধানমন্ত্রী। তার চোখে মুখে বিস্ময়।
‘মাফ করবেন মি. প্রধানমন্ত্রী, আপনার মন্ত্রীসভার সব সদস্যের প্রতি কি আপনি সমান আস্থা পোষণ করেন?’ আহমদ মুসা বলল।
গম্ভীর হলো প্রধানমন্ত্রী। বলল, ‘আপনার প্রশ্নের উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলতে পারলে খুশি হতাম মি. আবু আব্দুল্লাহ। কিন্তু আমি পারছি না। মন্ত্রীসভায় চারজন মন্ত্রী আছেন যারা খ্রিস্টান সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু মি. আবু আব্দুল্লাহ এদের এবং এদের বাড়ির সব মোবাইল, টেলিফোন আমরা ট্রাকিং-এ রেখেছি। মন্ত্রীসভার বৈঠক থেকে এখন পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টায় তাদের মোবাইল ও টেলিফোন থেকে সন্দেহমূলক কোনো কল হয়নি।
‘ধন্যবাদ মি. প্রধানমন্ত্রী। আরেকটা বিষয়, আপনার মন্ত্রীসভার বৈঠকের প্রসিডিং রেকর্ড করার একটা অফিসিয়াল ব্যবস্থা তো অবশ্যই আছে। এর বাইরে মন্ত্রীসভার বৈঠক বা আশপাশ থেকে আর কোনো রেকর্ডিং হয়েছে কিনা, সেটা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন মি. প্রধানমন্ত্রী। আহমদ মুসা বলল।
প্রধানমন্ত্রী জোসেফ জুলেসের চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। বলল প্রধানমন্ত্রী বিস্ময় বিজড়িত কণ্ঠে, ‘ঘটনা এতদূর যেতে পারে মি. আবু আব্দুল্লাহ!’
কথা শেষ করে মুহূর্তকাল দম নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলল, ‘রেকর্ড ট্রাকিং-এর ব্যবস্থা আছে মি. আব্দুল্লাহ। খোঁজ না নিয়ে আমি বলতে পারছি না কি ঘটেছে।’
‘অসুবিধা নেই মি. প্রধানমন্ত্রী। কিভাবে লিক হয়েছে এটা জানা ছাড়া এর কোনো কার্যকারিতা এখন নেই।’ আহমদ মুসা বলল।
প্রধানমন্ত্রী কিছু বলতে যাচ্ছিল। তখন তার হাতের ক্ষুদ্রাকার ওয়ারলেসটি বেজে উঠল।
ওয়ারলেসের দিকে একবার তাকিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলল, ‘এক্সিলেন্সি মি. প্রেসিডেন্ট।’
প্রধানমন্ত্রী মিনি ওয়ারলেসটি তুলে নিল কানের পাশে।
প্রধানমন্ত্রী এখানকার পরিস্থিতির আপডেট দিলেন। তারপর মাঝে মাঝে দুই একটা কথা বললেন এবং শুনলেন প্রেসিডেন্টের দীর্ঘ কথা।
কথা শেষ করে তার দিকে একবার তাকিয়ে আহমদ মুসাকে বলল, ‘চলুন মি. আবু আব্দুল্লাহ আমার অফিসে। আপনার সাথে কিছু জরুরি কথা আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও গোয়েন্দা প্রধান আসছেন।’
প্রধানমন্ত্রী ঘুরে দাঁড়িয়ে পা বাড়ালেন অফিসের দিকে।
আহমদ মুসাও হাঁটা শুরু করল প্রধানমন্ত্রীর সাথে।
পথে দেখা হলো পুলিশ প্রধানের সাথে।
পুলিশ প্রধানকে স্বাগত জানিয়ে কিছু নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখের সামনে ওয়ারলেস। তার চোখে মুখে উত্তেজনা।
শান্তির দ্বীপে সংঘাত – ২
২
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়্যারলেসটা মুখের সামনে থেকে একটু সরিয়ে নিয়ে দ্রুত চোখ ফিরাল প্রধানমন্ত্রীর দিকে।
প্রধানমন্ত্রীর অফিসকক্ষে তার জন্যে নির্ধারিত চেয়ারে বসেছিল। সে উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বসেছিল প্রধানমন্ত্রীর টেবিলের একপাশে। টেবিলটির সামনে বসেছিল আহমদ মুসা। আইনমন্ত্রীর’ আসন ছিল টেবিলের অন্যপাশে। আর গোয়েন্দা প্রধান বসে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পেছনে।
‘মি. প্রধানমন্ত্রী স্যার, কলিন ক্রিস্টোফার বোর্ডিং কার্ড নিয়ে প্লেনে ওঠার জন্যে গ্যাংওয়ের মুখে অপেক্ষা করছে। আমাদের পুলিশ ফোর্স সেখানে পৌঁছে গেছে। আমরা এখনই তাকে গ্রেফতার করতে পারি।’ বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
‘গ্রেফতারের নির্দেশ দাও।’ দ্রুত কণ্ঠে বলল প্রধানমন্ত্রী।
আহমদ মুসা শান্তভাবে বসে শুনছিল সব কথা।
প্রধানমন্ত্রীর মুখে গ্রেফতারের আদেশ উচ্চারিত হবার সাথে সাথে আহমদ মুসা ‘না’ সূচক হাত তুলল।
‘স্টপ মি. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে কথাটা বলেই প্রধানমন্ত্রী তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘বলুন মি. আবু আব্দুল্লাহ।’
‘মি. প্রধানমন্ত্রী আমার পরামর্শ হলো, চারদিক থেকে চারটি ছবি নিয়ে তাকে চলে যেতে দিন।’
প্রধানমন্ত্রীসহ সকলের চোখে মুখে বিস্ময়ের বিদ্যুৎ খেলে গেল। প্রধানমন্ত্রী একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকালো আহমদ মুসার দিকে। তারপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল, ‘মি. আবু আব্দুল্লাহ যা বলেছেন, সেটা করতেই নির্দেশ দিন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটু দ্বিধা করল, কিন্তু নির্দেশ পালন করল। বলল, প্রেসিডেন্টকে একবার জানালে বোধ হয় ভালো হতো।
‘ব্ল্যাক ক্রসের প্রধান কলিন ক্রিস্টোফার ও তার সহযোগী সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করে আটক করাসহ ব্ল্যাক ক্রসের সাথে যে সংগঠন বা যারাই জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছেন এবং এসব ব্যাপারে তিনি মি. আবু আব্দুল্লার পরামর্শ নিতে বলেছেন। আমরা সেটাই করেছি। সুতরাং প্রেসিডেন্টকে বিরক্ত করার দরকার নেই। বলল প্রধানমন্ত্রী।
‘মি. প্রধানমন্ত্রী স্যার, আমরা কিন্তু মধ্য আফ্রিকা চার্চ আন্দোলনের নেতা ও মধ্য আফ্রিকা কাউন্সিল অফ ক্যাথলিক চার্চের সভাপতি বাতিস্তা সান্ড্রিকে গ্রেপ্তার এবং পোপ ভিক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফাদার স্টিফেন ফোবিয়ানকে নজরবন্দী করেছি। বিমানবন্দর থেকে ওয়ারলেস পাওয়ার আগের মুহূর্তে এটা জানতে পেরেছি। এ নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ হয়নি।’ বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
‘তাদের যে অপরাধ তাতে তাদের গ্রেপ্তার এই মুহূর্তের মিনিমাম দাবি। তাই কিনা মি. আবু আব্দুল্লাহ?’ প্রধানমন্ত্রী বলল।
‘আমি মনে করি প্রেসিডেন্টের আদেশ ঠিক আছে। তাদের ভীত- সন্ত্রস্ত করতে না পারলে তারাই আপনাদের ভীত করার চেষ্টা করবে। সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে কোনো বড় পদক্ষেপ নেয়া যাবে না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু মি. আবু আব্দুল্লাহ, কলিন ক্রিস্টোফারকে ছেড়ে দিতে বললেন কেন? সে তো মূল কালপ্রিট। প্রধানমন্ত্রী বলল।
‘ব্ল্যাক ক্রস প্রধান কলিন ক্রিস্টোফারকে আমি ছেড়ে দিতে বলেছি বুরুন্ডিকে বড় ঝামেলা থেকে নিরাপদ রাখার জন্যে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বড় ঝামেলাটা কি?’ জিজ্ঞাসা প্রধানমন্ত্রীর।
‘তাকে সহজে গ্রেফতার করা যাচ্ছিল। কিন্তু সমস্যা দাঁড়াত পরবর্তী সময়ে। আইন অনুসারে তার বিচার এবং তাকে শাস্তি দিতে হতো, কিন্তু তা সম্ভব হতো না। তাকে অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখাও যেত না। কারণ তার পক্ষে বুরুন্ডিকে চাপ দেবার মতো বহু দেশ আছে, বড় বড় দেশ আছে। তাদের চাপে পড়ে কলিন ক্রিস্টোফারকে ছেড়ে দিতে হতো।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সন্ত্রাসী হিসেবে, হত্যাকারী হিসেবে কলিন ক্রিস্টোফারকে হাতেনাতে ধরে ফেলার পর আইন ও যুক্তি আমাদের পক্ষে থাকতো। আমরা তাদের চাপ অস্বীকার করতে পারতাম না?’ প্রধানমন্ত্রী বলল।
‘কথার চাপ যুক্তি দিয়ে অস্বীকার করা যেত কিন্তু তাদের অন্তর্ঘাতি চাপ মোকাবেলা করা বুরুন্ডির জন্য খুবই কঠিন হতো। এ ব্যাপারে জাতীয় ঐক্যমতও সৃষ্টি করা যেত না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘অন্তর্ঘাতটা কেমন?’ প্রধানমন্ত্রী বলল। তার চোখে মুখে বিস্ময়।
‘বুরুন্ডি ব্ল্যাক ক্রসসহ এই ধরনের খ্রিস্টান সন্ত্রাসীদের শত্রু হয়ে দাঁড়াত। বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত এই সন্ত্রাসীরা এই অঞ্চলের সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে বুরুন্ডিতে নানা অন্তর্ঘাত ও সন্ত্রাসের সৃষ্টি করত। যাদের সহযোগিতা করার মতো প্রচুর লোক বুরুন্ডিতে আছে।’ বলল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা থামল।
কোনো কথা এলো না প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে।
ঘরের অন্য সবাই নীরব। প্রধানমন্ত্রীসহ সবার বিস্ময় দৃষ্টি আহমদ মুসার দিকে।
নীরবতা ভাঙলো প্রধানমন্ত্রীই। বলল ধীর কণ্ঠে, ‘অনেক ধন্যবাদ আহমদ মুসা। আপনি অনেক দূর দিয়ে চিন্তা করেছেন এবং আপনার প্রতিটি কথা সত্য। আমরা যদি কলিন ক্রিস্টোফারকে ধরে রাখতাম বা শাস্তি দিতাম, তাহলে আমরা প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে আমাদের ভেতর থেকেও প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হতাম। আপনি ঠিক চিন্তা করেছেন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনি এক সংকট থেকে আমাদের বুরুন্ডিকে বাঁচিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী থামতেই তার ওয়ারলেস ইনকামিং কলের সংকেত দিতে শুরু করল।
কল রিসিভ করে সোফায় সোজা হয়ে বসে বলল, ‘ইয়েস এক্সিলেন্সি, আমরা সবাই আমার অফিসে। আহমদ মুসাও। তিনি ভালো আছেন।’
প্রেসিডেন্ট ও প্রান্ত থেকে কথা বলল। উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলল, ‘এক্সিলেন্সি, আপনার নির্দেশ অনুসারে বড় কালপিটদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়া হয়েছে। শুধু বাকি ছিল কলিন ক্রিস্টোফারকে পাকড়াও করা। তাকেও জালে আটকানো হয়েছিল, কিন্তু আহমদ মুসার পরামর্শে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী ও প্রান্ত থেকে প্রেসিডেন্টের কথা শোনার পর আহমদ মুসা কেন কলিন ক্রিস্টোফারকে ছেড়ে দিতে বললেন তা সংক্ষেপে প্রেসিডেন্টকে জানাল।
প্রেসিডেন্টের সাথে কথা শেষ করে প্রধানমন্ত্রী আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মি. আহমদ মুসা, প্রেসিডেন্ট মহোদয় তাঁর গাড়িসহ প্রটোকল পাঠাচ্ছেন। তার সাথে লাঞ্চের জন্য তিনি আপনাকে অনুরোধ করেছেন। এই সুযোগে আপনার সাথে তার কথাও হবে।’
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘আমি তো ধূলি ধূসরিত। এই অবস্থায় প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ কি শোভন হবে?’
হাসল প্রধানমন্ত্রীও। বলল, ‘ওয়াশরুমের হ্যাঙ্গারে আপনার জন্য সিমিলার একসেট পোশাক রাখা আছে। একটা ব্যাগও আছে। আপনার ময়লা পোশাক খুলে তাতে রাখবেন। আপনার গাড়িতে ব্যাগটা পৌঁছে দেয়া হবে।’ বলে প্রধানমন্ত্রী উঠে দাঁড়াল।
দাঁড়াল আহমদ মুসা এবং অন্য সকলেই।
নতুন পোশাক পরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো আহমদ মুসা। তার হাতে ব্যাগ, তাতে তার খুলে রাখা কাপড়।
বাইরে দাঁড়িয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর পিএ। আহমদ মুসার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে বলল, ‘স্যার, আপনাকে গাড়িতে পৌঁছে দেব?’
‘আমার আবার গাড়ি কোথায়, ওটা তো ব্রাশফায়ারে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘প্রধানমন্ত্রী স্যার তার একটা গাড়ি আপনাকে দিয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর পিএ বলল।
‘তোমার স্যারকে ধন্যবাদ।’ বলে আহমদ মুসা সামনে পা বাড়াল।
প্রেসিডেন্টের প্রোটোকল এসে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অন্যান্যরা আহমদ মুসাকে নিয়ে অফিস থেকে গাড়ি বারান্দায় বেরিয়ে এসেছে।
এই সময় প্রধানমন্ত্রীর অফিস লনের শেষ প্রান্তের গার্ড রুম থেকে পুলিশ ও সৈনিকরা কয়েকজনকে টেনে-হিচড়ে গাড়িতে তুলে গেট দিয়ে বেরিয়ে যাবার জন্য আসছিল। আর ভেতর থেকে কয়েকজন চিৎকার করছিল, ‘আমরা নির্দোষ। আমরা জাঞ্জিবার থেকে বুজুমবুরা এসেছি এক পরিচিতজনের সাথে দেখা করতে। তার সন্ধানে যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের গেটে পৌঁছে আমরা এই অবস্থার মধ্যে পড়ি।’
তাদের চিৎকার আহমদ মুসার কানে পৌঁছেছিল। আহমদ মুসা প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলল, ‘ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এই লোকেরা কারা?’
প্রধানমন্ত্রী তাকাল পুলিশ প্রধানের দিকে। পুলিশ প্রধানও আহমদ মুসার প্রশ্ন শুনতে পেয়েছিল। বলল পুলিশ প্রধান, ‘সন্ত্রাসী ঘটনার সময় ওরা চারজন এই সম্মুখ গেটে সন্দেহজনকভাবে দাঁড়িয়েছিল। অভিযানে আসা সেনারা তাদের ধরে দিয়ে গেছে। এখন তাদের পুলিশ কাস্টডিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
‘মি. প্রধানমন্ত্রী, জাঞ্জিবারে আমার প্রচুর পরিচিত লোক আছে। আমি কি একবার ওদের সাথে দেখা করতে পারি? কথা বলতে পারি?’ বলল আহমদ মুসা।
‘অবশ্যই জনাব।’ বলে প্রধানমন্ত্রী তাকাল পুলিশ প্রধানের দিকে।
পুলিশ প্রধান সঙ্গে সঙ্গে একজন অফিসারকে বলল, ‘বস্কো, তুমি পুলিশ ভ্যানকে ভেতরে ব্যাক করতে বল। ছুটলো অফিসারটি।
পুলিশ ভ্যানটি ব্যাক করে এসে অফিস লনে প্রবেশ করল।
পুলিশ প্রধান আসামিদের নিচে নামিয়ে আনতে বলল।
পুলিশ ও সৈনিকদের ঘেরাওয়ের মধ্যে আসামিদের নামানো হলো।
আসামিরা চারজন। তাদের মধ্যে একজন তরুণী। আরেকজন তরুণ। অবশিষ্ট দুজনের একজন মাঝবয়সী, অন্যজন যুবক।
ওরা পুলিশ ভ্যান থেকে নেমে সুস্থির হওয়ার আগেই আহমদ মুসার নজর গিয়ে পড়েছিল তরুণ-তরুণী দুজনের উপর।
নজর পড়তেই বিস্মিত আহমদ মুসা তরুণ তরুণীদের উদ্দেশ্য করে বলল, ‘কি ব্যাপার সিতি, মুইজি তোমরা এখানে? এভাবে?’
আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে দু’হাত উপরে তুলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমাদের রক্ষা করেছেন, আপনার হাজার শোকর।
হাত নামিয়ে তাকালো সে আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘স্যার, জরুরি প্রয়োজনে আপনার সন্ধানেই আমরা এসেছি।’
‘আমার সন্ধানে? তোমরা জানলে কি করে যে আমি বুজুমবুরায়?’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমাদের জাঞ্জিবারের সৌদি কনস্যুলেটের একজন অফিসারের কাছ থেকে আমার বাবা এটা জানতে পারে।’ সিতি সাবেরা বলল।
‘তোমার বাবা তো একজন বড় রাজনীতিক।
একটু থেমেই মাঝবয়সী রাশভারী লোকটিকে দেখিয়ে বলল, ‘ইনি কি তোমার বাবা?’
‘জি স্যার।’
কথাটা শেষ করেই সুঠামদেহী গৌরবর্ণের যুবকটিকে দেখিয়ে বলল, ‘স্যার, ইনি আমাদের জাঞ্জিবারের মেরিন সেনাদলের একজন কমান্ডার। তিনি কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী আব্দুর রহমান। তার প্রয়োজনেই আপনার সন্ধানে আমাদের এখানে আসা।
আহমদ মুসা সিতির বাবা এবং কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী আব্দুর রহমানকে সালাম দিল।
আহমদ মুসা তাকাল প্রধানমন্ত্রীর দিকে। বলল, ‘মি. প্রধানমন্ত্রী, দুজনের পরিচয় তো পেলেন। একজন জাঞ্জিবারের বড় একজন রাজনীতিক। আর দ্বিতীয়জন জাঞ্জিবার নৌবাহিনীর একজন কমান্ডার। আর মেয়েটার নাম সিতি সাবেরা। ছেলেটা হাসান আলী মুইজি। তারা দুজনেই দুদুমা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। মুইজির বাবা তানজানিয়া আইন পরিষদের সদস্য।’
প্রধানমন্ত্রী কয়েক ধাপ এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করল সিতি সাবেরার বাবা এবং কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী আব্দুর রহমানের সাথে এবং পিঠ চাপড়ে দিল সিতি সাবেরা এবং হাসান আলী মুইজির। বলল সিতির বাবা ও কমান্ডারকে লক্ষ্য করে, ‘যা ঘটেছে, তা ঘটাই স্বাভাবিক ছিল সেই অবস্থায়। আমাদের সৌভাগ্য যে, জনাব আহমদ মুসাকে আপনারা চেনেন। এক অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা থেকে তিনি আমাদের বাঁচিয়েছেন।
একটু থেমে প্রধানমন্ত্রী আবার বলল, ‘মনে হচ্ছে শহরে পরিচিত কেউ নেই আপনাদের, আর এই শহরেও আপনারা নতুন। আপনারা আমাদের অতিথি হতে পারেন। আমরা খুশি হবো।’
‘মি. প্রধানমন্ত্রী ধন্যবাদ আপনাকে। এরা আমার অতিথি হলেই ভালো হবে, তাদের প্রয়োজন যখন আমার সাথে।’
মুহূর্তের জন্যে থামল আহমদ মুসা। সঙ্গে সঙ্গেই আবার বলে উঠল, ‘আমি প্রেসিডেন্ট মহোদয়ের সাথে কথা বলে না ফেরা পর্যন্ত এদের একটা ব্যবস্থা করলে আমি খুশি হবো।’
‘সেটা আমি করছি মি. আবু আব্দুল্লাহ।’
বলেই প্রধানমন্ত্রী ডাইরেক্টর জেনারেলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সম্মানিত অতিথিদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করুন।
আহমদ মুসা সিতি সাবেরার দিকে কিছুটা এগিয়ে সিতির বাবাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘প্রেসিডেন্ট মহোদয় ডেকেছেন। তার সাথে দেখা করে এসে আমি আপনাদের নিয়ে যাব। কতটা দেরি হবে আমি জানি না। এখানে আপনাদের নিশ্চয়ই কোনো অসুবিধা হবে না।’
‘আল্লাহ আপনাকে পাইয়ে দিয়েছেন। তাঁর হাজার শোকর। আমাদের কোনো চিন্তা নেই।’ বলল সিতির বাবা আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে আহমদ মুসা সবাইকে সালাম দিয়ে তার জন্য প্রস্তুত গাড়িতে গিয়ে বসল।
প্রধানমন্ত্রীও অগ্রসর হয়েছেন তার গাড়ির দিকে।
.
প্রেসিডেন্ট ডিওডোন ডেভিন আহমদ মুসাকে সাথে নিয়ে লাঞ্চ সেরে প্রেসিডেন্ট ভবনের ফ্যামিলি অংশে তার প্রাইভেট ড্রয়িং রুমে বসেছিল। বুরুন্ডির সাম্প্রতিক সমস্যা নিয়েই কথা হচ্ছিল আহমদ মুসার সাথে প্রেসিডেন্টের। বলা যায় বুরুন্ডির এ সমস্যা বিষয়ে এবং এর আন্তর্জাতিক নানা রকম প্রতিক্রিয়া নিয়ে একটা কমপ্লিট ব্রিফিং নিচ্ছিলেন প্রেসিডেন্ট আহমদ মুসার কাছ থেকে। ফ্যামিলি ট্যুর প্যাকেজ
কথাবার্তার এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট আহমদ মুসাকে বলল, ‘মি. আহমদ মুসা আমার একমাত্র মেয়ে সারা সোনিয়া আপনার সাথে দুই একটা কথা বলতে চায়। সে আপনাকে দেখেনি, কিন্তু আপনার সম্পর্কে অনেক বেশি জানে। তার বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা আপনাকে চাক্ষুষ দেখা।’
‘মি. প্রেসিডেন্ট, একজন বোন কথা বলতে চাইলে তাকে সে অধিকার দিতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা।’
বলে প্রেসিডেন্ট সঙ্গে সঙ্গেই ইন্টারকমে তার মেয়েকে আসার জন্য বলল।
মিনিট খানেকের মধ্যে বাইশ-তেইশ বছরের একটা মেয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করল এবং সালাম দিল। কালো গোলাপের রাজ্যে মেয়েটি সুন্দর, সুশ্রী একটা সাদা গোলাপ। তার পরনে সবুজ সালোয়ার, সবুজ কামিজ। মাথা ও গলায় পেঁচানো একটা সবুজ ওড়না।
আহমদ মুসা তাকে একবার দেখার পর চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট মেয়েটিকে কাছে ডেকে তার পাশের সোফা দেখিয়ে দিল বসার জন্যে।
মেয়েটি বসল কিছুটা জড়োসড়ো হয়ে।
‘মি. আহমদ মুসা এই আমাদের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান, আমার মেয়ে, সারা সোনিয়া।
‘স্বাগত বোন। আল্লাহ তোমাকে দীর্ঘ নেক জীবন, অনেক হালাল সম্পদ এবং প্রচুর বিদ্যা ও কল্যাণকর জ্ঞানের অধিকারী করুন।’ বলল আহমদ মুসা সারা সোনিয়াকে উদ্দেশ্য করে।
সারা সোনিয়া কিছুটা নতমুখী ছিল। এবার মুখ তুলল এবং আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার, আপনার সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়ায় আমি খুবই খুশি হয়েছি। এটা আমার অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল।
‘একজন মানুষের সাথে সাক্ষাৎ বড় কথা নয় বোন। তার কাজের মধ্যে তার যে সাক্ষাৎ মিলে, সেটাই আসল। মানুষ হিসাবে তোমার, আমার, আমাদের সকলের মানুষের কর্ম ও আদর্শের দিকেই বেশি তাকানো উচিত।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক স্যার, কিন্তু ব্যক্তির সাক্ষাৎ, সাহচর্য বড় বড় কাজ করেছে দুনিয়ায়।’ সারা সোনিয়া বলল।
‘ওটা বিশেষ ক্ষেত্রে সোনিয়া, আমি বলেছি সাধারণ নীতির কথা। ব্যক্তি মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা, মানব সমাজের আবশ্যিক প্রয়োজনের কথা। আর একটা বিষয়, ব্যক্তির সাক্ষাৎ সাহচর্যের গুরুত্ব প্রাগ- আধুনিককালে যেমন ছিল, এই কমিউনিকেশন যুগে তেমন নেই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ স্যার, আমি বুঝেছি। এই বুঝা আমার মধ্যে একটা বড় প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে, আপনি বাস্তববাদী একজন সমাজ বিশ্লেষক। জীবন দেয়া-নেয়ার সংগ্রামে না গিয়ে মানুষের জীবন গড়ার কাজে আপনার আসা উচিত ছিল।’ বলল সোনিয়া।
‘জীবন গড়ার জন্যে জীবন বাঁচানো প্রয়োজন সোনিয়া।’ বলল আহমদ মুসা।
সারা সোনিয়া একটুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘ঠিক স্যার, না বাঁচানো গেলে জীবন গড়া হবে কি করে? একটা প্রশ্ন স্যার, বারুদের গন্ধ, রক্তের লাল আতঙ্কের মধ্যে মানুষকে নিয়ে এইভাবে ভাবেন কি করে?’
‘সোনিয়া, বারুদের গন্ধ, রক্তপাতের লাল আতঙ্ক এই উৎসাহ অনুপ্রেরণা দেয় যে, মানুষকে দুঃখ-কষ্ট, সংঘাত-সমস্যা থেকে বাঁচানোই প্রথম কাজ। স্রষ্টা আল্লাহ মানুষের কাছে এটাই চায়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ স্যার। একটা প্রশ্ন স্যার, আপনি মুসলিম এবং সব ব্যাপারে আপনি আল্লাহর অনুগত। কিন্তু আপনার হওয়া উচিত ছিল সকলের এবং সব মানুষের জন্য। দুনিয়াতে কেবল এক ধর্মই নেই, অনেক ধর্ম আছে। ধর্মের বাইরেও মানুষ আছে। সারা সোনিয়া বলল।
আহমদ মুসা একটু হাসল। বলল, ‘প্রতিটি মানুষেরই একটা ধর্ম আছে, থাকে। যারা ধর্মের বাইরে বা ধর্ম মানে না, তাদেরও নিরেশ্বরবাদীতা বা ধর্মহীনতা একটা ধর্ম, এক ধরনের বিশ্বাস। তাদের হয়তো গড বা আল্লাহ নেই, কিন্তু সেই স্থানে তারা হয়তো বসিয়েছে কোনো অনুসরণীয় আইডলকে। যেমন কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নে মসজিদ ও গির্জার দরজা বন্ধ হয়ে গেলে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রবল জনস্রোত লেলিনের সমাধিমুখী হয়েছিল তাদের পূজারী মন নিয়ে। মানুষ তার অবচেতন মনে তার স্রষ্টাকে, বৃহত্তর উচ্চতর কোনো অলৌকিক সত্তাকে ইবাদতের বা পূজার আসনে বসিয়ে রেখেছে, লেলিনের মাজারে আছড়ে পড়া মানুষের ঢল তারই একটা প্রকাশ। থাক এদিকটা। আমি অবশ্যই মুসলিম। আর মুসলিম মানেই হলো আল্লাহর ইচ্ছা ও আদেশ-নিষেধের প্রতি আত্মসমর্পিত মানুষ। মুসলিম হিসেবে মুসলিমদের কথা তো আমি ভাববোই, তাদের খেদমত তো আমি করবোই। কিন্তু তাই বলে আমার অন্য ধর্মের মানুষের সাথে বিদ্বেষের সম্পর্ক নেই, কোনো মুসলমানেরই তা থাকতে পারে না। কারণ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষই আল্লাহর বান্দা। আল্লাহই তাদের আহার দেন, আলো-বাতাস এবং অসংখ্য নিয়ামত দিয়ে তাদের বাঁচিয়ে রাখেন। তাহলে আমি আহমদ মুসা আল্লাহর অনুগত হলে ওই সব মানুষের পাশে দাঁড়াবো না কেন? আমি তাদেরও হবো না কেন?’ থামলো আহমদ মুসা।
সঙ্গে সঙ্গেই সারা সোনিয়া ধীর কণ্ঠে বলে উঠল, ‘ধন্যবাদ স্যার, একটা সুন্দর দিক সামনে আনার জন্য। স্যার, আপনি যা বললেন আমি তা বুঝেছি। কিন্তু আপনাকে শুধুই মুসলিমদের সাথে ব্রাকেটেড করা হয় কেন?’
‘এর কারণ বিশ্বের মুসলমানদের পাশে আমাকে বেশি দেখা যায়। বেশি দেখা যাবার কারণ গোটা দুনিয়ায় মুসলমানরাই আজ বেশি নির্যাতিত। মুসলমানরা আজ দুনিয়ায় শতরকম নির্যাতনের শিকার। এমনকি জাতিসংঘ তাদের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করে। পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের সশস্ত্র খ্রিস্টান মুক্তিকামীদের বলা হয় স্বাধীনতা যোদ্ধা, কিন্তু ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরের মুক্তিকামীরা সন্ত্রাসী। বিশ্বে আজ মুসলমানরা অসহায় মজলুম। তাই তাদের পাশে আমাকে বেশি দেখা যাবারই কথা। কিন্তু হিসাব করলে দেখা যাবে আমার সাধ্য ও সুযোগ অনুসারে আমি অমুসলিমদের জন্যে যা করেছি এবং মুসলিমদের জন্যে যা করেছি তার একটার চেয়ে অন্যটা খুব কম কিছু নয়। আসল কথা হলো, আমি মানুষের পরিচয়ের চেয়ে কে জালেম আর কে মজলুম- এটাই বড় করে দেখেছি। আমার ধর্মের এটাই শিক্ষা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ স্যার। স্যার, আমি আপনার ব্যক্তি ও পরিবারিক জীবন সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।’ সারা সোনিয়া বলল।
‘ওগুলো একান্তই আমার নিজস্ব। এ ব্যাপারটা থাক।’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্যার, আপনার মতো বিশেষ মানুষদের নিজস্ব বলে কিছু থাকে না। আপনি বিয়ে করেছেন ফরাসি বুরবন রাজকুমারীকে, দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাতঃস্মরণীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনের একমাত্র উত্তরাধিকারীকে। এসব আমরা জানি। আমি জানতে চাচ্ছিলাম, কোন দেশে আপনার জন্ম, কিভাবে আপনি আহমদ মুসা হলেন, ইত্যাদি?’ সারা সোনিয়া বলল।
‘চীনের কানসু প্রদেশে আমার জন্ম। আর আমি কিভাবে আহমদ মুসা হলাম, এটা আল্লাহ জানেন যিনি আমাকে আহমদ মুসা বানিয়েছেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সুন্দর জবাব। ধন্যবাদ স্যার। স্যার, আপনি কি আপনার এ জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট?’ সারা সোনিয়া বলল।
‘আমি সন্তুষ্ট। সন্তুষ্ট কারণ, এ জীবন আমার বাছাই করা নয়। আমার আল্লাহ আমার জন্যে যা বাছাই করেছেন, তাতে আমি শতভাগ সন্তুষ্ট।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমি পড়েছি, আপনার সব ভরসা আল্লাহর উপর, আপনার সব ভালোবাসা আল্লাহর জন্যে, আপনার সব কাজ আল্লাহর ইচ্ছা ও আদেশ অনুসারে, আপনার সব পছন্দ-অপছন্দ, ভালো লাগা, মন্দ লাগা নির্ভর করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উপর। তাহলে তো আপনার নিজস্ব বলে কিছু থাকে না, আপনার নিজস্ব স্বাধীনতা, ইচ্ছার তো কোনো ভূমিকা কোথাও থাকার কথা অবশ্যই নয়।’ সারা সোনিয়া বলল। আপনার প্রিয়জনের জন্য সেরা উপহার
‘কি বল সোনিয়া, আমার সব কাজ, সব ইচ্ছাতেই তো আমার স্বাধীন ভূমিকা। এই যে আমি বুজুমবুরায় একটা কাজ নিয়ে এসেছি, এটা আমার নিজস্ব ইচ্ছার ফল। কেউ আমাকে ডিকটেট করেনি যে, তুমি বুজুমবুরায় যাও। আল্লাহ এভাবে কাউকে ডিকটেট করেন না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন স্যার, আপনি বুজুমবুরায় এই কাজকে আল্লাহর কাজ মনে করেন না, এই কাজকে আল্লাহর তরফ থেকে আসা আপনার জন্যে দায়িত্ব মনে করেন না?’
‘হ্যাঁ, করি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে এটা তো আপনার নিজস্ব ইচ্ছা নয়, আল্লাহর ইচ্ছা ও আদেশে আপনার এখানে আসা বুঝায়। সারা সোনিয়া বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘সোনিয়া বিষয়টা আরও গভীরে গিয়ে চিন্তা করতে হবে। দেখ, বুজুমবুরায় মুসলমানরা মজলুম এবং ষড়যন্ত্রের শিকার, তাদের সাহায্য প্রয়োজন- এই বোধটা আমার অন্তরে আল্লাহর ইচ্ছা ও.একটা তাকিদ আকারে প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু এটা আমার জন্যে নির্দেশ বা ডিকটেশন ছিল না। আমি আমার ইচ্ছায় এটা এড়িয়ে যেতে পারতাম, পাশ কাটাতে পারতাম, যেমন হাজারো লোক করছে, এমনকি তুমিও করছ। আমিও তা করতে পারতাম। কিন্তু আমি, আমার বিবেক, আল্লাহর ইচ্ছা, আল্লাহর তাকিদ ও নীতিবোধকে প্রাধান্য দিয়ে আমি বুজুমবুরায় এসেছি। এটা কি আমার নিজস্ব সিদ্ধান্ত হলো না?’
‘বুঝলাম স্যার। কিন্তু বিষয়টা জটিল। এ বিষয়টাও পরিষ্কার হলো যে, আল্লাহর আদেশ মানবার, না মানবার উভয় সুযোগ মানুষের আছে। এটা তার স্বাধীনতা।’ সারা সোনিয়া বলল।
‘এই সুযোগ ও স্বাধীনতা আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন দিয়েছেন? না দিলে তো আল্লাহর আদেশ-নিষেধ লংঘন হতো না। সারা সোনিয়া বলল।
‘আল্লাহ তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে গাছপালা, পশু-পাখির মতো করতে চাননি। তিনি মানুষকে বুদ্ধি-জ্ঞানসম্পন্ন ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের ক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘সে বিশেষ উদ্দেশ্যটা কি?’ সারা সোনিয়া বলল।
‘সে উদ্দেশ্যটা হলো মানুষকে পরীক্ষা করা। পরীক্ষাটা হলো মানুষের মধ্যে যারা সৎ পথে চলবে এবং যারা অসৎ পথে চলবে তাদের বাছাই করা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এ বাছাই করা কেন?’ সারা সোনিয়া বলল।
‘সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ করা। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং দুনিয়ায় বেঁচে থাকার জন্যে হাজারো উপকরণ দিয়েছেন, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ- তারা, গাছপালা, তৃণলতা, পশুপাখির মতো হাজার রকমের সেবা মানুষকে দিয়েছেন, সেটা মানুষের মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়ে যাবার জন্যে নয়। এই দুনিয়ার পর আর একটা প্রতিফলের জগৎ আল্লাহ সৃষ্টি করে রেখেছেন বা সৃষ্টি করবেন, সেখানে মানুষ ঐ বাছাই অনুসারে কর্মফল লাভ করবে, সেটা হবে অনন্ত সুখের জান্নাত, নয়তো চিরন্তন কষ্টের জাহান্নাম। মানুষকে তার কর্মের এই প্রতিফল দেয়ার মাধ্যমেই মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ হবে।’ বলল আহমদ মুসা।আপনার প্রিয়জনের জন্য সেরা উপহার
সারা সোনিয়ার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠেছিল। আহমদ মুসা থামলেও সারা সোনিয়া তৎক্ষণাত কোনো কথা বলল না। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘স্যার, মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে ভয়াবহ কথা আপনি বললেন, তা মানুষের মুখের হাসি মিটিয়ে দেবার মতো। বিষয়টা নিয়ে আরও ভাববো স্যার। মনে হচ্ছে আমাকে, আমার বাবা-মাকে রক্ষার জন্যেও এটা প্রয়োজন। থাক এ ভারি বিষয়টা স্যার। আপনার কাছে আমার একটা জিজ্ঞাসা ছিল, সেটা হলো, আপনার সবচেয়ে আনন্দের এবং সবচেয়ে দুঃখের দিন কোনটি?’
‘স্যরি সোনিয়া। এমন হিসেব-নিকেশ আমি কখনো করিনি আমার দৃষ্টি সব সময় সামনে। এ কারণেই হয়তো পেছনের জীবন নিয়ে এমন হিসেব-নিকেশের সুযোগ হয়নি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘জীবনে হতাশ হয়েছিলেন কখনো?’ সোনিয়া বলল।
‘অনেক বছর আগে চীনের কানসু মরুভূমিতে ছোট ভাইয়ের পোড়া লাশ ও মুমূর্ষু পিতা-মাতাকে নিয়ে যখন বসেছিলাম, যখন দেখছিলাম চারদিকে জ্বলতে থাকা তাঁবুর দাউদাউ করা আগুন এবং অগ্নিদগ্ধ মানুষের লাশের সারি, তখন হতাশায় মুষড়ে পড়েছিলাম। কিন্তু মুমূর্ষু বাবা আমাকে সাহস দিয়ে বলেছিলেন, মুসলমানদের কখনো হতাশ হতে নেই। আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ হতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। তারপর আমার জীবনে আর কোনো হতাশা আসেনি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে স্যার আমি বলব, ওটাই আপনার জীবনের চরম দুঃখের দিন এবং পরম উত্থান ও আনন্দেরও দিন। সারা সোনিয়া বলল।
‘ধন্যবাদ সারা সোনিয়া। আমার জীবনের এই নতুন হিসেব দাঁড় করাবার জন্যে। হয়তো তোমার কথাই ঠিক, কিন্তু আমি আমার জীবনকে এ হিসেবের দৃষ্টিতে কখনো দেখিনি।’ বলল আহমদ মুসা।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা তাকাল প্রেসিডেন্টের দিকে। প্রেসিডেন্ট ডিওডোন ডেভিন হাসিমুখে বসেছিল। বলল আহমদ মুসা তাকে লক্ষ্য করে, ‘এক্সিলেন্সি মি. প্রেসিডেন্ট, অনুমতি দিলে আমি এখন উঠতে চাই।
‘আমার মন চাচ্ছে, আপনার সাথে এই আলোচনা আরও চলুক। আমি অনেক কিছু শিখেছি এই আলোচনা থেকে। বিশেষ করে মানব পরিণতির কথা আমাকে বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। মেয়ের মতো আমিও বলছি, এ বিষয়ে আমি আরও জানতে চাই, বুঝতে চাই।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘আল্লাহ আপনাকে তৌফিক দিন। আপনার মেয়ে এ ব্যাপারে অনেক সাহায্য করতে পারবে। খুব বুদ্ধিমান মেয়ে সে।’ আহমদ মুসা বলল।
মি. আহমদ মুসা, আজই প্রথম বুঝলাম আমার মেয়ে এখন আর সেই ছোট্টটি নেই, অনেক বড় হয়েছে। এমন কিছু প্রসঙ্গ সে আলোচনায় এনেছে, যে সম্পর্কে আমার তেমন কিছু জানা নেই। মি. আহমদ মুসা অনেক আশা আমার এ মেয়েকে নিয়ে। আপনি তাকে আশীর্বাদ করুন।’ বলল প্রেসিডেন্ট।
‘আল্লাহ তাকে অনেক বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান দান করুন এবং কল্যাণের পথ যেন সে পায়। একটা কথা মি. প্রেসিডেন্ট, আপনার মেয়ে যে পোশাক পরেছে, সে রকম পোশাক কি আপনাদের পরিবারে পরা হয়?’ আহমদ মুসা হাসল। হাসল প্রেসিডেন্ট। কিছু বলতে যাচ্ছিল প্রেসিডেন্ট।
সারা সোনিয়া তার আগেই মুখ খুলেছে। বলল, ‘জবাবটা আমিই দিচ্ছি স্যার।’
মুহূর্তের জন্যে থেমে বলল, ‘স্যার, এ পোশাক আমাদের বাড়ির নয়। বাড়িতে আমরা হয় জার্মান, নয়তো আমাদের বুরুন্ডিয়ান পোশাক পরি। আমি যে পোশাক পরেছি, সেটা জার্মানির এক মুসলিম বান্ধবী আমাকে গিফট করেছিল। এক ঈদ উৎসবে আমি তাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। সেই ঈদে সে আমাকে এই পোশাক গিফট করে। আমি সেদিন এ পোশাকটি পরেছিলাম। মাথায় ওড়নাসহ এ পোশাকটি পরে তখন আমার খুব ভালো লেগেছিল। ছুটির দিনগুলোতে কখনো কখনো আমি এ পোশাক পরে বাইরে যাই। কারো তির্যক দৃষ্টি, কারো কারো চোখের বিস্ময় এবং অনেকের সাদর সম্ভাষণ আমার জন্য তখন খুব উপভোগ্য হয়। সবচেয়ে ভালো লাগে মুসলমানদের কাছ থেকে যখন সালাম পাই। সালামের জবাবও দিয়ে থাকি আমি। আপনার মনে প্রশ্ন সৃষ্টির জন্যই আপনার সাথে সাক্ষাতের পোশাক হিসেবে এই পোশাক আমি বেছে নিয়েছি। আমার সৌভাগ্য যে, সত্যই আপনার মনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
‘শুধু প্রশ্ন সৃষ্টি হওয়া নয়, খুশিও হয়েছি সোনিয়া। তবে তুমি যেটা পরেছ সেটা পাকিস্তানী মেয়েদের পোশাক। সেখান…।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানে সারা সোনিয়া বলে উঠল, ‘এটা- মুসলিম পোশাক নয়?’
‘বলতে পারো এটা পাকিস্তানী মুসলমানদের পোশাক। মুসলিম পোশাক বলে বিশেষ ডিজাইনের কোনো পোশাক নেই।’ বলল আহমদ মুসা।
‘মুসলিম বা ইসলামী পোশাক বলে তাহলে কিছু নেই?’ সারা সোনিয়া বলল।
‘না, নেই। তবে ইসলাম মানুষকে একটা শালীন, শোভন ও নিরাপদ পোশাকের একটা ‘ড্রেস কোড’ দিয়েছে, এই ড্রেস কোড অনুসারে যে পোশাক তৈরি হয়, তাকে ইসলামী পোশাক বলা যায়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্যরি স্যার, বিরক্ত করছি। সেই ‘ড্রেস কোড টা কি?’ বলল সারা সোনিয়া।
‘এর উত্তরে অনেক কথা বলতে হয়। বরং ভালো হয় এটা তুমি তোমার জার্মান বান্ধবীর কাছ থেকে জেনে নিও। এ ব্যাপারে সংক্ষেপ কথা হলো, মেয়েদেরকে তার সৌন্দর্যের স্থানগুলো ঢেকে রাখতে হবে এবং ছেলেদেরকে অশ্লীলতা বা অসৌজন্যের পর্যায়ে পড়ে এমন স্থান ঢেকে রাখতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘পোশাক পার্সোনাল চয়েজের বিষয়। এই বিষয়ে কোন আইনি হস্তক্ষেপ মানুষের অধিকার হরণ করে?’ সারা সোনিয়া বলল।
‘না সোনিয়া, কারো কোনো কাজ যখন অন্যের চোখকে, মনকে প্রভাবিত করে, আহত করে, তখন তা পার্সোনাল বিষয় থাকে না। বলল আহমদ মুসা।
‘এমনটা কি ঘটেছে স্যার?’ প্রশ্ন সারা সোনিয়ার।
‘তুমি বার্লিনের রাস্তায় যখন ঘুরো, কোনো বিচে যাও, তখন অনেক দৃশ্য থেকে তোমার চোখ লজ্জায় সরে আসে কিনা?’ বলল আহমদ মুসা।
সারা সোনিয়ার মুখ লজ্জায় কিছুটা আড়ষ্ট হলো। মুখ নিচু করে বলল, ‘তবু মানুষের স্বাধীনতা আমরা মেনে নেই।’
‘এটা মেনে নেয়া অপরাধ। কারণ এটা অপরাধের বিস্তার ঘটায়।’ বলল আহমদ মুসা।
সারা সোনিয়া কিছুটা চুপ থেকে বলল, ‘আপনি যা বলতে চাচ্ছেন, কিছুটা বুঝেছি স্যার। কিন্তু ভাবছি, আপনাদের ইসলাম এত বাস্তববাদী, এতটা জীবনধর্মী?’
‘ইসলাম তো আমাদের নয়, সব মানুষের। আল্লাহ মানুষকে আহ্বান করেছেন তাঁর ডাকে সাড়া দেয়ার জন্যে। যারা তার ডাকে সাড়া দেয়, তাদেরই নাম দেয়া হয়েছে ‘আত্মসমর্পিত’ বা ‘মুসলিম’।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা তাকাল প্রেসিডেন্টের দিকে। বলল, ‘এক্সিলেন্সি, আমি এখন উঠব অনুমতি পেলে।
প্রেসিডেন্ট জবাব দেয়ার আগেই সারা সোনিয়া বলল তড়িঘড়ি করে, ‘স্যার, জানার আগ্রহ আমার বাড়িয়ে দিলেন। এখন অনেক প্রশ্ন এসে আমার মাথায় ভিড় করেছে।’
‘মা, শুধু তোমার মাথায় নয়, আমার মাথায়ও কিছু জরুরি প্রশ্ন এসে জমেছে। কিন্তু আহমদ মুসাকে তো আটকানো যাবে না। সে কাজের মানুষ। তার প্রতিটা মুহূর্ত মূল্যবান। এসো তাকে আমরা বলি, তিনি যেন আমাদের জানার এই আগ্রহ পূরণের ব্যবস্থা করেন। থামলো প্রেসিডেন্ট।
‘এমন সুযোগ আছে। আমি চেষ্টা করব এক্সিলেন্সি।’ বলল আহমদ মুসা।
প্রেসিডেন্ট উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘ধন্যবাদ মি. আহমদ মুসা এই মূল্যবান প্রতিশ্রুতির জন্য। ধন্যবাদ আমাদেরকে এই আতিথ্যের সুযোগ দেয়ার জন্যে।
আহমদ মুসা ও সারা সোনিয়াও উঠে দাঁড়িয়ে ছিল।
আহমদ মুসা বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলো।
লিফট পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আহমদ মুসাকে পৌঁছে দিল। আর সারা সোনিয়া এগোলো আহমদ মুসার গাড়ি পর্যন্ত। গাড়ির দরজা খুলে আহমদ মুসাকে গাড়িতে উঠিয়ে দিল। বলল, ‘হ্যান্ডশেক করতে খুব ইচ্ছা করছে, আমাদের একটা কালচার তো এটা। কিন্তু তাতো এখন হবার নয়।’ হাসতে হাসতে বলল সারা সোনিয়া।
‘এত কথা শোনার পর এমন হ্যান্ডশেকের ইচ্ছে কি এখনো আছে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্যার, আপনার ভারি কথাগুলো বুঝতে, হজম করতে আরো সময় লাগবে।’ বলল সারা সোনিয়া।
একটু থেমেই সারা সোনিয়া আবার বলে উঠলো, ‘স্যার, আপনার অন্তহীন স্মৃতির ভিড়ে অন্ধকার আফ্রিকার এই ছোট্ট বুজুমবুরাকে কি আপনার মনে থাকবে?’
‘আমার জীবনে হাজারো বুজুমবুরা রয়েছে, তাদের কাউকেই আমি ভুলিনি। সুজলা সুফলা সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী বুজুমবুরাকেও ভুলবো না ইনশাআল্লাহ। আসি সোনিয়া, দোয়া করি তোমার মতো সোনিয়ারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শোষিত আফ্রিকায় মুক্তির সফেদ আলো প্রজ্জ্বলিত করুক।’
‘ধন্যবাদ, সালাম আলাইকুম।’ বলে সারা সোনিয়া ভারাক্রান্ত মুখে একখণ্ড হাসি টেনে গাড়ির দরজা লাগিয়ে দিল।
গাড়ি চলতে শুরু করল আহমদ মুসার।
.
সময়টা বাদ মাগরিব।
সোফায় বসতে বসতে আহমদ মুসা ইদি আসুমানি মোহাম্মদ এবং আসমানি আব্দুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আপনাদের অনেক ধন্যবাদ জনাব জাঞ্জিবার থেকে আশা আমার কয়েকজন মেহমানকে স্টপ ওভারের সুযোগ দেয়ার জন্য।’
‘স্টপ ওভার কেন? আমাদের মেহমান ওরা। আপনাকে ধন্যবাদ যে ওদেরকে মেহমানদারীর সুযোগ আপনি আমাদের করে দিয়েছেন।’ বলল আসমানি আব্দুল্লাহ।
‘আমাদের সে মেহমানরা কোথায়?’ আসুমানি আবদুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ।
‘আমার ঘরে তারা বসেছেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘দুঃখিত ভাই আহমদ মুসা। সামান্য একটু গড়বড় হয়েছে। আসুমানি আব্দুল্লাহ, আমর আসমানি মোহাম্মদ দুজনেই বাইরে ছিল। আমিও ঘুমিয়ে ছিলাম। আর ভাই আহমদ মুসা, তুমিও সময়টা জানাতে পারনি যে কখন আসছো। তার ফলেই একটু অসুবিধা হয়েছে। যাক, তুমি ওদের ওখানে না বসিয়ে সাথে করে এখানে নিয়ে আসলে ভালো হতো ভাই।’ বলল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ।
‘ব্যস্ত হবেন না জনাব। ওখানে ওদের সাথে আমর মোহাম্মদ রয়েছে। আর ওরা ঠিক সেরকম মেহমান নন। ওরা আমার কাছে একটু সময় চায় কিছু কথা বলার জন্যে। যেহেতু ওদের এখানে নিয়ে এলে নিরিবিলি কথা বলার সুবিধা হয়, সেজন্যই ওদের এখানে নিয়ে এসেছি আমি। কথা বলেই চলে যাবেন ওরা।’ আহমদ মুসা বলল।
ইদি আসুমানি মোহাম্মদ তাকালো ছেলে আসমানি আব্দুল্লাহর দিকে। বলল, ‘যাও মেহমানদের এখানে নিয়ে এসো। আর নাস্তা যা আছে দিতে বল।’
‘ঠিক আছে বাবা।’ বলে আসুমানি আব্দুল্লাহ উঠে দাঁড়াল। বের হয়ে গেল ড্রয়িং রুম থেকে।
অল্পক্ষণ পর আসুমানি আব্দুল্লাহ সিতি সাবেরা, আলী মুইজি, সাবেরার বাবা এবং কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলীকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়ালো। প্রথমে সিতি সাবেরার বাবা ওমার আব্দুর রহমান, কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী এবং সিতি সাবেরা, মুইজিকে ইদি আসুমানি মোহাম্মদ ও আসুমানি আব্দুল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। ইদি আসুমানি মোহাম্মদ ও আসুমানি আব্দুল্লাহ এবং তাদের পরিবারের পরিচয় দিল আহমদ মুসা।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই ওমার আব্দুর রহমান, সিতি সাবেরার বাবা, উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘আল্লাহু আকবার, এই ঐতিহ্যবাহী পরিবারের কথা আমি অনেক শুনেছি। বুজুমবুরার মহান মিশনারি, বুজুর্গ ওস্তাদ এবং বুজুমবুরার প্রথম মসজিদের প্রথম ইমাম ইদি আসুমানির পরিবার এটা। পরে ইউজিজির সালিহ পরিবারের সাথে যুক্ত হয়। এই সালিহ আসুমানি পরিবার বুরুন্ডির মুসলমানদের কাছে ধ্রুবতারার মতো। মহান পরিবারটির সাথে পরিচিত হতে পারায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি।
ইদি আসুমানি মোহাম্মদ হাত বাড়িয়ে ওমার আব্দুর রহমানের সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘আমাদের পরিবার সম্পর্কে এত কথা আপনি জানলেন কি করে?’
‘জাঞ্জিবার নৌ বাহিনীর কমান্ডার মেজর জনাব শাকির সাঈদ সালিহ আমার প্রতিবেশী ছিলেন এবং উভয় পরিবারের মধ্যে যাতায়াত ও বন্ধুত্ব ছিল। তারা ইউজিজির অধিবাসী ছিলেন। তার কাছ থেকে এসব জানা। বলল ওমার আব্দুর রহমান।
‘তাহলে তো তোমরাও আমাদের আত্মীয় হয়ে গেলে। সালিহ পরিবার এবং আমাদের আসুমানি পরিবার তো একই পরিবার।’ ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ। আসুমানি পরিবারের আত্মীয় হতে পারা অনেক সৌভাগ্যের।’ বলল ওমার আব্দুর রহমান।
আসুমানি আব্দুল্লাহ ড্রয়িং রুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। ফিরে এসেই তার বাবা ইদি আসুমানি মোহাম্মদকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বাবা টেবিলে মেহমানদের জন্য খাবার দেয়া হয়েছে।’
‘নিয়ে যাও মেহমানদের ওখানে।’ বলল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ।
‘সিতি সাবেরা তুমি অন্দরে যাও। খাওয়ার সময় সবার সাথে পরিচয়ও হয়ে যাবে। এখন এরা তোমাদের আত্মীয় পরিবার হয়ে গেলেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ঠিক তাই মা, তুমি ভেতরে যাও। চলো তোমাকে ভেতরে দিয়ে আসি।’ আসুমানি আব্দুল্লাহ বলল।
‘ধন্যবাদ’ বলে সিতি সাবেরা উঠল। তার সাথে সবাই উঠল। আহমদ মুসাও উঠল। বলল, আমি লাঞ্চ করেছি। আমি আমার
রুম থেকে একটু ঘুরে আসি এই ফাঁকে।’
‘ঠিক আছে ভাই।’ বলল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ।
খাওয়া সেরে মেহমানরা এসে বসল ড্রয়িং রুমে।
আহমদ মুসা তখনও আসেনি।
মেহমানরা সবাই বসলে ইদি আসুমানি মোহাম্মদ জিজ্ঞাসা করল ওমার আব্দুর রহমানকে, ‘প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সামনে সন্ত্রাসী হামলার ভয়াবহ রক্তারক্তির সময় আপনারা ওখানে কিভাবে এলেন?’
‘আহমদ মুসার সন্ধানে আমরা বুরুন্ডি এসেছি। কিন্তু কোথায় তাকে পাওয়া যাবে, তা আমাদের জানা ছিল না। তবে আমরা নিশ্চিত ছিলাম বুরুন্ডির ইসলামী সংগঠন ও ব্যক্তিত্বের কেউ না কেউ আহমদ মুসার সম্পর্কে অবশ্যই জানবে। সেজন্য তাদেরই একজনের খোঁজে আমি যাচ্ছিলাম বুরুন্ডির তানজানিয়া দূতাবাসে। প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সামনে এসে ঝামেলার মধ্যে পড়ে যাই।’
‘আপনারা যেভাবে এসেছেন, এভাবে কি আহমদ মুসার খোঁজ পাওয়া যায়!’ বলল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ।
‘তা যায় না। কিন্তু আমাদের আর কোনো বিকল্প পথ ছিল না। বুজুমবুরায় তিনি আছেন, এটুকুই আমাদের জন্য একটা বড় আশার আলো হিসেবে দেখা দেয়।’ বলল ওমার আব্দুর রহমান।
‘তাহলে তো আহমদ মুসার দেখা পাওয়া খুব জরুরি প্রয়োজন আপনাদের?’ ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলল।
এ সময় আহমদ মুসা ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করল। তখন ওমার আব্দুর রহমান কথা বলা শুরু করেছিল। বলল সে, ‘জ্বি হ্যাঁ, খুব জরুরি প্রয়োজন।’
আহমদ মুসা বসতেই ইদি আসুমানি মোহাম্মদ আহমদ মুসাকে বলল, ‘আমি মেহমানদের সাথে কথা বলছিলাম। তারা খুব জরুরি প্রয়োজনে তোমার কাছে এসেছে ভাই আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা তাকালো ওমার আব্দুর রহমানের দিকে। বলল, ‘আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন। তিনি মানুষের সব প্রয়োজন পূরণ করেন। সকল বিপদ মুসিবত থেকে তিনি মানুষকে রক্ষা করেন।
একটু থামল আহমদ মুসা। তাকালো ওমার আব্দুর রহমানের দিকে। বলল, ‘জনাব আপনাদের কথা কি এখন এখানে বলা যাবে?’
‘জি, হ্যাঁ বলা যাবে। সবাই জানলে আমাদের জন্য ভালো।’ বলল ওমার আব্দুর রহমান।
‘আলহামদুলিল্লাহ। শুরু করেন।’ বলল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ ওমার আব্দুর রহমানকে।
‘সে এক ভয়াবহ বিপদের কাহিনী!’ বলে কথা শুরু করল ওমার আব্দুর রহমান। ‘কিন্তু বিপদটা আমার নয় এবং বিপদটা আমাদের দেশেরও কারো নয়। বিপদটা কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলীর পরিবার এবং সুবর্ণ দ্বীপের মুসলমানদের। এ বিষয়ে…’
ওমার আব্দুর রহমানের কথার মাঝখানে আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘এই ‘সুবর্ণ দ্বীপ’টা কোথায়? দ্বীপটা কি কোনো রাষ্ট্র?
ওমার আব্দুর রহমান তাকালো কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলীর দিকে। বলল, ‘এই জবাবসহ পরের কথাগুলো আপনারই বলা উচিত।’
‘ধন্যবাদ জনাব।’ বলে একটু থামলো কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী লোফার উপর একটু সামনে ঝুঁকে বসল সে। বলল, ‘আল্লাহর হাজার শোকর, মহান ভাই আহমদ মুসার সাথে দুর্লভ এই সাক্ষাৎ এবং কথা বলার সুযোগ তিনি দিয়েছেন সেজন্য। ধ্বংসপ্রায় এক জনগোষ্ঠীর হৃদয়ের সীমাহীন আকুতি তুলে ধরার তৌফিক আল্লাহ আমাকে দিন।
আবার একটু থামলো কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী। একটু মাথা নিচু করল। মুহূর্তেই আবার মাথা তুলে শুরু করল, ‘ভারত মহাসাগরের দক্ষিণপ্রান্তে চারদিকের অথৈ পানিতে লুকানো ‘সুবর্ণ দ্বীপে’ আশ্রয় গ্রহণকারী মিশনারি ও রাজনীতিক এবং বিজ্ঞ জ্ঞানসাধক ওস্তাদ আব্দুল্লাহ আল আলী বিন আব্দুর রহমানের একজন উত্তরসূরী আমি। জনাব আব্দুল্লাহ আলী বিন আব্দুর রহমান দ্বীপের সবার কাছে ‘দরবেশ’ নামে পরিচিত। দরবেশ আব্দুল্লাহ আলী বিন আব্দুর রহমান স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে মিলে দ্বীপে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। উনিশ শতকের প্রথম ভাগে দ্বীপটি ইউরোপের উপনিবেশিক শক্তি ষড়যন্ত্র ও গণহত্যার মাধ্যমে দখল করার পূর্ব পর্যন্ত ইসলামী খেলাফত টিকে ছিল। উপনিবেশিকদের অব্যাহত হত্যা নির্যাতনের মধ্যে স্থানীয় মানুষরা এখন পশুর মতো জীবন নিয়ে বেঁচে আছে। সম্প্রতি তাদের অত্যাচার চরমে উঠেছে। স্থানীয় লোকদের নির্মূল করে সেখানে শাসকরা শ্বেতাঙ্গদের এনে বসাতে চায়। স্থানীয় অধিবাসীরা নিজেদের রক্ষার জন্য সঙ্ঘবদ্ধ হবার চেষ্টা করছে। গঠিত হয়েছে ফিলিস্তিনের অনুকরণে ‘সাগর সাইমুম’। আমারই এক ভাই কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ ‘সাগর সাইমুমকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তিনি তার কয়েকজন সাথীসহ দ্বীপের শাসক ভিক্টর বাহিনীর হাতে বন্দী হয়েছেন। সেই সাথে শুরু হয়েছে স্থানীয় অধিবাসীদের নির্মূল করার ওদের প্রোগ্রাম। বন্দী আমার ভাই ও অন্যরা ততক্ষণ পর্যন্ত বেঁচে আছে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে সব তথ্য আদায় করা না যায়। তাদেরকে এবং স্থানীয় অধিবাসীদের রক্ষার জন্য সেখানে জরুরি সাহায্য প্রয়োজন। আমি ওআইসির মাধ্যমে কিছু করা যায় কিনা চেষ্টা করেছি। পরিচিত কয়েকটি সরকারকেও বলেছি। কিন্তু তারা এটা খুব বড় কাজ নয় মনে করে এড়িয়ে গেছে। ওআইনির সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, ‘জাতিসংঘসহ গোটা পশ্চিমের সমর্থন রয়েছে দ্বীপটির বর্তমান সরকারের প্রতি। এমন কি দ্বীপ রাষ্ট্রটিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য করার জন্য প্রস্তাব উঠেছে এবং নিশ্চিতই বলা যায় দ্বীপটি সদস্যপদটি পেয়েও যাবে। এই অবস্থায় কার্যকরী কিছু করার সুযোগ নেই বললেই চলে। আমি যখন হতাশ, সেই সময় জনাব ওমার আব্দুর রহমানের কাছে আপনার কথা শুনলাম যে, আপনি বুজুমবুরায় এসেছেন। এই খবর শুনে আমার মনে আশা জাগল, আল্লাহর সাহায্য হয়তো আমাদের জন্যে আসবে। এই সাহায্যের আশায় আপনার খোঁজে আমরা বুজুমবুরায় এসেছি। দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে থামল কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী।
আহমদ মুসা গভীর মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছিল। তার চোখে মুখে বেদনা ভরা গাম্ভীর্য।
কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলীর কথা শেষ হলে আহমদ মুসা সোফায় হেলান দেয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘ভাই আব্দুল্লাহ আলী, আপনার কথা অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। প্রশ্নগুলোর জবাব পেলে ভালো হয়।’
‘প্রশ্নগুলো বলুন জনাব।’ বলল কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী।
‘ধন্যবাদ কমান্ডার আলী। আমার প্রথম জানার বিষয় হলো, ভারত মহাসাগর ও কুমেরু সাগর এলাকায় মানব বসতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্বলিত ‘সুবর্ণ দ্বীপ’ নামের কোনো দ্বীপ আছে বলে আমার জানা নেই। আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, আপনি বললেন দরবেশ আব্দুল্লাহ আলী বিন আব্দুর রহমান ‘সুবর্ণ দ্বীপে’ আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাহলে জাহাজডুবি কিংবা শত্রুর তাড়া খাওয়া লোক বা লোকদের আশ্রয় নেবার প্রশ্ন ওঠে? ওস্তাদ দরবেশ আব্দুল্লাহ আলী বিন আব্দুর রহমান দ্বীপটিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন কেন? তৃতীয়ত: জানতে চাই দ্বীপটিতে মুসলিম ও আদিবাসীর সংখ্যা কত? দ্বীপ দখলকারী উপনিবেশিক শক্তি কারা? মানে তারা কোন দেশের? আর শেষ জানার বিষয় হলো, ‘সাগর সাইমুম’ নামটা আপনারা কোথায় পেলেন?’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসার প্রশ্ন শেষ হলে কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী বলল, ‘জনাবের প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে হলে অনেক কথা বলতে হয়। জনাব চাইলে এবং সবাই অনুমতি দিলে যে স্টোরিটা আমি বংশানুক্রমে পেয়েছি সেটা বলতে পারি। তবে শেষ প্রশ্নের জবাব হিসেবে বলছি, আমি বাবার কাছ থেকে শুনেছি ফিলিস্তিন ও মধ্য এশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠন ‘সাইমুম’-এর নামটাই তিনি সুবর্ণ দ্বীপে আমার ভাই এবং বর্তমানে ঔপনিবেশিকদের হাতে বন্দী কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহর বাবা দিয়েছিলেন।
কর্নেল ওবায়দুল্লাহর বাবাই ‘সাইমুম’ নামের আগে ‘সাগর’ যোগ করে সুবর্ণ দ্বীপের গোপন স্বাধীনতা সংগ্রামের সংগঠনটির নাম রাখেন ‘সাগর সাইমুম’। আরেকটা কথা জনাব, সুবর্ণ দ্বীপের নাম এখন আর কেউ জানে না, আপনারাও সেই কারণে শোনেননি। ‘সুবর্ণ দ্বীপ’ এখন আর তার নামে নয়। নাম বদলে ঔপনিবেশিক দখলদাররা তার নাম রেখেছে ‘ভিক্টর আইল্যান্ড রিপাবলিক’
একটু থামলো কমান্ডার আলী। সেই সুযোগে আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘জনাব কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী আপনাদের বংশানুক্রমিকভাবে আশা সেই স্টোরিটাই আমাদের শোনান।
কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী তার সোফায় একটু নড়েচড়ে বসল। বলল, ‘সম্মানিত মহোদয়গণ, আমি যে স্টোরিটা বলব, সেটা আজকের নামহারা সুবর্ণ দ্বীপের পূর্বকথা। সেটা ক্ষুদ্র, অসহায় একটি উদ্বাস্তু মানুষের নামহীন একটা দ্বীপে অধিবাস গ্রহণ এবং সে দ্বীপের বৈরী আদিবাসীদের আপন করে নিয়ে একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠন এবং প্রায় ছয়শ’ বছর ধরে তার শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হবার কাহিনী।’ আবার একটু থামল কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী।
সঙ্গে সঙ্গেই ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলে উঠল, ‘তোমার স্টোরির এই ভূমিকা আমার আগ্রহ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তোমার কথা আর একটু উঁচু ভয়েজে হলে ভালো হয়। পাশে বৈঠকখানার আরেক অংশে আমাদের মেয়েরা থাকার কথা। তারা যেন তোমার স্টোরি থেকে বঞ্চিত না হয়
‘ধন্যবাদ জনাব।’ কথা শুরু করল কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী, ‘আমাদের পঞ্চাশ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের সুবর্ণ দ্বীপ ভারত মহাসাগরের কঠিন এক ঝঞ্ঝাময় এলাকায় অবস্থিত। ভারত মহাসাগরের দক্ষিণাংশে কোকো আইল্যান্ড থেকে চারশ’ মাইল দক্ষিণে কুমেরু সাগরের সেন্ট পল দ্বীপ থেকে তিনশ’ মাইল উত্তরে এবং আফ্রিকার মরিশাস ও অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় সম দূরত্বের সাগরবক্ষে সুবর্ণ দ্বীপটির অবস্থান। ভারত মহাসাগরের তলদেশকে পূর্ব-পশ্চিমে বিভক্তকারী উত্তর-দক্ষিণে বিলম্বিত শৈলশীরাটি সুবর্ণ দ্বীপের গা ঘেঁষে চলে গেছে। আরো দুটি দ্বিখণ্ডিত সমান্তরাল শৈলশীরা আছে দ্বীপটির কিছুটা দক্ষিণে। মধ্য ভারত মহাসাগরীয় স্রোতটি পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে ঘুরে দক্ষিণ কুমেরু সাগরের ঠান্ডা স্রোত ও দক্ষিণ-পূর্বের গভীর স্রোত শৈলশীরায় ধাক্কা খেয়ে দ্বিখণ্ডিত শৈলশীরাগুলোর উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ডিঙিয়ে এসে দুটি সমান্তরাল ধারায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে সুবর্ণ দ্বীপের উপর। ঝড় ও স্রোতের ঘূর্ণি দ্বীপের চারদিকটাকে বিপদজনক করে রেখেছে। ভারত মহাসাগরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলো এটা জানে। তাই ভুলেও কোনো জাহাজ এদিকে আসে না।
সাগরের অবিরাম গর্জন আক্রান্ত ঝজ্ঞাপূর্ণ এই দ্বীপটিতে তখন বাস করতো দুই হাজারের মতো মানুষ। বনচারী এই মানুষদের গায়ের রং কারো সবুজাভ কালো, আবার কারো পিতাভ-বাদামী, বর্ণিও অঞ্চল ও অস্ট্রেলীয় আদিবাসীদের সাথে অনেকটাই মিল আছে তাদের।
. ত্রয়োদশ শতাব্দীর কথা। মঙ্গলদের মহাবিপর্যয়কর আগ্রাসনে বাগদাদের পতনের পর কোনো এক সময় রাজনৈতিক কারণে বিতাড়িত বা পালানো তিন হাজার নারী-পুরুষের একটা বিরাট দল নিয়ে ৭টি জাহাজের একটা বহর দরবেশ আব্দুল্লাহ আলী বিন আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে ইরাকের আবাদান বন্দর থেকে জাঞ্জিবারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। পথে তারা এক প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে। জাহাজগুলো ভাসতে ভাসতে ঝড়-ঝঞাময় এক দ্বীপের বলয়ে গিয়ে আছড়ে পড়ে। দ্বীপ দেশটির ঘূর্ণিস্রোত টেনে নিলো জাহাজগুলোকে খড়-কুটোর মতো। ঘূর্ণিস্রোত ও ঝড়ের বিপরীত গতি সাগরকে ধ্বংসকরী করেছে। ঢেউ ও ঝড়ের কাছে জাহাজগুলো ছিল খেলনার মতো বিপর্যস্ত। ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলো ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলো। কয়েক হাজার শিশু, নারী, পুরুষের কান্নাও ঝড় আর সাগরের গর্জনের মধ্যে হারিয়ে গেল।
দরবেশ আব্দুল্লাহ আলী বিন আব্দুর রহমান তার কমান্ডিং জাহাজের একটা ঘরে নামাজে রত ছিলেন। শেষ মুহূর্তে তিনি ছুটে বেরিয়ে এলেন ডেকে। প্রায় ডুবন্ত জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে হাত তুলে অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘হে সকলের মাবুদ, সকলের স্রষ্টা, প্রতিপালক ও রক্ষাকর্তা, আমাদের নৌবহরের নারী-শিশু-যুবক- বৃদ্ধ আপনার আশ্রয় চাচ্ছে। মাবুদ, আপনার ক্রোধের চেয়ে আপনার দয়া অনেক বড়। আপনার সেই দয়ারই আশ্রয় আমরা চাচ্ছি। আপনি আমাদের ধ্বংস করলে তাতে বাঁধা দেয়ার কেউ নেই, আর রক্ষা করলে তাতে বাঁধ সাধবার ক্ষমতাও কারো নেই। আপনি এক এবং একক। শরীক বিহীন। সকল রাজ্যের অধিপতি আপনিই। সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা শুধুই আপনার জন্য। আপনি সর্বশক্তিমান, সবার উপর ক্ষমতাশালী। আমাদের সব প্রার্থনা, সব চাওয়া আপনার কাছেই।
প্রার্থনা শেষ হওয়ার সাথে সাথে দরবেশ বুকফাটা কান্নায় আছড়ে পড়লেন উথাল পাথাল জাহাজের ডেকে। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন দরবেশ।
খালিক, মালিক আল্লাহ। অসীম ক্ষমতা তাঁর। মুহূর্তেই ঝড় থেমে গেল। শান্ত হয়ে গেল ঢেউয়ের ধ্বংসকরী উথাল পাথাল। শুধু নৌবহরের এলাকা নয়, দ্বীপটির চারপাশের গোটা সাগর শান্ত হয়ে গেল, যেন উত্তাল সাগর ঘুমিয়ে পড়লো কত শতাব্দী পর।
ধীরে ধীরে চোখ খুললেন দরবেশ। ঝড় ও সাগরের গর্জন শুনতে পেলেন না। তার জাহাজ স্থির। নৌবহরের অন্যান্য জাহাজও সারবেঁধে শান্তভাবে দাঁড়ানো। সাগরবক্ষ ঘুমন্ত। বদ্ধ জলাশয়ের মতো নিস্তরঙ্গ সাগরের পানি। উঠে বসে আবার সেজদায় চলে গেলেন দরবেশ।
দরবেশকে উঠে বসতে দেখে, বেঁচে আছেন দেখে ‘আল্লাহ আকবর’ ধ্বনি দিয়ে উঠল নৌবহরের নারী-পুরুষ সকলেই। তারাও দরবেশের সাথে সিজদায় পড়ে গেল আল্লাহর প্রতি অসীম প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতায়।
দরবেশ দেখলেন তার কমান্ডিং জাহাজের মাথা গিয়ে স্পর্শ করেছে দ্বীপের সমতল একটা পাথুরে তীর-ভূমিতে। স্থানটা যেন একটা সুন্দর প্রাকৃতিক জেটি। সেটা দ্বীপের অভ্যন্তরে ঢোকার একটা দরজাও যেন। এর দুপাশেই উপকূল বরাবর সবুজ পাহাড়ের দেয়াল। ভেতরে তাকিয়ে দেখতে পেল গাছ-গাছালিতে ভরা সবুজ একটা দেশ। লতাপাতা ও গাছে গাছে ঝুলছে আঙ্গুর, আপেলসহ বিভিন্ন ফল। পাকা- কাঁচা পেঁপেতে ভরা পেঁপে গাছ। দূরবীন দিয়ে দেখলেন দ্বীপটা যেন ফলের একটা সাজানো ডালা। তার সাথে কয়েকটা ধান ও গমের গাছ দেখতে পেয়ে বিস্মিত হলেন দরবেশ। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে উঠলেন দরবেশ। বললেন, ‘এটা একটা সুন্দর ‘সুবর্ণ দ্বীপ’। দরবেশের এই ‘সুবর্ণ দ্বীপ’ কথা থেকেই দ্বীপের নামকরণ হয়ে যায় ‘সুবর্ণ দ্বীপ’। সম্ভবত দ্বীপের এটাই প্রথম নামকরণ।
দরবেশ নৌবহরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘জাহাজগুলো সব নোঙর করো।’
নোঙর করা হলো সাতটি জাহাজ। সিঁড়িও পাতা হলো। কমান্ডিং জাহাজের সিঁড়িতে পা রাখলেন দরবেশ তীরে নামার জন্যে।
‘জনাব, নিরাপত্তার জন্য কিছু লোককে অস্ত্রসহ আগে নামিয়ে দিলে ভালো হতো না?’ বলল নৌবহরের প্রধান নিরাপত্তা উপদেষ্টা আবু আমর আব্দুল্লাহ। তিনি আব্বাসীয়দের সাবেক একজন সেনাধ্যক্ষ।
‘না, কোনো অস্ত্র নামবে না এই সুন্দর ‘সুবর্ণ দ্বীপে’। এই দ্বীপ আমাদের জন্য আল্লাহর দান। আমরা ইচ্ছা করে এখানে আসিনি। যিনি এনেছেন তিনি আমাদের নেগাহবান।’ বললেন দরবেশ শান্ত কিন্তু দীপ্ত কণ্ঠে।
‘কিন্তু জনাব, এ ধরনের দ্বীপে সাধারণত ভয়ানক সব আদিবাসী- রা বাস করে। সেনা অফিসার বলল।
‘যদি আদিবাসীরা এ দ্বীপে থাকে, তারা আমাদের মারবে? মারুক। আমরা তাদের মারব না। দু’হাত বাড়িয়ে ভাই হিসেবে তাদের বুকে জড়ানোর জন্য আহ্বান জানাতে থাকব। তারা আমাদের কয়জনকে মারবে? আমরা যদি পাল্টা আক্রমণ না করি, তাহলে তাদের অস্ত্র ধরা হাত একসময় নিচে নেমে যাবে। অস্ত্র নয়, ভালোবাসা দিয়ে তাদেরকে আমাদের আপন করে নিতে হবে।’ বললেন দরবেশ স্থির ও শান্ত কণ্ঠে।
আলহামদুলিল্লাহ, আপনি ঠিক বলেছেন জনাব। কিন্তু আমার একটা অনুরোধ, অস্ত্র আমাদের সাথে থাকুক। আক্রান্ত হলেও আমরা পাল্টা অস্ত্র ব্যবহার করব না, একের পর এক লোক মারা গেলেও অস্ত্র আমরা তাদের বিরুদ্ধে তুলবো না, তাতে ফল আরো ভালো হবে। আমাদের সদিচ্ছা এবং আমরা তাদের শত্রু না হবার ব্যাপারে তারা নিশ্চিত হতে পারবে।’ বলল নিরাপত্তা উপদেষ্টা আবু আমর আব্দুল্লাহ।
দরবেশ খুশি হলেন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আবু আমর তুমি ভালো পরামর্শ দিয়েছো।’ অস্ত্র সাথে নেবার নির্দেশ দেয়া হলো সকলকে।
দরবেশ জাহাজ থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামলেন। পা রাখলেন অজানা, অচেনা দ্বীপের মাটিতে। তার সাথে নামল আরো অনেকে।
দ্বীপে নেমে দরবেশ কয়েক ধাপ হাঁটলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা কীর্তন এবং রাসূল (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণ করলেন। তারপর পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আল্লাহ দয়া করে এক ঝড়ের সাহায্যে উত্তাল এক সাগর এলাকা পাড়ি দিয়ে আমাদেরকে এই দ্বীপে এনেছেন। আমরা সব হারানোর পর আল্লাহ আমাদের একটি দ্বীপ দিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের হাজার শোকর। এই দ্বীপে যদি আল্লাহর বান্দা কোনো আদিবাসী থাকেন, তাহলে তারাই এই দ্বীপদেশের আদি মালিক। আমরা ওদের ভাই হবো। ভাইয়ের অংশীদার হিসেবে এই দ্বীপের এবং এর সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ এই দ্বীপে এনে যে অধিকার আমাদের দিয়েছেন, সেই অধিকার বলে আদিবাসীদের সাথে মিলেমিশে ইনসাফের সাথে এর ভোগ-দখল করব। সকলকে সবসময় এই কথা মনে রাখতে হবে। আল্লাহর রাসূল (সা.) মদিনার আনসারদের যে মর্যাদা দিয়েছিলেন সে মর্যাদাই তারা পাবে।
দরবেশ আব্দুল্লাহ আলী প্রসঙ্গক্রমে দ্বীপটিকে ‘সুবর্ণ দ্বীপ’ নামে অভিহিত করেছিলেন। কালক্রমে সেটাই হয়ে গেল দ্বীপটির নাম। সত্যিই সম্পদের সোনায় ভরা ‘সুবর্ণ দ্বীপ’টি। চারদিকে পাহাড় ঘেরা দ্বীপটি। কর্কটক্রান্তির কিছুটা দক্ষিণে দাঁড়ানো দ্বীপটিতে গ্রীষ্ম প্রধান ও শীত প্রধান দেশের সব ফলই কম-বেশি পাওয়া যায়। আঙুর, পিচ, আপেল, আনার, আম, কাঁঠাল, পেঁপে ইত্যাদি সব ফলই এখানে জন্মে। শস্যের মধ্যে গম, সরিষা, ধান, সয়াবিন, বিভিন্ন ধরনের কলাই জাতীয় শস্য উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত দ্বীপটির মাটি। আদিবাসীরা খাদ্যের জন্য ফলমূল ও শিকারের উপর নির্ভরশীল বলে কৃষি কাজের প্রচলন হয়নি। দ্বীপটি উঁচু-নিচু টিলা ও ছোট-বড় উপত্যকায় ভরা। সর্বত্রই গাছে গাছে ফলের সমারোহ। দরবেশের নেতৃত্বে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটল। আরবরা সে সময় ফল ও কৃষি উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রেই পারদর্শী ছিল।
সুবর্ণ দ্বীপে গড়ে উঠলো সুশৃংখল এক মানববসতি। আদিবাসীরা প্রথমে মারমুখো ছিল। আট-দশ জন আরব এ সময় আদিবাসীদের হাতে নিহত হয়। কিন্তু আরবরা প্রতিশোধ নিতে এগোয়নি। বরং দুই হাত বাড়িয়ে দরবেশ তাদেরকে বন্ধুত্বের আহ্বান জানিয়েছে। পরবর্তী এক ঘণ্টায় চারজন আরব আদিবাসীদের হাতে নিহত হলে দরবেশ একাই আক্রমণে আসা প্রায় দু’শ আদিবাসীদের দিকে এগিয়ে যায় একটা গাছের ডালে সাদা কাপড় উড়িয়ে। তার সাথে তরবারি ছিল, কিন্তু তা ছিল খাপে আবদ্ধ। আদিবাসীরা তাদের হাতের বর্ষা, তীর তাক করে দাঁড়ায় দরবেশের দিকে। কিন্তু দরবেশ হাসিমুখে তাদের দিকে এগোতেই থাকে। দরবেশ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো আদিবাসীদের সরদারের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আদিবাসীরা চারদিক থেকে দরবেশকে ঘিরে ফেলে। দরবেশ আদিবাসীদের সরদারের সামনে দাঁড়িয়ে তরবারি খাপ থেকে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেয় দূরে। তারপর দুহাত প্রসারিত করে সর্দারের দিকে। সরদার কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থাকে দরবেশের চোখের দিকে। পরে ডান হাত উপরে তুলে একটা ধ্বনি করে। সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসীরা তাদের হাতের অস্ত্র মাটিতে ফেলে দেয়। সর্দার জড়িয়ে ধরে দরবেশকে। এরপর আদিবাসীদের হাতে আর কখনো অস্ত্র ওঠেনি আরবদের বিরুদ্ধে। ধীরে ধীরে দরবেশের পিতৃসুলভ, ভ্রাতৃসুলভ, অভিভাবকসুলভ ব্যবহার জয় করে নিল আদিবাসীদেরকে। আদিবাসীদের পাঁচশ’ পরিবার মিশে গেল আরব মুসলিম পরিবারের সাথে। দরবেশ হয়ে গেল আদিবাসীদের কাছে ‘মাথার তাজ’। উভয় গ্রুপ উভয়ের ভাষা আয়ত্ত করতে লাগল। দরবেশ আদিবাসীদের চিনিয়ে দিল তাদের এবং সব মানুষের স্রষ্টা কে, প্রতিপালক ও শেষ বিচার দিনের মালিক কে। আদিবাসীরা দরবেশের স্রষ্টাকে তাদের স্রষ্টা, প্রতিপালক ও শেষ বিচার দিনের মালিক হিসেবে গ্রহণ করল।
সময় বয়ে চলল। ‘সুবর্ণ দ্বীপ’ হয়ে উঠল ইসলামী জীবন ব্যবস্থার অনুসরণে একটা আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র। সুবর্ণ দ্বীপের সকলে মিলে দরবেশকেই সিংহাসনে বসায়। পাথর সাজিয়ে তাতে মাটির প্লাস্টার করে তাতেই ফরাস পেতে তার জন্য বানানো হলো সিংহাসন। সিংহাসনের পেছনে কর্মচারী এবং সামনে মন্ত্রীদের বসার জায়গা। আদিবাসীদের সরদার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দরবেশের পাশেই বসেন। দরবেশের মন্ত্রীসভার সদস্যদের অর্ধেকই আদিবাসীদের মধ্য থেকে নেয়া। আরবদের মতো আদিবাসীদের সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে লাগল। আরব ও আদিবাসীদের মধ্যে উভয় পক্ষের ইচ্ছায় বিয়ের ব্যাপক প্রচলন হলো। রাষ্ট্রপ্রধান দরবেশ তার দুই ছেলেকে বিয়ে দেন আদিবাসী মেয়ের সাথে। সুবর্ণ দ্বীপে রাষ্ট্রপ্রধান নির্ধারণের ব্যবস্থা হয় জনসমর্থনের মাধ্যমে। আইনসম্মতভাবে দেশ পরিচালনা করলে, সকল প্রকার পক্ষপাতিত্ব ও অবিচার অন্যায় থেকে দূরে থাকলে এবং জনগণের পক্ষ থেকে অভিযোগ না উঠলে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট আমৃত্যু দেশ পরিচালনায় থাকার ব্যবস্থা হয়। তাকে বা তাদের সরে যেতে হলে অথবা ইন্তেকাল করলে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রে সবার সমান অধিকার, সব ক্ষেত্রে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা ছিল খোদায়ী আইন ও জনপ্রতিনিধিদের প্রণীত আইনের উপর ভিত্তিশীল। রাষ্ট্রপ্রধানকেও বিচারকের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। স্বয়ং প্রধান বিচারপতিও যদি অন্যায় করে, তারও সাধারণ মানুষের মতো বিচার হয়। বহিঃদেশীয় সকল দ্বন্দ্ব সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকলেও, কোনো যুদ্ধে সুবর্ণ দ্বীপ অংশ না নিলেও রাষ্ট্রে এই ব্যবস্থা সিরিয়াসলি চলে আসছে যে, দেশের সবাই একই সাথে মিশনারী এবং সৈনিক। তাই সকলের জন্যে আত্মরক্ষার ট্রেনিং অপরিহার্য। এর সাথে সাথে সুবর্ণ দ্বীপ হয়ে উঠল বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির দেশ। আদিবাসীরা ফলমূল ও শিকারের গোশত খেয়ে জীবনধারণ করত। আরবরা এসে ফসলের চাষ শুরু করল। সেচ ও খাবার পানির ব্যবস্থা করল তারা। আরব দেশগুলো থেকে রাজনৈতিক কারণে বিতাড়িত বা পালানো লোক ছাড়াও ভাগ্যান্বেষী লোকরাও এসে সুবর্ণ দ্বীপে আশ্রয় নিল। অনেকে ব্যবসায় বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসতে লাগল। সুবর্ণ দ্বীপের চারদিকের ভয়ংকর সাগর শান্ত হয়ে পড়ায় সবার জন্য আকর্ষণের একটা কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াল এই ‘সুবর্ণ দ্বীপ’। কৃষি পণ্য ও ফলমূল বিপুল পরিমাণে রপ্তানি হতে লাগল। আমদানির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করল দরবেশের সরকার। দ্বীপ রাষ্ট্রটিকে স্বনির্ভর করা দরবেশ সরকারের অর্থনীতির লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল।
বয়ে গেল সাতশ বছরের দীর্ঘ সময়। সুবর্ণ দ্বীপ তখন একটা পরিণত রাষ্ট্র। রাজধানী ‘সুবর্ণ নগর’ এখন একটা আন্তর্জাতিক নগরী। সুবর্ণ দ্বীপে বিমান ও বিমানবন্দর না থাকলেও সমুদ্রপথে প্রায় সব দেশের সাথে যোগাযোগ গড়ে উঠেছে, বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর সাথে। সুবর্ণ দ্বীপের নৌবন্দর ‘নিউ জেদ্দা’ ও ‘নিউ আদন’ তখন এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলোর কাছে খুবই পরিচিত এবং সমুদ্র পথের নাবিকদের কাছে আকর্ষণের একটা কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
সুবর্ণ দ্বীপ সকলের কাছেই শান্তিবাদী একটি শান্তির দ্বীপ। শান্তিরক্ষার একটা সামান্য ব্যবস্থা ছাড়া বড় ধরনের কোনো মারণাস্ত্র সুবর্ণ দ্বীপে ছিল না। বাইরের কোনো সাতে-পাঁচে না থাকা একটা নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে সব দেশই সুবর্ণ দ্বীপকে ভালো চোখে দেখে। কিন্তু সুবর্ণ দ্বীপের শান্তিবাদিতা এবং তার আত্মরক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকা এবং কাউকেই ক্ষতিকর হিসেবে না দেখার মানসিকতাই একসময় সুবর্ণ দ্বীপের জন্যে কাল হয়ে দাঁড়ালো। সময়টা তখন পশ্চিমা দেশগুলোর বিশ্বব্যাপী উপনিবেশ স্থাপনের কাল। বাণিজ্য বহরের সাথে জলদস্যুদের নৌবহর ছিল সাগরে তৎপর। সুযোগ পেলে তারা যেমন বাণিজ্যবহর লুট করত, তেমনি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ এবং ছোট ও দুর্বল দেশও ছিল তাদের লুটতরাজের শিকার। ‘সাগর সংঘ’ নামে একটা জলদস্যু সিন্ডিকেট অনেকদিন থেকে চোখ রাখছিল সুবর্ণ দ্বীপের দিকে। ‘সাগর সংঘে’র মধ্যমণি ভিক্টর দি গ্রেট। বলা হয় সে ইউরোপের কোনো এক দেশের রাজ্য বঞ্চিত রাজা ছিল। তার ছিল নিজস্ব বিমান, তার সেনাবাহিনী ছিল কামান, বন্দুক ও অন্যান্য অস্ত্রে সজ্জিত। দৃশ্যত এরা ঘুরে বেড়ায় তাদের বাণিজ্যবহর নিয়ে এদেশ থেকে সেদেশে। সুযোগ পেলেই এরা মুখোশ খুলে ফেলে ছোট ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রসহ বড় বড় বাণিজ্যবহরও লুট করে। এই ‘সাগর সংঘে’র ভিক্টর দি গ্রেটের টার্গেট হয়ে দাঁড়ায় সুজলা-সুফলা সমৃদ্ধ এবং চারদিক থেকে বিচ্ছিন্ন ‘সুবর্ণ দ্বীপ’। অনেক ভেবে চিন্তে ভিক্টর দি গ্রেট ঠিক করে স্থায়ী বসতির জন্য সুবর্ণ দ্বীপের মতো’ বিচ্ছিন্ন একটি বড় দ্বীপই তাদের দরকার। যাযাবরের মতো কতদিন আর সাগরে ঘুরে বেড়াবে। সাগরে তো আর রাষ্ট্র গঠন করা যায় না। এই সুবর্ণ দ্বীপই তাদের চাই। বিভিন্ন দেশ ও দ্বীপে ছড়ানো-ছিটানো তাদের সম্পদকে তারা নিয়ে আসবে এই সুবর্ণ দ্বীপে। তখন ‘সুবর্ণ দ্বীপ’-এর (Golden Island) নামটাও সার্থক হবে।
‘সাগর সংঘ’ প্রস্তুতি নিল।
এক অমাবস্যার কালরাতে হাজার হাজার দস্যু সৈন্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল দস্যু নেতা ভিক্টর দি গ্রেট। কামানের গুলিবৃষ্টির আড়ালে সাগর সংঘের হাজার হাজার সশস্ত্র দস্যুসৈন্য রাতের অন্ধকারে চড়াও হলো সুবর্ণ দ্বীপের শহর ও জনপদের উপর। সুবর্ণ দ্বীপের শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে এটা ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। এই বজ্রপাতে শেষ হয়ে গেল ‘সুবর্ণ দ্বীপ’ রাষ্ট্রটি। ভিক্টর দি গ্রেটের প্রধান টার্গেট ছিল সুবর্ণ দ্বীপের সরকার, সংসদ, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এবং দরবেশ আব্দুল্লাহ আলীর উত্তরসূরী পরিবারগুলো। এদের কাউকে বাঁচতে দেয়া হয়নি। দরবেশের অষ্টম প্রজন্মের সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য আবুবাকার আব্দুল্লাহ আলী ছিলেন প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে। তার এক ছেলে ছাড়া আর কেউ বাঁচেনি। তার বেঁচে যাওয়া পুত্র জুবায়ের বিন আব্দুর রহমান নিউ জেদ্দা বন্দর উপকূল রক্ষী বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। তিনি আহত অবস্থায় কয়েকজন সহকর্মী নিয়ে একটা দ্রুতগামী জাহাজে করে হানাদার সাগর সংঘের ব্যারিকেডকে ফাঁকি দিয়ে পালাতে পেরেছিলেন। তার পরিবার রাজধানী সুবর্ণ নগরে থাকায় তাদের সাথে নেয়া সম্ভব হয়নি। আবু জুবায়েররা কয়েকজন ছাড়া সুবর্ণ দ্বীপ থেকে আর কেউ পালাবার সুযোগ পায়নি। দরবেশের উত্তরসূরী পরিবারগুলোর আর একজন শিশু পুত্র মাত্র বেঁচেছিল। সে শিশু এই নৌ কমান্ডার জুবায়ের বিন আব্দুর রহমানেরই তিন বছর বয়সের পুত্র আব্দুল্লাহ বিন জুবায়ের। জুবায়ের বিন আব্দুর রহমানের বাড়ির সিকিউরিটি চীফ আহমদ শরীফ মুমূর্ষ অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে কোনোরকমে পালাতে পারেন। এই শিশু আব্দুল্লাহ বিন জুবায়েরের বংশধর কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ। যিনি এখন দখলদার ভিক্টর সরকারের হাতে বন্দী। স্যরি, কাহিনীর সংক্ষেপিত মূলধারা থেকে একটু সরে গিয়েছিলাম।’
বলে একটু থেমে কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী আবার কথা শুরু করতে যাচ্ছিল। এই সময় ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলে উঠল, ‘কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহর পরিচয় পূর্ণ তো হলো, কিন্তু তোমার সাথে তার সম্পর্কটা স্পষ্ট হলো না।’
কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী একটু হেসে বলল, ‘বলছি জনাব। আমি কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহর দাদার ভাইয়ের নাতি। আমার দাদার নাম ছিল হামজা বিন জুবায়ের।
কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী ‘কথা আর বেশি বাকি নেই’ বলে তার মূল কাহিনী আবার শুরু করল।
‘সুবর্ণ দ্বীপ দখল হওয়ার আরও ১০০ বছর পর। সুবর্ণ দ্বীপের নামটাও তারা পাল্টে ফেলেছে। নতুন নাম দ্বীপ দখলকারী ভিক্টর দি গ্রেটের নাম অনুসারে ভিক্টর আইল্যান্ড। ভিক্টর আইল্যান্ড এখন হয়ে উঠেছে বর্ণবাদী সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। ভিক্টর দি গ্রেট নিজে আগ্রাসী ছিলেন, কিন্তু বর্ণবাদী ছিলেন না। বর্ণবাদী মানসিকতা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তার উত্তরসূরীদের শাসনে। ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, রাশিয়া সবদেশ থেকে বর্ণবাদী সন্ত্রাসীদের এবং নতুন রিক্রুটদের এনে এই সুবর্ণ দ্বীপে তাদের ট্রেনিং দেয়া হয় ও মোটিভেশন করা হয়। তারপর তারা পরিকল্পনা অনুসারে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এরা নব্য নাজী’তে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশ্বের সব ধর্ম, সব শান্তিবাদী রাষ্ট্রের জন্যে এরা বিপদজনক হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বিপদে পড়েছে সুবর্ণ দ্বীপের আরব ও আদিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠী। তারা কোনো বাদ-প্রতিবাদে না থাকলেও, রাজনীতির কোনো পক্ষ-বিপক্ষ না হলেও তারা রেহাই পাচ্ছে না। তাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে উঠেছে। অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই অবশেষে তারা জেগে উঠেছে। সুবর্ণ দ্বীপের আত্মগোপনকারী, নির্যাতিত নেতারা আত্মরক্ষা ও অধিকার আদায় এবং নিজেদের সংঘটিত করার জন্য ফিলিস্তিন ও মধ্য এশিয়ায় ‘সাইমুম’-এর অনুকরণে ‘সাগর সাইমুম’ গঠন করেছে। এই সাগর সাইমুমকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য দরবেশ আব্দুল্লাহ আলীর বংশধর আমার দাদার বাবা সুবর্ণ দ্বীপ থেকে সরে পড়তে পারা- জুবায়ের বিন আব্দুর রহমানের সুবর্ণ দ্বীপে থেকে যাওয়া শিশুপুত্র আব্দুল্লাহ বিন জুবায়ের নাতি সুবর্ণ দ্বীপের ভিক্টর সেনাবাহিনীর কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহকে আহ্বান জানানো হলো। তিনি সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিয়ে ‘সাগর সাইমুম’-এর কমান্ড গ্রহণ করলেন। এর পরের কাহিনী শুরুতেই বলেছি যে, কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ এখন ভিক্টর সরকারের হাতে বন্দী। তার জীবনসহ ‘সাগর সাইমুম ও সুবর্ণ দ্বীপের’ অবশিষ্ট মুসলিম বসতির অস্তিত্ব আজ বিপন্ন।’
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলে উঠল, ‘ভাই কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী, তুমি বললে সুবর্ণ দ্বীপে বন্দী কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ তোমার ভাই। তার দিকের পরিচয় জানলাম, কিন্তু তোমার দিকের পরিচয় মানে তোমরা জাঞ্জিবারে আসলে কবে, কিভাবে তা জানা গেল না।’
‘বলছি জনাব। আমার দাদার বাবা জুবায়ের বিন আব্দুর রহমান তিনি দরবেশ আব্দুল্লাহ আলীর বংশধর এবং তিনি ও তার কয়েকজন সাথীই মাত্র বেঁচে পালাতে পেরেছিলেন সুবর্ণ দ্বীপ থেকে। তিনি সুবর্ণ দ্বীপ নৌবাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলেন। তিনি প্রথমে আশ্রয় নেন মরিশাসে। সেখান থেকে যান মাদাগাস্কারে। সেখানে গিয়ে তিনি নানা সূত্রে সুবর্ণ দ্বীপের গণহত্যার খবর পান। মুসলিম দেশগুলো তখন ঔপনিবেশিকদের কবলে। সাহায্যের কোনো আশা নেই কোথাও থেকে। তিনি অবশেষে ট্যাঙ্গানিকা (আজকের তানজানিয়া) উপকূলের জাঞ্জিবারে আশ্রয় নেন। আবাস গড়েন তিনি সেখানেই। এর ১০ বছর পর তিনি বিয়ে করেন এক আরব পরিবারে। তিনি এখানে দ্বিতীয় সন্তান ‘হামজা বিন জুবায়ের আব্দুর রহমান’কে পান, প্রথম সন্তান ছিল সুবর্ণ দ্বীপের আব্দুল্লাহ বিন জুবায়ের। হামজা বিন জুবায়ের আমার দাদা।’
কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী একটু থেমেই আবার বলে উঠল, ‘আমার স্টোরি এখানেই শেষ মুহতারামগণ।
আহমদ মুসা কথা বলার জন্য মুখ খুলছিল।
এই সময়ই তার মোবাইলটা বেজে উঠল। মোবাইলের কল ওপেন করল আহমদ মুসা। ওপ্রান্তের কথা শুনেই বলে উঠল, ‘নাদা ডেনিসা কেমন আছ? খুশি হয়েছি তোমার কল পেয়ে।’
‘আমি এবং আমরা সবাই ভালো আছি। নেতাকে কল করতে পারা কর্মীদের জন্য আনন্দের।’ বলল নাদা ডেনিসা ওপ্রান্ত থেকে।
‘নেতা বলো না, ভাই বলো। ভাইয়ের খোঁজ খবর তুমি রাখ, এজন্য ধন্যবাদ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘বোনের মর্যাদা দেয়ার পর ধন্যবাদ দেয়া মানায় না। বোনের তো অপরিহার্য দায়িত্ব ভাইয়ের খোঁজ নেয়া ‘
একটু থেমেই আবার বলল নাদা, ‘একটা জরুরি বিষয় নিয়ে টেলিফোন করেছি ভাই। বিষয়টা হলো, আমাদের পূর্ব কঙ্গোর বামপন্থী একটা রেবেল গ্রুপ আজ রাতে আপনাদের বাসায় যাচ্ছে এক অপারেশনে। লক্ষ্য হলো, আপনিসহ বাসার সবাইকে হত্যা করা। ওদের…।’
নাদার কথার মাঝখানেই আহমদ মুসা বলল, ‘ভাড়া করেছে কে তাদের?’
ব্ল্যাক ক্রস তাদের ভাড়া করেছে। ব্ল্যাক ক্রসের ওরা পাগল হয়ে গেছে। আপনাকে হত্যা করা ছাড়া তাদের মাথায় আর কিছু নেই।’ বলল নাদা।
‘কিন্তু দুঃখিত নাদা, আমাকে হত্যার বিষয়টা ওদের হাতে নেই, এটা একেবারেই আল্লাহর হাতে। আমার উপর বা আমার বাসায় তারা আক্রমণ চালাতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাও তারা পারবে না। আমরা ওদের পেছনে আছি। আমরা একটু দেরিতে জানতে পেরেছি যে, আপনি এবং আপনার বাসা ওদের টার্গেট। ওরা অপারেশনে যাত্রা করার পর আমরা জানতে পেরেছি। আপনাদের বাসার সামনেই ওদের ধরে ফেলব আমরা আশা করছি।’
মুহূর্তকালের জন্য থেমেই আবার বলে উঠল, ‘স্যার। স্যরি, ভাই, আপনার কোনো চিন্তা করতে হবে না। আমাদের অনুরোধ, সতর্ক হয়ে আপনারা বাড়ির ভেতরে থাকুন। কেউ দয়া করে বের হবেন না। ওরা যতজন গেছে, তাদের থেকে আমরা সংখ্যায় বেশি। আমরা দুই ভাই বোন রাস্তার দুদিক থেকে ওদের ঘিরে ফেলব।’
‘ধন্যবাদ, আমাদের বাড়ির ঠিকানা তোমরা পেলে কি করে?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিকানা ওদের কাছ থেকে জোগাড় করেছি। ভাই, অনুমতি দিলে আমি মোবাইল রাখতে চাচ্ছি। আমরা এসে গেছি। আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য দোয়া করুন। বলল নাদা।
‘ঠিক আছে বোন। আল্লাহ আমাদের তোমাদের সকলকে সাহায্য করুন।
বলে আহমদ মুসা মোবাইলের কল অফ করে দিল। ইদি আসুমানি মোহাম্মদসহ সকলেই আহমদ মুসার দিকে উগ্রীবভাবে তাকিয়ে ছিল। আহমদ মুসার কিছু কথা শুনে তারা বুঝেছিল গুরুতর কোনো বিষয়ে কথা হয়েছে।
আহমদ মুসা মোবাইলের কল অফ করতেই ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলল, ‘কিছু ঘটেছে ভাই?’
‘ঘটেনি জনাব, ঘটতে যাচ্ছে। ব্ল্যাক ক্রস এখানে পরাজিত হবার পর পূর্ব কঙ্গোর একটা সন্ত্রাসী গ্রুপকে ভাড়া করেছে আমাদের হত্যার জন্য। ওরা হত্যার মিশন নিয়ে আমাদের এই বাড়িতে আসছে এই……।’
আহমদ মুসার কথার মাঝখানে ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলে উঠল, ‘আসছে মানে আজই এই রাতে আসছে?’ তার কণ্ঠে উদ্বেগ।
‘জ্বি জনাব, কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে। টেলিফোনের কথায় তাই মনে হলো।’ একটু থামল আহমদ মুসা।
তার একটু থামার সুযোগে আসুমানি আব্দুল্লাহ দ্রুত প্রশ্ন করল, ‘কে টেলিফোন করেছিল জনাব? সন্ত্রাসীদের কেউ?’
‘না সন্ত্রাসীদের কেউ নয়। পূর্ব কঙ্গোর একটা বিদ্রোহী গ্রুপের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। সেই গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড নাদা ডেনিসা আমাকে টেলিফোন করেছিল।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনি কি ভাবছেন? আমাদের এখন করণীয় কি? পুলিশকে কি এখনই জানানো দরকার নয়?’ আসুমানি আব্দুল্লাহ বলল প্রায় অস্থির কণ্ঠে।
‘পুলিশকে খবর দেয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের কিছু করণীয় নেই। যা করার ইনশাআল্লাহ নাদা ডেনিসারাই করবে। আমাকে মোবাইলে নাদা ডেনিসা এ কথাই জানিয়েছে। তারা সন্ত্রাসী গ্রুপটার পিছু নিয়েছে। সন্ত্রাসীরা আমাদের উপর আক্রমণের আগেই নাদা ডেনিসারা সন্ত্রাসীদের উপর দু’দিক থেকে আক্রমণ চালাবে। তারা আমাদের অনুরোধ করেছে সতর্ক হয়ে আমরা যেন বাড়ির ভেতরেই থাকি, কেউ যেন বের না হই। বলল আহমদ মুসা।
‘তুমি ওদের উপর নির্ভর করতে পার নিশ্চয়ই?’ ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলল।
‘আল্লাহ ভরসা। আমি মনে করি ওদের কথার উপর নির্ভর করা যায়। ওরা ব্যর্থ হলে আমরা তো আছিই। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু জনাব, মাত্র একটি পরিচয়ের কারণে আমাদের সাথে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ওরা নিজেদের জড়াবে কেন?’ আসুমানি আব্দুল্লাহ বলল।
‘জাম্বিয়াতে এক ঘটনায় আমি নাদা ডেনিসার জীবন বাঁচিয়েছিলাম। হয়তো সে কারণেই তারা আমাদের সাহায্য করতে চায়।’ বলল আহমদ মুসা গম্ভীর কণ্ঠে।
কিছু বলার জন্য মুখ খুলছিল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ। কিন্তু ব্রাশ ফায়ারের অব্যাহত শব্দের মধ্যে তার কন্ঠ ডুবে গেল। যেন এক সমান্তরাল রেখার দুই প্রান্ত থেকে গর্জে উঠেছে অনেকগুলো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র।
তুমুল গোলাগুলি শুরু হলো।
আহমদ মুসা বলল, ‘গুলি চলছে দুই পক্ষ থেকেই। তবে প্রথম যারা গুলি করা শুরু করেছে তাদের গুলির শব্দই বেশি ভারী।
আহমদ মুসা ছাড়া সবার চোখে মুখেই দারুণ উৎকণ্ঠা।
উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী বলল, ‘প্রথম কারা গুলি শুরু করেছে বলে আপনি মনে করেন?’
‘আমি নিশ্চিত, নাদা ডেনিসারা মানে আমাদের পক্ষের লোকেরাই প্রথম গুলি শুরু করেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
আমাদের পক্ষের লোকদের গুলি-গোলাকে ভারি বলছ কেন আহমদ মুসা?’ ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলল।
‘তাই অনুমান করছি জনাব।’ বলল আহমদ মুসা।
মিনিট দশেকের মধ্যেই গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল।
‘এতক্ষণে তো পুলিশ আসার কথা।’ বলল কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী।
‘সাধারণত পুলিশ এ ধরনের ঘটনার পরেই এসে থাকে। ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলল।
কিছু বলতে যাচ্ছিল আহমদ মুসা। কিন্তু তার মোবাইল বেজে উঠল।
মোবাইল তুলে নিল আহমদ মুসা। দেখলো নাদা ডেনিসার কল।
‘হ্যালো নাদা, ধন্যবাদ তোমাকে এবং তোমাদেরকে। মোবাইল মুখের কাছে নিয়েই বলল আহমদ মুসা।
‘কি জন্য ধন্যবাদ ভাইয়া?। নাদা বলল।
‘তোমাদের মিশন সফল হওয়ার জন্য এবং তোমাদের দ্বারা আল্লাহ আমাদের বিরাট সাহায্য করলেন- এজন্য ধন্যবাদ। কিন্তু কিভাবে এত তাড়াতাড়ি মিশন শেষ করলে? সেটা বল।’ বলল আহমদ মুসা।
‘না ভাই এখন নয়, পরে বলব। পুলিশ এসে গেছে। আমরা চলে যাচ্ছি।’ নাদা বলল।
‘আমাদের সাথে দেখা না করে চলে যাবে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘দেখা না করে চলে যেতে মন চাচ্ছে না। কিন্তু পরিস্থিতি ভালো নয়। অযথা আমরা পুলিশের ঝামেলায় জড়াতে চাই না।’
মুহূর্তের জন্য থেমে আবার বলল, ‘ভাই দোয়া করবেন। আমাদের ওখানে আপনার যাওয়ার দাওয়াত কিন্তু বাতিল হয়নি। আমি রাখছি ভাইয়া। সালাম।’ নাদা কল অফ করে দিয়েছে।
আহমদ মুসা মোবাইল রেখে বলল, ‘শুভ সংবাদ। পুলিশের ঝামেলা এড়িয়ে নাদারা চলে যেতে পারল।’
‘এদিকের খবর কি?’ ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ। ওরা যুদ্ধ জয় করেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
সবাই ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে উঠল।
ঘটনা নিয়ে কথা চলতে লাগল। পাঁচ মিনিটও পার হয়নি। কলিং বেল বেজে উঠল।
‘পুলিশ এসেছে। জনাব আসমানি আব্দুল্লাহ আপনি বাইরের দরজা খুলে দিন। আমরা আসছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘পুলিশ? আপনি কি করে জানলেন?’ আসুমানি আব্দুল্লাহ বলল। ‘সামনের রাস্তার উত্তর, দক্ষিণ দু’প্রান্ত থেকে পুলিশের বাঁশির শব্দ পাওয়া গেছে। আপনারাও শুনেছেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বাঁশির শব্দ শুনেছি। কিন্তু ওরা যে আমাদের বাড়ির দরজায় এত তাড়াতাড়ি এসে গেছে তা বুঝিনি। পুলিশকে তো আমাদের এ বাড়ির ঠিকানা জানানো হয়নি।’ আসুমানি আব্দুল্লাহ বলল।
‘জানানো হয়নি। কিন্তু ওরা মানে গোয়েন্দারা আমাদের ফলো করেছে। জেনে গেছে ওরা আমাদের ঠিকানা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ফলো করেছে কেন?’ আসুমানি আব্দুল্লাহ বলল।
তার কণ্ঠে কিছুটা উদ্বেগ।
‘চিন্তার কোনো কারণ নেই জনাব আসুমানি আব্দুল্লাহ। আমাদের নিরাপত্তা দেয়া ওদের টার্গেট ছিল। আমাদের দ্বারা সংঘটিত একটা বড় ঘটনার পর এটা স্বাভাবিক ছিল।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ’! বলে অসুমানী আবদুল্লাহ বাইরের ঘরের দরজার দিকে চলে গেল।
.
একে একে পুলিশের ঊর্ধ্বতন অফিসারসহ পুলিশ প্রধানও আসুমানি আব্দুল্লাহদের বৈঠাখানায় এসে গেছে।
আসুমানি আব্দুল্লাহদের বাড়ির সামনের রাস্তাসহ আশেপাশের এলাকায় বেশ বড় ঘটনা ঘটে গেছে। বিশ্বজোড়া সংগঠন ব্ল্যাক ক্রসের প্রধান কলিন ক্রিস্টোফারসহ বাইশ জন সশস্ত্র লোক মারা গেছে। পুলিশ প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসারদের সবারই মুখ বিমর্ষ। এত বড় একটা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু তাকে সংঘাত, সংঘর্ষ বলা যাচ্ছে না। কারণ সংঘাত, সংঘর্ষ প্রমাণ করতে হলে তো আরেকটি পক্ষ থাকা দরকার। কিন্তু সেই পক্ষকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। যারা মরেছে, তারা একপক্ষের লোকই মরেছে, অস্ত্র যা পাওয়া গেছে, তা যে কেবল একপক্ষেরই তাও প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয় বা আরেকটি পক্ষের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় দায় এসে পড়ছে পুলিশের উপর। কিন্তু ঘটনায় ব্ল্যাক ক্রস প্রধান নিহত হবার পর একটা পক্ষ হবার দায় সরকার নিতে চাচ্ছে না। বিশেষ করে যখন নিহত লোকদের বা সন্ত্রাসীদের কোনো অ্যাকশন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা কাউকে আক্রমণ করেছে, কোনো বাড়ির উপর চড়াও হয়েছে বা কাউকে আহত অথবা হত্যা করেছে, তার কোনো চিহ্ন নেই, সেটা কোনোভাবে প্রমাণ করা যাচ্ছে না।
বিমর্ষ পুলিশ প্রধান আহমদ মুসার দিকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘মি. আহমদ মুসা স্যার, আপনিও তো ঘটনাস্থল দেখে এলেন। সেখানে দুই পক্ষের সংঘাতের কোনো চিহ্ন নেই। বলা যেতে পারে একটা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সেটাকে সংঘাতের ঘটনা হিসেবে সাজানো হয়েছে। ব্ল্যাক ক্রস প্রধান এই ঘটনায় নিহত হবার পর এই হত্যাকাণ্ডের দায় সরকার নিতে চায় না। এখন কি করণীয় আমরা বুঝতে পারছি না। স্যার, আপনি বা আপনার লোকজন কি ঘটনার একটা পক্ষ হতে পারেন?’
হাসল আহমদ মুসা। তারপর গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। বলল আহমদ মুসা, ‘সমস্যার সমাধান আমার কাছে আছে। কিন্তু তার আগে বলুন, ঘটনার যে অবস্থান ও প্রকৃতি তাতে আমার মতো একজন কেউ কি এই ঘটনা ঘটাতে পারে? আর আমার এমন লোকজন কি বুজুমবুরায় আছে বলে আপনারা মনে করেন?’
‘স্যার, আমি যা বলেছি সেটা সত্য হলে খুশি হতাম? কারণ, আপনি স্যার এ পর্যন্ত সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করেছেন। আজও যদি সেটাই ঘটতো, তাহলে আমরা সমস্যা থেকে বেঁচে যেতাম। গোটা দুনিয়া একে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করত। আমরা দুঃখিত স্যার যে তা হয়নি। আমি যেটা বলেছি, সেটা কথার কথা। এখন বলুন স্যার সমস্যার কি সমাধান আপনি দেবেন?’ পুলিশ প্রধান বলল।
‘আমি কিছু বলছি না। আমার মোবাইলের একটা কল রেকর্ড বাজাচ্ছি, আপনারা শুনুন।’ বলে আহমদ মুসা তার মোবাইলের কল রেকর্ড অপশনে গিয়ে একটা কল রেকর্ড বাজিয়ে দিল।
কল রেকর্ডটির প্লে চলতে লাগল।
পুলিশ প্রধানসহ পুলিশের সব অফিসার উৎকীর্ণ।
অল্প কিছুটা শুনেই সবাই তাকালো আহমদ মুসার দিকে। তাকালো পরস্পরের প্রতি।
যতই সামনে এগোতে লাগল কল রেকর্ডের প্লে, পুলিশের সবার চেহারা পাল্টে যেতে লাগল। বিমর্ষতার অন্ধকার কেটে গিয়ে মুখে আনন্দ উজ্জ্বল্য ফিরে এলো।
প্রথমটা শেষ হবার পর দ্বিতীয় আরেকটা কল রেকর্ডের প্রে শুরু হলো।
অন্য একটি কল রেকর্ডিং প্লে।
এ কল রেকর্ডটি আগেরটার চেয়ে ছোট।
কল রেকর্ডটি শেষ হবার সাথে সাথে পুলিশ প্রধান লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। দুই হাত জোড় করার ভঙ্গিতে হাত উপরে তুলে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমরা সমস্যার সমাধান পেয়ে গেছি। আপনি আমাদের সরকারকে বাঁচিয়েছেন, আমাদের বুরুন্ডিকে বাঁচিয়েছেন।’ বসে পড়ল পুলিশ প্রধান।
বসেই বলে উঠল, ‘স্যার বুঝলাম, ওরাও কঙ্গোরই একটা দল। কারা ওরা? আপনার এমন ভক্ত হলো কি করে?’
আহমদ মুসা নাদা ডেনিসা মেয়েটাকে বাঁচানোসহ খুব সংক্ষেপে পুলিশ প্রধানের প্রশ্নের উত্তর দিল।
‘স্যার, আপনি বিরাট ভাগ্যবান। আপনি পরশপাথরের মতো। আপনি যেমন গোল্ড, তেমনি যারা আপনার সংস্পর্শে আসে তারাও গোল্ড হয়ে যায়। কঙ্গোর একটা সন্ত্রাসী দলকে আপনি বদলে দিয়েছেন স্যার।’
কথাটা শেষ করে মুহূর্তকাল থেমেই আবার বলে উঠল, ‘স্যার প্লিজ, আপনাদের কথোপকথনের রেকর্ড দুটি আমার মোবাইলে ট্রান্সফার করে দিন। এ ডকুমেন্টটা আমাদের দরকার হবে।’
আহমদ মুসা অল্প হেসে বলল, ‘আপনি আপনার মোবাইলটা চেক করুন।’
পুলিশ প্রধান তার মোবাইল দেখে নিয়ে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ স্যার। কল রেকর্ড দুটি ডকুমেন্ট কপি আকারে আমার মোবাইলে এসেছে। অনেক ধন্যবাদ স্যার, যা ভাববার তার সবকিছুই আপনি আগাম ভাবতে পারেন।’
পুলিশ প্রধান তার সহকারী প্রধানের দিকে একপলক তাকিয়ে চোখ ফিরাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘স্যার, আপনি অনুমতি দিলে আমরা উঠতে পারি। লাশ সব উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। সব আলামত জব্দ করা হয়েছে। সুরতহাল অবস্থার বর্ণনা ও ছবি দুইই রেকর্ড করা হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে এলাকাটা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলা হবে। আমরা ১১জন পুলিশের একটি দল রেখে যাচ্ছি, আপনাদের বাড়ির চারপাশসহ এলাকাটিতে সার্বক্ষণিক টহল দেবার জন্যে।
পুলিশরা বিদায় নিয়ে চলে গেল।
ড্রয়িং রুমে বসে থাকলো আহমদ মুসা, আসমানি আব্দুল্লাহ, সিতি সাবেরার বাবা আবু ওমার আব্দুল্লাহ ইয়ামানি, কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী এবং আলী মুইজি। সিতি সাবেরা মেয়েদের সাথে পাশের ঘরে রয়েছে। তারাও ড্রয়িং রুমের আলোচনা শুনেছে।
একটু বসেই আসুমানি আব্দুল্লাহ আহমদ মুসাকে বলল, ‘আমি একটু ভেতর থেকে আসছি জনাব।’
আসমানি আব্দুল্লাহ উঠে দাঁড়াচ্ছিল।
আসুমানি আব্দুল্লাহর ছেলে আমর আসুমানি আব্দুল্লাহ এ সময় দৌড় দিয়ে ড্রইং রুমে প্রবেশ করল। বলল তার বাবাকে লক্ষ্য করে, ‘দাদু সবাইকে ভেতরের ড্রইং রুমে যেতে বলেছেন।
‘তাহলে প্লিজ সবাই চলুন ভেতরে। বাবা নিশ্চয়ই খুব উদ্বেগে আছেন। কি ঘটলো তিনি মনে হয় জানতে চান।’ বলল আসুমানি আব্দুল্লাহ।
‘ঠিক আছে সবাই উঠুন। আমি এবং কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী দু’মিনিট পরে আসছি।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক আছে জনাব, আমি অন্য সবাইকে নিয়ে যাচ্ছি।’ বলল আসুমানি আব্দুল্লাহ।
আসুমানি আব্দুল্লাহ সিতি সাবেরার বাবা আবু ওমার আব্দুল্লাহ এবং আলী মুইজিকে নিয়ে ভেতরে চলে গেল।
‘তেমন কিছু কথা নয় ভাই কমান্ডার, আমি আপনাদের পরিবার সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলাম। জাঞ্জিবারে আপনার পরিবারে কে কে আছে?’ আসুমানি আব্দুল্লাহ প্রশ্ন করল কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলীকে।
বাবা, মা নেই। জাঞ্জিবারে আমার ফুফু ও খালা আছেন। আর আমার বাড়িতে ছোট দুই ভাই-বোন এবং কয়েকজন কাজের লোক আছেন।’ বলল কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী।
‘কেন স্ত্রী নেই?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘নেই।’ সলজ্জ কণ্ঠের সংক্ষিপ্ত উত্তর আব্দুল্লাহ আলীর।
‘কেন নেই? বাগদত্তা কিংবা চিন্তার মধ্যে কেউ নেই?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
‘তাও নেই জনাব।’ বলল কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘বোঝা যাচ্ছে, কোনো শক্ত অভিভাবক আপনার নেই। আমি কি অভিভাবকত্ব করতে পারি?’
সলজ্জ হাসি কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলীর মুখে। বলল, ‘স্যার, সেটা আমার সৌভাগ্য
‘এই আসুমানি পরিবার আপনার কেমন লাগছে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘ভালো স্যার। আগেও শুনেছিলাম এদের কথা।’ বলল আব্দুল্লাহ আলী।
‘ধন্যবাদ। চলুন যাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘চলুন।’
বলে আহমদ মুসার সাথে সাথে উঠে দাঁড়াল কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী। হাঁটা শুরু করে বলল, ‘স্যার, এদের পরিবার সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কেন?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘দেখি আপনার অভিভাবকত্ব করা যায় কিনা। আপত্তি নেই তো?’
কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলীর মুখ কিছুটা লাল হয়ে উঠেছে লজ্জায়। বলল, ‘আপনার এই চিন্তাই আমার কাছে বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার স্যার।’
‘আবারও ধন্যবাদ। এই তো আমরা এসে গেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
ড্রয়িং রুমের দরজায় দাঁড়িয়েছিল আসুমানি আব্দুল্লাহ।
আহমদ মুসাদের স্বাগত জানিয়ে ভেতরে নিয়ে বসাল।
আহমদ মুসা বসতেই ইদি আসুমারি মোহাম্মদ বলে উঠল, ‘ভাই আহমদ মুসা, আল্লাহর হাজার শোকর। এবারও তিনি আমাদেরকে রক্ষার নিমিত্ত বানালেন তোমাকে। শুনলাম, ২২ জন যারা মারা গেছে, তাদের মধ্যে নাকি ব্ল্যাক ক্রস-এর প্রধান কলিন ক্রিস্টোফারও রয়েছেন। কি বল তুমি, এবার কি তাহলে আমাদের বুজুমবুরার আকাশ থেকে দুর্যোগের মেঘ কাটল?’
‘আমি আশা করছি জনাব। ওদের আজকের আক্রমণের টার্গেট আমি ছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সামনে ওদের সর্বাত্মক আক্রমণের যে ঘটনা ঘটেছে তারও টার্গেট ছিলাম আমি। এরপর আমি মনে করি বুজুমবুরা আর ওদের টার্গেটে থাকবে না।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এতটা আস্থার কথা কেমন করে বলছ ভাই?’ ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলল।
‘জনাব, ওদের টার্গেট শিফট হলে ওদের লক্ষ্যও শিফট হবে, সেটাই স্বাভাবিক।’
বিস্ময়ের এক ভাব ফুটে উঠল ইদি আসুমানি মোহাম্মদের চোখে মুখে। সোজা হয়ে বসতে চেষ্টা করে কিছু বলার জন্য মুখ খুলল। ঠিক এ সময় আহমদ মুসার মোবাইল বেজে উঠল।
আহমদ মুসার মোবাইলে কল আসার সাথে সাথে ইদি আসুমানি মোহাম্মদ থেমে গেল। বলল, ‘কল রিসিভ কর ভাই, জরুরি কল হতে পারে।’
‘জি জনাব, প্রধানমন্ত্রীর কল।’ বলেই কল রিসিভ করল আহমদ মুসা।
কুশল বিনিময়ের পর ওপারের কথা শুনলো আহমদ মুসা।
যেভাবে আহমদ মুসা বলল, ‘মি. প্রাইম মিনিস্টার, আজ দুপুরে এবং এই রাতে যে বড় বিজয় এসেছে, তাতে প্রকৃতই আমার কৃতিত্ব নেই। শক্তি সাহস, জ্ঞান, আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন এবং তিনিই এই বিজয় এনে দিয়েছেন। আমি আপনার সাথে একমত, আল্লাহ বুজুমবুরা, বুরুন্ডিকেও দুর্যোগ মুক্ত করবেন। তবে আমি দুঃখিত মি. প্রাইম মিনিস্টার, আগামী রাতের প্রেসিডেন্টের ডিনারে আমি যেতে পারছি না। কালকেই কোনো এক সময় আমি বুজুমবুরা ছাড়ছি।’
আবার ওপ্রান্তের কথা শুনতে লাগলো আহমদ মুসা।
এদিকে ঘরে উপস্থিত ইদি আসুমানি মোহাম্মদ, আসুমানি আব্দুল্লাহর মুখ বিস্ময় ও বেদনায় ছেয়ে গেছে। পর্দার ওপারে মেয়েদের মধ্যেও একই অবস্থা।
প্রধানমন্ত্রীর কথা শোনার পর আহমদ মুসা বলল, ‘আমি আমার অপারগতার জন্য আপনাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি মি. প্রাইম মিনিস্টার। আমার প্রোগ্রাম স্থির হয়ে গেছে। কালকে কোনো এক সময় আমি জাঞ্জিবারে পৌঁছব। সেখান থেকে আমার যাত্রা দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের কোনো এক দ্বীপে নতুন অভিজ্ঞতার অন্বেষায়। আল্লাহ চাইলে আবার দেখা হবে আপনাদের সাথে।
আরো কিছু কথা শেষে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর কল অফ হয়ে গেল। মোবাইল পকেটে পুরে তাকালো আহমদ মুসা ইদি আসুমানি মোহাম্মদের দিকে।
বিস্ময় বেদনায় নির্বাক তখন ইদি আসুমানি মোহাম্মদ এবং আসুমানি আব্দুল্লাহ।
‘জনাব অনুমতি দিলে একটা কথা আমি বলতে চাই।’ বলল আহমদ মুসা ইদি আসুমানি মোহাম্মদকে লক্ষ্য করে।
‘কি বলবে সেটা পরে, কিন্তু তুমি কি বললে? কি শুনলাম আমি!’ ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলল।
‘আমার চলে যাবার কথা বলছেন? আসলে তো যেতেই হবে। সেই যাওয়াটা কালকেই যেতে হচ্ছে জনাব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন যেতে হচ্ছে? এইভাবে হঠাৎ? তুমি আহত। তোমার কথা সত্য হলে যুদ্ধ সবে শেষ হতে যাচ্ছে। তুমি আমাদের জন্যে অনেক করেছ। আমাদেরকে কিছুই করতে দেবে না?’ বলল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ। কান্নারুদ্ধ তার কণ্ঠ।
‘স্যরি জনাব। এইভাবে আমি মানুষকে কষ্ট দিয়ে থাকি। আমিও কষ্ট পাই না, তা নয়। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না। আমি এখানে এসেছিলাম, কেউ আমাকে ডাকেনি। আল্লাহর ইচ্ছাতেই আমি এসেছি। আবার আমি চলেও যাচ্ছি, কেউ আমাকে যেতে বলেনি। আমি মনে করি আল্লাহর ইচ্ছাতেই সর ঘটে থাকে।’ বলল আহমদ মুসা।
চোখ মুছল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ। বলল, ‘তুমি যা বললে ভাই তার উপর কোনো কথা নেই? আমরা সকলেই আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। কিন্তু তারপরও কি কালকেই চলে যাওয়াটা এড়ানো যায় না?’
‘কিন্তু জনাব, কালকে এবং তারপরের দিনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বরং কালকের পরের দিনের যাওয়াটাই আমাদের জন্য আরও কষ্টদায়ক হতে পারে। অতএব আমার অনুরোধ আমার যাওয়াটাকে স্বাভাবিকভাবে নিলে আমি কষ্ট কম পাবো।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ, আহমদ মুসা ভাই। তুমি যেমন মাঠের রাজা, তেমনি কথার রাজাও। সত্যি আহমদ মুসা, আমি বা আমাদেরই ভুল। তোমাকে আসার জন্য ডাকতে হয় না, আবার চলে যাবার জন্য অনুমতিরও প্রয়োজন নেই। তারপর ‘সুবর্ণ দ্বীপ’ তোমাকে ডেকেছে। তোমাকে আটকানো ঠিক নয়, বুঝতে পারছি আহমদ মুসা।’
থামল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ। তার দুচোখ থেকে নেমে এলো দুফোঁটা অশ্রু।
আবারও চোখ মুছল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ, ‘বলো আহমদ মুসা, তুমি কি যেন বলতে চাচ্ছিলে।’
‘দুঃখিত জনাব, আপনাদের আমি কষ্ট দিয়েছি। কিন্তু…।’ আহমদ মুসার কথার মাঝখানেই ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলে উঠল, ‘আহমদ মুসা, তোমার কষ্ট পাওয়ার প্রয়োজন নেই। তোমার জন্য যেটা কষ্টের, আমাদের জন্য তা আনন্দের, সৌভাগ্যের। আল্লাহই আমাদের এ সৌভাগ্য দিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ, এখন বলো তোমার কথা আহমদ মুসা।’
‘জনাব, আমাকে মাফ করবেন, আমার কথা কিছুটা অনধিকার চর্চার মতো শোনাবে। আমাদের কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলীর অনেক অভিভাবকের মধ্যে আমিও একজন। সে অবিবাহিত। আমি তার জন্য কনে খুঁজছি। আপনি কি আমাকে সাহায্য করতে পারেন?’ বলল আহমদ মুসা।
ইদি আসুমানি মোহাম্মদের চোখে মুখে একটা বিস্ময়, একটু ভাবনা। তারপরেই তার মুখে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘আহমদ মুসা, আমিও একটা পাত্র খুঁজছি। তবে আমাকে কয়েক মিনিট সময় দাও আহমদ মুসা, তোমার প্রশ্নের জবাব দেবার জন্য।’
বলেই ইদি আসুমানি মোহাম্মদ ছেলে আব্দুল্লাহকে বলল, ‘চলো আব্দুল্লাহ একটু ভেতর থেকে আসি।’
ইদি আসুমানি মোহাম্মদ এবং আসমানি আব্দুল্লাহ ভেতরে চলে গেল।
ওরা চলে যেতেই সিতি সাবেরার বাবা আবু ওমার আব্দুল্লাহ ইয়ামেনি হাসিমুখে আহমদ মুসাকে বলল, ‘কি ব্যাপার জনাব, একদম সরাসরি ঘটকালী।’
‘হ্যাঁ জনাব! আমাদের কমান্ডার ভাইটি ইসলামের আইনের উপর, সামাজিক বিধানের উপর এবং নিজের উপর জুলুম করছেন। বিয়ে না দিয়ে তাকে জাঞ্জিবারে ফিরতে দেব না। জাঞ্জিবার এতদিনও তাকে কনে দেয়নি, বুজুমবুরা নিশ্চয়ই দেবে, ইনশাআল্লাহ।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এই ঘোরতর লড়াই অবস্থার মধ্যেও আপনি এদিকটা লক্ষ্য করেছেন? অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। একটা বড় কাজ আপনি করছেন।’ আবু ওমার আব্দুল্লাহ বলল।
কথা শেষ করেই কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলীর পিঠ চাপড়ে বলল, ‘কি ভাবছো ইয়াং ম্যান? আর কেউ নয় এবার স্বয়ং আহমদ মুসা তোমাকে ধরেছেন নড়বার কায়দা নেই।’
লজ্জা বিজড়িত ব্ৰিত কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলীর মুখ। বলল, ‘স্যার আমার কথা ভেবেছেন, এটাই আমার সৌভাগ্য। তবে আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, স্যার আমাদের ‘সুবর্ণ দ্বীপে’ যাচ্ছেন। নিজেই এত দ্রুত এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, এটা আমার এবং আমাদের সবার কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। এটা আল্লাহর সাহায্য আমাদের জন্যে।’
কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা চলল আরও কিছুক্ষণ। ইদি আসুমানি মোহাম্মদ ও আসুমানি আবদুল্লাহকে আসতে দেখে কথা থেমে গেল।
এবার ইজিচেয়ার নয়, সোফায় গিয়ে বসল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ। তার পাশেই বসলো তার ছেলে আসুমানি আব্দুল্লাহ।
বসেই ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলল, ‘ভাই আহমদ মুসা, কনে পাওয়া গেছে। এখন করণীয় বলো।’
‘কনের পরিচয় পেলে ভালো হয়। এটা জানা বরের তো হক বলল আহমদ মুসা হাসিমুখে।
কনেকে তুমি জানো। বর এবং অন্য সবার জন্য বলছি, কনে আমার একমাত্র নাতনি সামিরা সাদিয়া, অল্প কিছুদিন হলো বুজুমবুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় ঢুকেছে। ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলল।
আহমদ মুসাসহ সবাই বলে উঠল ‘আলহামদুলিল্লাহ’।
মুখ নিচু করলো কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী।
‘ভাই আহমদ মুসা, তুমি তো একটা বড় ঘটনার সূচনা করলে, তা তোমাকেই শেষ করতে হবে। কিন্তু তুমি কাল তো চলে যাচ্ছ।’ বলল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ।
‘আমি সূচনা করে গেলাম। আপনারা সবাই মিলে এটা সম্পন্ন করবেন। আপনাদেরই এটা দায়িত্ব।’ আহমদ মুসা বলল।
ভাবছিল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ এবং আসুমানি আব্দুল্লাহ দুজনেই।
.
ড্রইংরুমের দরজায় এসে দাঁড়াল সামিরা সাদিয়ার ছোটভাই আমর আসুমানি মোহাম্মদ। বলল সে, ‘দাদাজী, আপাজী বলেছেন, স্যার ‘সুবর্ণ দ্বীপ’ থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত বিয়ে স্থগিত থাকবে।’ আমর আসুমানির কথাটা সবার উপরই ক্রিয়া করল। কেউ বিস্মিত, কেউ বিব্রত। সবাই নীরব।
নীরবতা ভেঙে ইদি আসুমানি মোহাম্মদ বলল, ‘বলো আহমদ মুসা, এখন কি করবে? কি করণীয়?’
আহমদ মুসা গম্ভীর হলো। বলল, জনাব, আগামীকাল বাদ জুমআ বিয়ে হবে। সবাই প্লিজ প্রস্তুত হোন।
আবার নীরবতা। সবাই বিস্মিত, কেউ কেউ আনন্দিত। জাঞ্জিবার থেকে যারা এসেছে, তাদের জন্যে এটা আনন্দের। তবে কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী অনেকটা বিব্রত। কিন্তু কারও মুখেই কথা নেই। কি বলার আছে আহমদ মুসার এই কথার উপর।’
এবারও নীরবতা ভাঙল ইদি আসুমানি আব্দুল্লাহই। বলল, ‘ভাই আহমদ মুসা, এটা কি তোমার সিদ্ধান্ত? আমাদের উপর আদেশ?’
‘মাফ করবেন জনাব, আমি আদেশ দিতে পারি না। তবে আমার সিদ্ধান্ত জানাতে পারি, যা মানা, না মানা দুই এখতিয়ারই আপনাদের রয়েছে।’ বলল আহমদ মুসা সহজ, শান্ত স্বরে।
আবার নীরবতা। একটা অস্বস্তি সবার চোখে-মুখে।
নীরবতা ভাঙল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ। তাকিয়েছিল আসুমানি আব্দুল্লাহর দিকে। বলল, ‘আব্দুল্লাহ বিয়ের আয়োজন কর। যাদের খবর দেয়া দরকার খবর দাও। রাতের মধ্যেই সবাইকে জানাও। আল্লাহর হাজার শোকর। আল্লাহ আমাদের অপার সৌভাগ্যের মালিক করেছেন। স্বয়ং আহমদ মুসা আমার নাতনীর বিয়ের অভিভাবক হয়েছেন। এর চেয়ে বড় পাওয়া আমাদের আর কিছু নেই।’
‘আমার আর একটা কথা আছে। সিতি সাবেরা এবং আলী মুইজির বিষয়ে কিছু বলার জন্যে মুহতারাম ভাই আবু ওমার আব্দুল্লাহ ইয়ামেনীর অনুমতি চাই।’ বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার কথা শুনে আবু ওমার আব্দুল্লাহ প্রথমে বিস্মিত হয়েছিল। তার পরেই তার মুখ প্রসন্ন হয়ে উঠল। বলল, ‘আমাদের মহান ভাই জনাব আহমদ মুসার ইঙ্গিত আমি বুঝতে পেরেছি। আমি খুবই আনন্দ বোধ করছি এবং নিজেদের খুব সৌভাগ্যবান মনে করছি যে, তিনি আমাদের সন্তানদের নিয়ে চিন্তা করেছেন। আল্লাহ তাকে অশেষ জাযাহ দান করুন।’
একটু থামল আবু ওমার আব্দুল্লাহ। সঙ্গে সঙ্গেই আবার বলে উঠল, ‘আমি একটু সময় চাচ্ছি। আমি আলী মুইজির বাবার সাথে একটু কথা বলতে চাই এ নিয়ে।’
‘অবশ্যই জনাব। ওদের সাথে কথা বলুন। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া তাদের হক। আমি প্রস্তাব করেছি মাত্র।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ধন্যবাদ।’ বলে আবু ওমার আব্দুল্লাহ মোবাইল হাতে নিয়ে ঘর থেকে বাইরে গেল।
ফিরে এলো তিন চার মিনিট পরেই।
তার আসনে বসেই বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, ও পক্ষ ভীষণ খুশি। মুহতারাম ভাই আহমদ মুসার সাথে যাতে দু’একটা কথা বলার সুযোগ পায়, এজন্যে আলী মুইজির আব্বা অনুরোধ করেছে। একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পার্লামেন্টের অধিবেশন চলছে। চেষ্টা করবেন, যদি পারেন তাহলে সকালের ফ্লাইটেই তিনি বুজুমবুরায় পৌঁছবেন।’
আহমদ মুসাসহ সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলল।
‘তাহলে দুই বিয়েই আমরা এক আয়োজনে করে ফেলতে চাই।’ বলল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ।
সবাই বলে উঠল, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’
‘চলুন, সবাই আমরা এখন বিশ্রামে যাই। অবশিষ্ট রাতটুকু যেন আমরা আরামদায়ক ঘুমে কাটাতে পারি, আল্লাহ সে তৌফিক দিন।
ইদি আসুমানি মোহাম্মদ তাকাল ছেলে আসমানি আব্দুল্লাহর দিকে। বলল, ‘প্রয়োজনীয় টেলিফোন সেরে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাও। সকালে উঠেই কাজে লেগে পড়তে হবে। দুই বর, দুই কনে- সবার বাজারই তুমি এক সাথে সেরে ফেলবে। তোমার মা এবং বৌমাকে রাতেই লিস্ট বানাতে বলে দাও।’
উঠে দাঁড়াল ইদি আসুমানি মোহাম্মদ। লাঠিতে ভর দিয়ে সামনে এগোবার জন্যে পা ফেলল। সবাই উঠে দাঁড়াল।
আমর আসুমানি মোহাম্মদ জাঞ্জিবারের মেহমানদের নিয়ে চলল তাদের ঘরের দিকে।
সবার শেষে ড্রাইং রুম থেকে বের হলো আহমদ মুসা ও আসুমানি আব্দুল্লাহ। হাঁটতে হাঁটতে আসুমানি আব্দুল্লাহকে আহমদ মুসা বলল, ‘আমি তো কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী এবং মুইজি সাবেরাদের লোকাল গার্ডিয়ান। ওদের জন্য খরচ করা তো আমার হক।
দাঁড়িয়ে গেল আসুমানি আব্দুল্লাহ। চেপে ধরল আহমদ মুসার দুই হাত। বলল, ‘আল্লাহ আমাদের সুযোগ দিয়েছেন মূল্যবান এই কাজে কিছু খরচ করার, আপনি দয়া করে আমাদের বঞ্চিত করবেন না জীবনে অনেক খরচ করার তৌফিক আল্লাহ দিয়েছেন, কিন্তু এমন ভালো সুযোগ কখনো পাইনি, ভবিষ্যতে পাব কিনা জানি না। প্লিজ, আপনি আমাদের সবার জন্যে দোয়া করুন আল্লাহর দয়া এবং বরকত যেন আমরা অঝোর ধারায় পাই।’
‘জাযাকাল্লাহ। ধন্যবাদ আপনাদের।’ বলল আহমদ মুসা। হাঁটতে লাগল আবার দু’জনেই।
ড্রইংরুম থেকে বের হয়ে কিছুটা এগোতেই আহমদ মুসার সামনে এসে দাঁড়াল আনা আরিয়া। তার শরীর চাদরে জড়ানো। মুখে নেকাব। আহমদ মুসার সামনে এসে নেকাব খুলে ফেলেছে। বলল, ‘ভাইয়া আপনি কালকেই চলে যাবেন।…
কান্নায় গলা আটকে গেল আনা আরিয়ার। কথা বলতে পারল না।
‘কেঁদ না বোন। আমি যেখানে থাকি, সেই মদিনা মুনাওয়ারা তো আফ্রিকার পাশেই। তাছাড়া সামনে বেশ কিছু সময় তো আমি আফ্রিকার আশেপাশেই থাকছি।’ বলল আহমদ মুসা।
আনা আরিয়া নিজেকে সামলে নিয়ে চোখ মুছে ভারি ও ভাঙা গলায় বলল, ‘ভাইয়া আপনিই তো চাওসিকোকে ইউজিজি পাঠিয়েছেন। সে জানতেই পারল না আপনি যাচ্ছেন। বাবা-মা জরুরি এক কাজে কায়রোতে গেছেন। তারা বলেছেন, তারা আপনার জরুরি সাক্ষাৎ চান।’
‘ঠিক আছে বোন। চাওসিকোকে বলে দাও সকালেই যেন চলে আসে। আর তোমার বাবা-মাকে বলে দাও কাল সকাল বা বিকালের ফ্লাইটে তারাও যাতে আসতে পারেন। কাল রাত ১২টায় আমার ফ্লাইট।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ভাইয়া, এটা আপনার কি অবিচার। কালকে ওদের বিয়ে দিচ্ছেন, আর কালকেই রাত ১২টায় আপনি চলে যাচ্ছেন! জাঞ্জিবারের মেহমানরা কি করবেন? ওরা তো আপনাকেই নিয়ে যেতে এসেছেন!’
‘অসুবিধা নেই আনা আরিয়া। আমি কালকে যাব, আমার ওখানে কিছু কাজ আছে। ওরা পরের দিন যাবেন। ওদের যাওয়ার জন্যে কিছু আয়োজন দুই পক্ষেরই দরকার। জাঞ্জিবার ও দুদুমার দুই ঘরে দুই নতুন বউ যাবে, তাই ওদের জন্যে একটা সময় দরকার ছিল।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ভাইয়া, বুজুমবুরা ছেড়ে যেতে আপনার মন সায় দিচ্ছে?’ আনা আরিয়া বলল। ভারী ও কাঁপা কণ্ঠ আমা আরিয়ার।
‘পাগলী বোন, এসব মনে করতে নেই। পেছনে তাকালে সামনের গতি আটকে যায়।’ বলল আহমদ মুসা হাসতে হাসতে।
‘তার মানে আমরা যারা পেছনে পড়ে গেলাম, তাদের কোনো মূল্য নেই!’ রুদ্ধপ্রায় কণ্ঠে বলল আনা আরিয়া।
‘পেছনে না তাকানোর অর্থ পেছনকে ভুলে যাওয়া নয়। সামনে চলার পথে যখন একাকিত্ব আসে, সামনে যখন কোনো সীমাহীন প্রান্তর দেখি, যখন তাকাই নীরব-নিঃসীম আকাশের দিকে, তখন আকাশের সীমাহীন চাঁদোয়ায় অতীতের সব স্মৃতি, সব ছবিকেই জীবন্ত আমি দেখি।’ বলল আহমদ মুসা। মনের কোন অতল তল থেকে উঠে আসা গভীর, শান্ত কণ্ঠ আহমদ মুসার।
ওড়না মুখে চেপে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল আনা আরিয়া।
একটু দূরেই দাঁড়িয়ে পড়েছিল আসমানি আব্দুল্লাহ।
সে একধাপ এগিয়ে এলো আহমদ মুসার দিকে। পেছন দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘জনাব, সামিরা সাদিয়া অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে আপনাকে সালাম দেবে, দোয়া চাইবে বলে।’
পেছনে তাকাল আহমদ মুসা। কালো চাদরে আবৃতা সামিরা সাদিয়া। মাথায় কালো চাদর কপালের উপর দিয়ে মুখের উপর ঝুলে পড়েছে।
আহমদ মুসা সালাম দিতে যাচ্ছিল। তার আগেই সামিরা সাদিয়ার তরফ থেকে সালাম এলো। তার কাঁপা কণ্ঠ।
‘সামিরা সাদিয়া, আমরা সবাই মিলে যে সিদ্ধান্ত নিলাম, তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কবুল করুন। তোমাদের দুজনের জন্যে তা মুবারকময় হোক।’ বলল আহমদ মুসা।
‘অন্ধকার আফ্রিকার ক্ষুদ্র বুজুমবুরার অজানা অখ্যাত এক সামিরা সাদিয়ার জন্যে আপনি এতটা ভেবেছেন, তার জন্যে আমরা সবাই কৃতজ্ঞ। আল্লাহ আপনাকে এর পূর্ণ জাযাহ দিন। আর দোয়া করবেন, আপনার দেয়া সাংবাদিকতার দায়িত্ব যেন আমি পালন করতে পারি। আর…।
কথা শেষ করতে পারল না সামিরা সাদিয়া। কান্নায় ডুবে গেল তার কণ্ঠ।
‘সামিরা সাদিয়া তোমার ইচ্ছাকে আল্লাহ কবুল করুন। আজ সাংবাদিকতার পেশা মুসলমানদের জন্যে জীবন-সঞ্জীবনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে, প্রয়োজন মনে করলে আমার সাহায্য তুমি পাবে। ভাই আব্দুল্লাহ আলীকেও আমি বলে যাব।’ বলল আহমদ মুসা। ‘অনেক ধন্যবাদ স্যার। সামান্য এক বোনকে আপনার সহযোগিতার যে আশ্বাস, তার জন্যে আল্লাহর শুকরিয়া করছি।
মুহূর্তের জন্যে একটু থেমেই সামিরা সাদিয়া বলল, ‘মাফ করবেন স্যার, একটা কথা বলতে চাই।’
‘যা বলা যায়, তা অবশ্যই বলতে পার।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আনা আরিয়া এখনও কাঁদছে। শুনে আমারও কান্না এসেছিল। বলেছেন, আপনি কিছু ভুলে যান না। তাহলে সীমাহীন স্মৃতির দুঃসহ ভার কি আপনার জীবনকে, আপনার সামনে এগিয়ে যাবার গতিকে কষ্টকর করে না?’ সামিরা সাদিয়া বলল। তার ভেজা কণ্ঠস্বর।
আহমদ মুসা গম্ভীর হলো। বলল, ‘আল্লাহ মানুষের জীবনকে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সমন্বয়ে সৃষ্টি করেছেন। অতীত শুধু ভার নয়, বর্তমানের চালকও। অতীত শুধু কষ্টের নয়, শিক্ষা এবং প্রেরণারও। অতীত বিষণ্নতার নয়, আনন্দেরও। সুতরাং প্রকৃত অর্থেই অতীত বর্তমানের খাজাঞ্চিখানা। অতীত হলো বর্তমান ও ভবিষ্যতের পাথেয়। ভবিষ্যতের ব্লু প্রিন্ট মানুষ অতীত দিয়েই এঁকে থাকে।’ থামল আহমদ মুসা।
‘আলহামদুল্লিাহ। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ স্যার। আপনার এক বোন আপনার কাছ থেকে অবিস্মরণীয় কিছু শিক্ষা পেল। আল্লাহ যেন এতে…।’ কথা শেষ করতে পারল না সামিরা সাদিয়া।
আনা আরিয়া দ্রুত কয়েক ধাপ এগিয়ে এসে বলল, ‘এক বোন কেন? দুই বোন অবিস্মরণীয় এ শিক্ষা পেল।
‘আলহামদুলিল্লাহ। ঠিক আছে দুই বোনই পেল।’ বলল সামিরা সাদিয়া। আনা আরিয়ার দিকে তার প্রসন্ন দৃষ্টি।
‘তা ঠিক আছে। কিন্তু ভাইয়া, সাদিয়া আপাকে বেশি ভালো কথা বলেছেন।’ আনা আরিয়া বলল। তার ঠোঁটে ছোট্ট একটা হাসি।
‘ভাইয়ার চেয়ে ‘স্যার’ই তো তার ছাত্রীকে বেশি শিক্ষণীয় কথা বলেন।’ বলল সামিরা সাদিয়া। তার ঠোঁটে কিছুটা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠেছে।
‘কিন্তু স্যারের চেয়ে ভাইয়াই তো বড়।’ আনা আরিয়া বলল।
‘চলো, আমরা ঘরে গিয়ে ঝগড়া করি। স্যারকে যেতে দাও।’
বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে সামিরা সাদিয়া শান্ত, গম্ভীর কণ্ঠে একটা পরিপূর্ণ সালাম দিল আহমদ মুসাকে। তারপর আনা আরিয়াকে জড়িয়ে ধরে হাঁটতে শুরু করল।
আনা আরিয়া মুখ ঘুরিয়ে আহমদ মুসাকে সালাম দিয়ে বলল, ‘কাল দেখা হবে ভাইয়া।’
আহমদ মুসা ও আসুমানি আব্দুল্লাহ দুজনেই হাসল।
‘এরা বড় হয়েছে, কিন্তু মনটা ছোট বেলাতেই রয়ে গেছে।’ বলল আসুমানি আব্দুল্লাহ। স্বগত কণ্ঠস্বর তার।
হাঁটতে শুরু করল দুজনেই।
শান্তির দ্বীপে সংঘাত – ৩
৩
আহমদ মুসা যেদিন কোমরো ও মাদাগাস্কার দ্বীপ হয়ে ‘সুবর্ণ দ্বীপে’ পৌঁছার জন্য জাঞ্জিবার থেকে বের হলো, তার আগের কথা। ঠিক কথা নয়, একটা ঘটনা। ঘটনার স্থান জান্নাতুল আরদ।
সুবর্ণ দ্বীপের পুব পাশে প্রায় লাগোয়া একটা দ্বীপ ‘জান্নাতুল আরদ’। একটা ওভার ব্রীজের দ্বারা সংযুক্ত জান্নাতুল আরদ মূল দ্বীপের সাথে।
সুবর্ণ দ্বীপের চারদিকের সাগর শান্ত কয়েকশ’ বছর ধরে।
কিন্তু জান্নাতুল আরদ-এর সাগর আরও সুশান্ত।
নীল সাগরের বুকে জান্নাতুল আরদ একটা সবুজ ডট-এর মতো। জান্নাতুল আরদ-এর চারদিক ঘিরে সুন্দর সমতল বালুকাময় বীচ। বীচের সমান্তরালে ছোট দ্বীপটির চারদিক ঘিরে অনুচ্চ সবুজ পাহাড়ের সুন্দর বৃত্ত। আর বৃত্ত জুড়ে রঙ-বেরঙয়ের বাড়ি-ঘরের অপরূপ মেলা। বৃত্তের মাঝখানে উপত্যকা-অধিত্যকা জুড়ে ফল-শস্যের সম্ভার, যেন গোটা দ্বীপটাই একটা বাগান। দ্বীপে আছে মিঠা পানির হ্রদ, দিঘি এবং জলাশয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো দ্বীপটির চারদিকের বীচে একটু খুড়লেই মিঠা পানি পাওয়া যায়। গোটা দ্বীপটাই যেন একটা স্বাস্থ্য নিবাস, ভ্রমণ-পিয়াসীদের জন্যে হতে পারে এক ভূ-স্বর্গ। সুবর্ণ দ্বীপ যিনি আবাদ করেছিলেন, দ্বীপে যিনি সভ্যতা-মানবতার আলো জ্বেলেছিলেন, দ্বীপে শান্তির সমাজ গড়েছিলেন যিনি, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কল্যাণ-রাষ্ট্র, সেই দরবেশ আবদুল্লাহ আলী বিন আব্দুর রহমান সুন্দর এই বীচ, সবুজ পাহাড়ের বৃত্ত এবং ফল ও শস্যভারে শোভিত ক্ষুদ্র দ্বীপটির নাম দিয়েছিলেন ‘জান্নাতুল আরদ-দুনিয়ার জান্নাত’। দুনিয়ার সেই জান্নাতকে অপরাধ এবং অপরাধীরা আজ জাহান্নামে পরিণত করেছে। আগের বাসিন্দাদের মেরে কেটে, উচ্ছেদ করে সেখানে বসানো হয়েছে বাইরে থেকে আসা শ্বেতাংগদের। সেই জান্নাতুল আরদে চলছে এখন জঘন্য ধরনের টুরিস্ট ব্যবসায়। উপকূলীয় সবুজ বৃত্তের মনোরম বাড়িগুলো হয়েছে পর্যটক নিবাস। দুনিয়ার অপরাধীদের বড় আড্ডাখানা এখন এটা। তারা দলে দলে এখানে আসে, যায়। মাঝে মাঝে দ্বীপে দস্যুতার মতো বড় বড় ঘটনাও ঘটে।
এই জান্নাতুল আরদ দ্বীপ থেকে ২০ মাইল পশ্চিমে মূল আইল্যান্ড- সুবর্ণ দ্বীপের একটি কমার্শিয়াল বন্দর বাবেল মানদেব থেকে দুই সিটের একটা কমার্শিয়াল বোট ছুটে চলছে। বোটটির মাথা জান্নাতুল আরদ দ্বীপটির দিকে।
বোটটিতে একজন আরোহী এবং চালক একজন।
আরোহীটির আরবীয় চেহারা। ব্যায়ামপুষ্ট, ঋজু শরীর। আর্মিকাট চুল। পরনে ডিপ অ্যাশ কালারের জ্যাকেট ও টাউজার। মাথায় অ্যাশ কালারেরই আর্মি ক্যাপ।
বোটের আরোহীটি দ্বীপের উপকূলের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে উত্তর-পশ্চিমমুখী হয়ে নামাজে দাঁড়াল।
বোটের চালক তাকাল নামাজরত আরোহীর দিকে। তার চোখে মুখে বিস্ময় ও আনন্দ। মনে মনে বলল, ‘আমার চেনা তাহলে ঠিক, আলহামদুলিল্লাহ। সেনাবাহিনী ছেড়ে দিলে খবরসহ একটি ছবি বেরিয়েছিল স্থানীয় একটি সাপ্তাহিক কাগজে। কাগজের সেই ছবির সাথে এর হুবহু মিল আছে। সে খবরে তার পরিচয়ের কথাও লিখা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এই পরিচয়ের কারণেই তাকে সেনাবাহিনী ছাড়তে বাধ্য হতে হয়েছে।
নামাজ শেষ হলো আরোহীটির। নামাজ শেষ হলে চেয়ারে এসে বসল সে।
বোটের চালক তাকে সালাম দিল প্রসন্নমুখে।
‘ওয়ালাইকুম সালাম’ বলে সালাম নিয়ে সে বোট চালককে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আপনি মুসলমান?’
বোট চালক সুবর্ণ দ্বীপের আদিবাসী চেহারার লোক।
গায়ের রং আরবীয়দের মতো মনে হলেও চেহারায় আদিবাসী ভাবই মুখ্য।
‘জি, আমি মুসলমান।’ বলল বোট চালক।
নাম তো বলেছ ইবেকা।’ আরোহীটি বলল।
‘জি বলেছি। কিন্তু আমার নাম আব্দুল্লাহ ইবেকা।’ বলল বোট চালক।
‘আব্দুল্লাহ অংশটা গোপন করেছ কেন?’ জিজ্ঞাসা আরোহীর। ‘স্যার, চারদিকের যে অবস্থা। জীবিকা ও বেঁচে থাকার স্বার্থেই নামের এই অংশটা আমি গোপন রেখে চলি।’
‘আমাকে ‘স্যার’ বলছ কেন? আরোহী সবাইকে তো ‘স্যার’ বল না?’ বলল আরোহী।
‘স্যার, আপনারা আমাদের মাথার মণি। আপনাদের নয়তো কাদের স্যার বলব? দস্যুদের?’ বোট চালক বলল। তার কথায় কিছুটা আবেগের পরশ।
বিস্ময় ফুটে উঠল বোট আরোহীর চোখে-মুখে। বলল, ‘আমি কে, যে এই কথা বলছ? চিন আমাকে?’
‘চিনতে পেরেছি স্যার আপনাকে। আপনি আমাদের দরবেশ হুজুরের বংশধর। আপনি সেনাবাহিনীর একজন কর্নেল ছিলেন। সেনাবাহিনী থেকে আপনি রিটায়ারমেন্ট নিয়েছেন।’ বলল বোট চালক।
‘আমার সম্পর্কে এত কথা জান কি করে?’ জিজ্ঞাসা আরোহীটির।
‘আরবি ‘সাপ্তাহিক সুবর্ণ’তে আপনার ছবি দেখেছি। সেনাবাহিনী থেকে আপনার পদত্যাগ, আপনার পরিচয় সবই সাপ্তাহিক সুবর্ণতে আমি পড়েছি। আপনার আসল নাম লেখা ছিল, কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ।’ বলল বোট চালক।
আরোহীটি মানে কর্নেল ওবায়দুল্লাহর চোখে মুখে আবার বিস্ময় নেমে এলো। ভাবল, ‘আরবি সাপ্তাহিক সুবর্ণ’ একটা গোপন পত্রিকা। ছাপা ও বিলি গোপনে হয় এবং যারা পড়ে গোপনেই পড়ে। সাগর সাইমুমের মুখপত্র এটা। কিন্তু বোট চালক আব্দুল্লাহ ইবেকা সাপ্তাহিক সুবর্ণের কথা জানল কি করে? সাগর সাইমুমের সাথে কি তার সম্পর্ক আছে! বলল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ, ‘আব্দুল্লাহ ইবেকা, সাপ্তাহিক সুবর্ণ তোমরা নিয়মিত পড়? পাও কোথায়?’
আব্দুল্লাহ ইবেকা একটুক্ষণ নীরব থাকল। তাকাল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহর দিকে। বলল, ‘আমাদের ওখানে নিয়মিত আসে। সেখান থেকে আমরা পড়ি।
‘সাগর সাইমুম সম্বন্ধে তোমরা জান?’ বলল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ।
‘জি স্যার, জানি।’ আব্দুল্লাহ ইবেকা বলল।
‘কিভাবে জান? তোমাদের কেউ সাগর সাইমুমের সাথে আছে?’ বলল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ।
‘স্যার, আমাদের নেতা, মানে সাগর সাইমুমের নেতা ডাবল জিরোকে আপনি চেনেন, দেখেছেন স্যার?’ আব্দুল্লাহ ইবেকা বলল।
এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহর ঠোঁটে।
ডবল জিরো (OO=Osama Obaidullah) মানে ওসামা ওবায়দুল্লাহ। এই কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ আব্দুল্লাহ বিন যুবায়েরের নাতি এবং আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের জলদস্যুরা সুবর্ণ দ্বীপ দখলকালে বেঁচে যাওয়া নৌকমান্ডার ও দরবেশ আব্দুল্লাহ আলী ইবনে আব্দুর রহমানের বংশধর যুবায়ের বিন আব্দুর রহমানের প্রপৌত্র।
‘হ্যাঁ, আব্দুল্লাহ ইবেকা। তুমিও কি তাকে জানতে চাও, দেখতে চাও?’ আব্দুল্লাহর ইবেকার প্রশ্নের উত্তরে বলল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ।
‘না স্যার, উনি গোপনে আছেন, গোপনেই থাকুন। জলদস্যুদের সরকার মানুষের সরকার নয়। কিছু করতে হলে গোপনে থেকে সাবধানেই করতে হবে। আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করুন। চালক আব্দুল্লাহ ইবেকা বলল।
‘আব্দুল্লাহ ইবেকা অপূরণীয় ক্ষতি তোমাদের হয়েছে। অনেক কষ্ট তোমরা করেছ, অনেক কষ্ট তোমরা এখনও করছ। আমাদের কারণেই তোমাদের কষ্ট আরও বেশি হয়েছে।’ বলল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ।
‘আমরা আর কি কষ্ট করেছি। আপনাদের জন্যে কি আর হয়েছে আমাদের! তার চেয়ে হাজার গুণ লক্ষ গুণ বেশি পেয়েছি আমরা আপনাদের কাছে। আমরা সুবর্ণ দ্বীপের আদিবাসীরা নতুন জীবন পেয়েছি আপনাদের কাছে। আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ মহান দরবেশ আব্দুল আলী বিন আব্দুর রহমান আমাদেরকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। আমাদের ধর্ম ছিল না, আমাদের সমাজ ছিল না, লেখাপড়া ছিল না, উন্নত জীবন ও সভ্যতার সাথে আমাদের কোনো পরিচয় ছিল না। আল্লাহর মহান দরবেশের কাছে আমরা সব পেয়েছি। আমরা কিন্তু তাঁকে কিছুই দেইনি, সব সময় সব কাজে তাঁর সাথে থাকা ছাড়া।’ থামল আব্দুল্লাহ ইবেকা।
‘দীর্ঘ আটশ’ বছর পরেও তোমরা দরবেশ আব্দুল্লাহ আলী বিন আবদুর রহমানকে এত ভালোবাসো?’ বলল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ।
‘ভালোবাসবো না স্যার! তিনি এবং তার উত্তরসূরীরা সবাই আমাদের ভালোবেসেছেন। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো সভ্য দেশ তাদের আদিবাসীদের ধ্বংস করেছে। আদিবাসীদের যারা অবশিষ্ট আছে, তাদেরকেও সংরক্ষণের নামে জনগণের মূল স্রোতে মিশতে না দিয়ে ধীরে ধীরে শেষ করে দিচ্ছে। অথচ মহান দরবেশ এবং তার সাথীরা আদিবাসীদেরকে তাদের সমকক্ষ মানুষ হিসেবে বুকে টেনে নেন। ভেদাভেদের দেয়াল ভেঙে দিয়ে সবাইকে নিয়ে এক সমাজ গঠন করেন। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও আদিবাসীদেরকে মহান দরবেশ আরবদের সমান দায়িত্ব ও মর্যাদা দান করেন। আদিবাসীরা এখনও গর্বের সাথে স্মরণ করে যে মহান দরবেশের দুই ছেলে আদিবাসী মেয়েকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে অন্য আরবরাও দরবেশের এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেন। ধীরে ধীরে আরব ও আদিবাসীদের মধ্যে বিয়ে একটা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এইভাবে এই সুবর্ণ দ্বীপে আরব-রক্ত ও আদিবাসীদের রক্ত এক সাথে মিশে এক হয়ে গেছে। এমন অনন্য দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অভিবাসী-ইতিহাসের কোথাও নেই। এমন মানুষকে, এমন মানুষদের কি কেউ ভুলতে পারে!’ বলল আব্দুল্লাহ ইবেকা। তার কণ্ঠ আবেগে ভারি। চোখের কোনায় তার অশ্রু জমে উঠেছে।
কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ বলল, ‘ধন্যবাদ আব্দুল্লাহ ইবেকা। মহানকে যারা মহান বলতে পারে, তারাও মহান আব্দুল্লাহ ইবেকা। আমাদের সুবর্ণ দ্বীপের আদিবাসীরাও মহৎ ও মহান মানুষ।’
একটু থেমেই কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ বলল, ‘আব্দুল্লাহ ইবেকা, তোমরা নীতি আদর্শ এবং দেশপ্রেমের উপর এবং জাতির প্রতি ভালোবাসার প্রতি অটল থাকতে গিয়ে অনেক ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করেছ এবং এখনও করছ এটা আমাকে খুব পীড়া দেয়।’
‘কিন্তু স্যার, বলল আব্দুল্লাহ ইবেকা, এই দস্যু সরকারের হাতে মহান দরবেশের উত্তরসূরী আপনাদেরকে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে দিয়ে আসতে হচ্ছে। আমি আমাদের প্রধানদের কাছে শুনেছি, আপনাদের পরিবারের এক আপনার দাদা আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের ছাড়া আর কেউ বেঁচে ছিলেন না। কাউকে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি। আমরা সকলে সব সময় প্রার্থনা করি, আল্লাহ আপনাদের মহান পরিবারের প্রতি সদয় হোন। আপনাদের নেতৃত্বে আমাদের সকলের মুক্তির প্রচেষ্টা সফল হোক। সুবর্ণ দ্বীপে আবার সোনালি দিন ফিরে আসুক।’ বলল আব্দুল্লাহ ইবেকা।
কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ কিছুটা আনমনা হয়ে পড়েছিল। তার মনে পড়েছিল তার দাদার শিশু জীবন এবং বাল্য-কৈশোরের কথা। সে মানুষ হয়েছিল ড্যান অ্যাডোফো নামের আফ্রো-এশীয় এশিয়ান চেহারার একজন খ্রিস্টান ভালো মানুষের সন্তান হিসাবে। তিনি একজন বড় ফল ব্যবসায়ী এবং দেশের সর্ববৃহৎ ফ্রুট প্রসেসিং কারখানার মালিক ছিলেন। তার বিশাল বাড়িতে সীমাহীন আদরের মধ্যে ননীর পুতুলের মতো তার দাদা মানুষ হয়েছেন। দেশের সর্বোৎকৃষ্ট স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করেছেন তিনি। পিতা ড্যান অ্যাডোফো’র তাকিদেই তিনি সেনাবাহিনীতে ভর্তি হন। যেদিন সেনাবাহিনীর অফিসার পদে কমিশন পেয়ে তিনি বাড়ি এলেন সেদিন পিতা ড্যান অ্যাডোফো তাঁকে নিয়ে তার শোবার ঘরে গেলেন। দরজা বন্ধ করে দিয়ে তাকে নিয়ে বসলেন। একটা চেয়ারে দাদাকে তিনি বসালেন এবং নিজে বসলেন চেয়ারের নিচে মেঝের কার্পেটের উপর। দাদা আপত্তি করলে তিনি বললেন, আমার স্থান এখানে। একটু থেমেই আবার তিনি বলতে শুরু করলেন, আজ তেইশ বছর যে হৃদয়বিদারক কাহিনী আমি আমার বুকে পুষে রেখেছি, সেটা আজ তোমাকে আমার বলতে হবে। আমি তোমার বাবা নই। আজ থেকে ২৪ বছর আগে তোমার দাদা আব্দুর রহমান বিন আব্দুল্লাহ আলী ছিলেন এই সুবর্ণ দ্বীপের প্রেসিডেন্ট এবং তোমার বাবা যুবায়ের বিন আব্দুর রহমান ছিলেন সুবর্ণ দ্বীপ সেনাবাহিনীর একজন শীর্ষ কমান্ডার। আর এই বাড়ি, এই ব্যবসায় সবকিছুর মালিক ছিলেন তোমার বাবার সিকিউরিটি প্রধান আহমদ শরীফ। আমি ছিলাম তার কর্মচারী। এই দস্যু সরকার দ্বীপ দখলের সময় তোমাদের পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হলে গুলিবিদ্ধ মুমূর্ষু আহমদ শরীফ কোনো রকমে তোমার শিশু বাবাকে বাঁচিয়ে এনে আমার কোলে তুলে দেন এবং বাড়ি- ঘর, ব্যবসায়-বাণিজ্য আমাকে দিয়ে বলেন, আমি যেন শিশুটিকে সম্মান ও আদর দিয়ে মানুষ করি। শিশুটি বড় হয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করলে তাকে তার পরিচয় যেন আমি দেই। সেই দায়িত্বই আজ আমি পালন করলাম। কাহিনীটি শুনে আমার দাদু প্রথমে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিলেন, তারপর তিনি অনেক কেঁদেছিলেন, তার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরেছিল অঝোর ধারায়। সে অশ্রু একশ’ বছরের পথ পাড়ি দিয়ে তাকে যেন স্পর্শ করছে।
আব্দুল্লাহ ইবেকা থামলে অতীতের স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া মনের ভাব কেটে গেল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহর। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো কর্নেল ওসামার বুক থেকে। বলল, ‘হ্যাঁ, আব্দুল্লাহ ইবেকা এই দস্যু সরকার সুবর্ণ দ্বীপের লক্ষ লক্ষ মানুষ খুন করেছে। বিরান করছে হাজার হাজার বাড়ি, পরিবার। তারা চাচ্ছে, এদেশের মালিক জনগণকে নিশ্চিহ্ন করে দস্যুরাজকে এখানে চিরস্থায়ী করতে। আমরা ইনশাল্লাহ তাদের এ আশা পূরণ হতে দিব না।’
‘আলহামদুলিল্লাহ। মানুষ চেয়ে আছে সাগর সাইমুমের দিকে।’ বলল আব্দুল্লাহ ইবেকা।
কিছু বলতে গিয়েও কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ থেমে গেল। সামনের দিকে চোখ রেখে বলল, ‘আব্দুল্লাহ ইবেকা, বোটকে জান্নাতুল আরদ দ্বীপের উত্তর সীমান্ত ঘুরে পুব দিকে নিয়ে চলো।
‘আপনি কোথায় নামবেন স্যার?’ জিজ্ঞাসা আব্দুল্লাহ ইবেকার।
‘সুবর্ণ ট্যুর প্রাইভেট লিমিটেডের জেটিতে বোট ভিড়াবে।’ বলল আহমদ মুসা।
সুবর্ণ ট্যুর প্রাইভেট লিমিটেড (এস.টি.প্রা.লি) সাগর সাইমুমের গোপন কম্যুনিকেশন সেন্টার। এস.টি. প্রা. লিমিটেড পাঁচটি কেন্দ্র থেকে সাগর সাইমুমের যোগাযোগ ও ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। ট্যুরিস্টদের বোট ভাড়া দেয়ার আড়ালে তারা এই দায়িত্ব পালন করে। পাঁচটি কেন্দ্রে তাদের ৫০টি বোট আছে। পঞ্চাশটি বোটের জন্যে একশ’ জন বোটম্যান। এরা সবাই সাগর সাইমুমের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। এদের কাজ হলো তথ্য যোগাড় এবং হেডকোয়ার্টারে প্রেরণ করা এবং আক্রমণ বা আত্মরক্ষার প্রয়োজনে মুহূর্তের নোটিশে সংঘবদ্ধ হওয়া। এস.টি.প্রা. লিমিটেড ৫টি কেন্দ্রের ৪টি সুবর্ণদ্বীপের চারদিকে এবং একটি জান্নাতুল আরদ দ্বীপের পূর্ব তীরে। এই কেন্দ্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রটি বাইরের সাথে যোগাযোগে ব্যবহার হওয়া ছাড়াও বাইরে থেকে সাগর সাইমুমের কারো সুবর্ণ দ্বীপের প্রবেশের প্রথম প্ল্যাটফরম হিসেবে ব্যবহার হয়। কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ, সাগর সাইমুমের প্রধান, নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে এই কেন্দ্ৰেই আসছে।
আব্দুল্লাহ ইবেকা তার বোট এই কেন্দ্রের জেটিতে নোঙর করল। যদিও আব্দুল্লাহ ইবেকা সাগর সাইমুমের কর্মী, তবু সাগর সাইমুমের এই গোপন কেন্দ্রের কথা সে জানে না।
সাগর সাইমুমের কাজ দায়িত্বের প্রকৃতি অনুসারে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। একভাগ অন্যভাগের কথা জানে না, অন্য ভাগের কাউকে চিনেও না। সাগর সাইমুমের নেতৃত্বও ভার্টিক্যালি বিন্যস্ত। এক দায়িত্বশীল মাত্র তার উপরের দায়িত্বশীলকে ছাড়া আর কোনো দায়িত্বশীলকে চিনে না।
কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ বোট থেকে নামার আগে আব্দুল্লাহ ইবেকার হাতে আসার ভাড়ার সাথে যাওয়ার ভাড়াটাও গুঁজে দিয়ে বলল, ‘অপেক্ষার দরকার নেই। তুমি চলে যাও।’
আব্দুল্লাহ ইবেকা একবার টাকার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার, আপনার কাছে আমি ভাড়া নিতে পারবো না, তার উপর আবার যাওয়ার ভাড়া! এ আমি নিতে পারব না স্যার।’ ভারী কণ্ঠ আব্দুল্লাহ ইবেকার। ‘আব্দুল্লাহ ইবেকা, আমি তোমার সাথে আসা-যাওয়ার চুক্তি করেছিলাম। চুক্তি অনুসারেই তোমাকে আমি টাকা দিয়েছি। অতএব…।’
কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহর কথার মাঝখানেই আব্দুল্লাহ ইবেকা বলল, ‘স্যার, নিজের সাথে নিজের কোনো চুক্তি হয় না। আমাকে টাকা নিতে বলবেন না স্যার।’
‘দেখ, তুমি আমার ছোট ভাই। আমি বোট চালককে টাকা দেইনি। দিয়েছি আমার ছোট ভাইকে। বড় ভাই ছোট ভাইকে কিছু দিতে পারে কিনা?’
আব্দুল্লাহ ইবেকা কিছু বলল না। আবেগে ভারী তার চোখ মুখ। তার দু’চোখ থেকে নেমে এলো দু’ফোটা অশ্রু। বলল, ‘বড় ভাইয়ের দান আমি নিলাম স্যার। দোয়া করবেন।’
কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ উঠে দাঁড়াল। আব্দুল্লাহ ইবেকার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘আল্লাহ তোমাকে তাঁর রহম ও করমের মধ্যে রাখুন। আল্লাহর বান্দাহদের প্রতি দায়িত্ব পালনে আল্লাহ তোমাকে সব দিক দিয়ে যোগ্য করুন।’
বোট থেকে নেমে গেল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ। হাঁটতে লাগল অফিসের দিকে।
.
কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ এস.টি.প্রা. লিমিটেডের গাড়িতে জান্নাতুল আরদের সেন্ট্রাল ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছে।
সন্ধ্যা নামার বেশি দেরি নেই।
রাস্তায় লোকজন কম। এ সময় লোকেরা ক্লাব-রেস্তোরায় বৈধ- অবৈধ খেলায় মত্ত থাকে টুরিস্টদের মতোই।
কর্নেল ওসামার গাড়ি যাচ্ছিল একটা পার্কের পাশ দিয়ে।
রাস্তার আরেক পাশে কয়েকটা ক্লাব-রেস্টুরেন্ট। রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে। এসব ক্লাবে নাচ, গান, জুয়া খেলা, খানাপিনা, বিশ্রাম সবই চলে। অতএব ক্লাবে আসে নানা ধরনের লোক। কেউ আসে নিছক খানাপিনার জন্যে, কেউ আসে নাচ-গানের জন্যে, একটা বড় অংশ জুয়া খেলার জন্যে আসে। স্বল্প সময় বিশ্রামের জন্য রুম বা সিট ভাড়া নেয়ার ব্যবস্থা আছে। অতএব ক্লাবগুলো সব সময় জমজমাট থাকে।
চলছিল কর্নেল ওসামার গাড়ি।
কিছু উচ্চকণ্ঠ এবং চিৎকার কান্না-কাটির আওয়াজ শুনল কর্নেল ওসামা আব্দুল্লাহ।
কর্নেল ওসামা সামনে তাকাল। দেখল স্বর্ণকেশী একজন তরুণীকে টেনেহেঁচড়ে মাইক্রোতে তোলা হচ্ছে। যারা তুলছে তারাও শ্বেতাংগ- স্কিনহেডেড।
‘স্কিনহেডেডদের দৌরাত্ম্য সুবর্ণ দ্বীপে ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে’- ভাবল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ। পাশ্চাত্যের স্কিনহেডেডদের মতোই সুবর্ণদ্বীপের স্কিনহেডেডরা। একটিই পার্থক্য সেটা হলো, এরা বর্ণবাদী ও সন্ত্রাসী হবার সাথে সাথে এরা খুব বেশি স্বেচ্ছাচারী। কোনো আইন-কানুনের তোয়াক্কা করে না এরা। অনেক সময় দ্বীপের শ্বেতাংগ সরকারকেও তারা বিব্রত করে ফেলে। দ্বীপের শ্বেতাংগ সরকারের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং শ্বেতাংগ দুনিয়ার স্বার্থে সরকার নিও- নাজীদের দৌরাত্ম্য মেনে নেয়।
ঘটনা দেখে কর্নেল ওসামার প্রথমেই মন যেটা বলল, তাহলো ওদের সেম সাইডের ব্যাপার, ওদিকে মনোযোগ না দেয়াই ভালো।
কিন্তু মেয়েটির বাঁচার জন্যে চিৎকার মনের চিন্তাটিকে কোথায় যেন ডুবিয়ে দিল। মেয়েটির মানুষ পরিচয় তার কাছে আকাশস্পর্শী হয়ে উঠল।
অ্যাটেনশন হয়ে বসল কর্নেল ওসামা।
গাড়ির গতি বাড়াতে যাচ্ছিল সে। কিন্তু দেখল সন্ত্রাসীদের গাড়িটা তার দিকেই আসছে। তার মানে সন্ত্রাসীরা সুবর্ণদ্বীপের দিকে যাবার জন্যে ওভারব্রীজের এক্সিট নিচ্ছে না।
ওরা জলপথ ব্যবহার করবে।
কর্নেল ওসামা ঠিক করল, সন্ত্রাসীদের ঠেকানোর জন্যে এই জায়গাটাই সবচেয়ে অনুকূল। কোনো আক্রমণ ঠেকাবার জন্যে সন্ত্রাসীরা মানসিকভাবে অনেকখানিই অপ্রস্তুত। আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওদের উপর চড়াও হতে হবে।
গাড়িটা ছুটে আসছে।
রাস্তার মাঝখান বরাবর গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফেলেছে, যেন ঘটনা দেখে বিমূঢ় হয়ে গাড়িটা থেমে গেছে। সন্ত্রাসীদের গাড়িও রাস্তার মাঝখান দিয়েই ছুটে আসছে।
কর্নেল ওসামা সিটের আড়াল থেকে লেটেস্ট ভার্সনের ক্ষুদ্র কারবাইন বের করে নিল।
এ কারবাইনের ব্যারেল থেকে সেকেন্ডে চল্লিশটি গুলির ঝাঁক বের হয়। গুলি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ধরনের, কিন্তু গুলি কোথাও প্রবেশের পর বিস্ফোরিত হয়। সুতরাং ক্ষতি হয় ভয়াবহ ধরনের। আবার এ কারবাইন থেকে সিঙ্গেল গুলি ছুঁড়বারও অপশন আছে।
সন্ত্রাসীদের গাড়ি একশ’ গজের মধ্যে এসে পড়েছে।
কর্নেল ওসামা দ্রুত একটা বোতাম টিপে সামনের উইন্ড স্ক্রিনের মধ্যের অংশটা সরিয়ে দিল এবং কারবাইন তুলে নিয়ে সামনের গাড়িটা তাক করল।
গাড়িটা তখন পঞ্চাশ গজের মধ্যে।
কর্নেল ওসামা সন্ত্রাসীদের গাড়ির টায়ার তাক করে কারবাইনের ট্রিগার চেপে ধরল।
শতখানেক গুলির একটা ঝাঁক বেরিয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল গাড়ির মাথা এবং টায়ার এলাকার উপর।
সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষুদ্র বিস্ফোরণ এবং টায়ার বিস্ফোরিত হবার শব্দ হলো।
উল্টে গেল গাড়ি। দু’বার ডিগবাজী খেয়ে গাড়িটি কাত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে দু’জন বেরিয়ে এসেছিল। তাদের চোখে আগুন। তারা সাথীদের সাহায্য করার বদলে পকেট থেকে রিভলভার বের করছিল।
কর্নেল ওসামা বিভলভার বের করার সুযোগ তাদের দিল না। দু’টি গুলি করল ধীরে সুস্থে। দু’জনেই বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে ছিটকে পড়ল মাটিতে।
কর্নেল ওসামা ছুটে গেল সন্ত্রাসীদের কাত হয়ে থাকা গাড়ির কাছে। উৎসুক কয়েকজন লোক একটু দূরে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিল।
কর্নেল ওসামা তাদের কয়েকজনকে ডেকে মাইক্রোটাকে সোজা করে দাঁড় করাল।
দ্রুত গাড়ির ভেতরে উঁকি দিল কর্নেল ওসামা। দেখল, মেয়েটা উঠে বসছে। আর ভেতরে দুজন সন্ত্রাসীর একজন ড্রাইভিং সিটে, মারাত্মকভাবে আহত। অন্যজন সম্ভবত গুলিবিদ্ধ, সংজ্ঞাহীন।
মেয়েটিকে দেখে বিস্মিত হলো কর্নেল ওসামা। কিন্তু বিস্ময়টাকে বাড়তে দিল না।
মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়েছে। কপালে রক্ত মেয়েটির।
মাইক্রোর দরজায় লক ছিল না, বন্ধ ছিল মাত্র। কর্নেল ওসামা, টেনে দরজা খুলে ফেলল।
মিস, আপনি ঠিক আছেন? হাঁটতে পারবেন?’ গাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে বলল কর্নেল ওসামা।
মেয়েটি কর্নেল ওসামার দিকে পরিপূর্ণভাবে তাকাল। তার চোখে মুখে একটা চমকে উঠা ভাব ফুটে উঠল, কিন্তু মুহূর্তেই তা আবার মিলিয়ে গেল। বলল, ‘পারব। কপাল ছাড়া বড় কোনো অসুবিধা কোথাও নেই.।’
‘তাহলে প্লিজ বেরিয়ে আসুন।’ বলল কর্নেল ওসামা।
মেয়েটি বেরিয়ে এল। দরজার সামনেই গুলিবিদ্ধ দুই সন্ত্রাসীর লাশ দেখল। বলল কর্নেল ওসামাকে, ‘আপনিই সন্ত্রাসীদের মাইক্রোতে গুলি করেছেন। এ সন্ত্রাসীদের কি আপনিই মেরেছেন?’
‘গাড়িতে গুলি না করে, এদের না মেরে কোনো উপায় ছিল না।’ বলল কর্নেল ওসামা।
‘গাড়ি না থামলে, এরা না মরলে আমি বাঁচতাম না। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। মেয়েটি বলল।
‘আপনি এখন কোথায় যাবেন? আপনার কপালের আহত জায়গায় ফাস্ট এইড এখনি দরকার।’ বলল কর্নেল ওসামা
‘আমি যাব সুবর্ণ নগরীতে। ফাস্ট এইড এখানে নয়, সুবর্ণ নগরীতে যাবার পথে কোনো ক্লিনিকে যাওয়া যাবে।’ মেয়েটি বলল।
‘কিভাবে যাবেন? ট্যাক্সি ডেকে দেব?’ বলল কর্নেল ওসামা।
‘আমার গাড়ি আছে। মেয়েটি বলল।
‘কোথায়?’ বলল কর্নেল ওসামা।
‘জান্নাতুল আরদ রেস্টুরেন্টের পার্কিং-এ। মেয়েটি বলল।
‘এটা আমার গাড়ি। গাড়িতে উঠুন, আপনাকে গাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছি। বলল কর্নেল ওসামা।
মেয়েটি মুখ একটু নিচু করল। বলল, ‘আমি একা এসেছি বটে, কিন্তু আমি এখন একা যেতে পারব না।’
‘জান্নাতুল আরদে আপনার আত্মীয়-স্বজন কিংবা পরিচিতজন অবশ্যই আছেন, যাদের সাহায্য আপনি নিতে পারেন!’ কর্নেল ওসামা বলল।
‘তেমন নেই।’
বলে মেয়েটি আবার বলে উঠল, ‘কারও উপর আমি ভরসা করতে পারছি না। আমার ভেতরটা এখনও কাঁপছে। আমি সুস্থ নই। আর আমার এই অবস্থার কথা আমার আপনজন যারা আছেন, তাদের আমি জানাতেও পারছি না, জানানো যায়ও না। আমি চাচ্ছি যা ঘটেছে, তার ইতি এখানেই ঘটুক। এ ঘটনা নিয়ে আরও বড় ঘটনা ঘটার ভয় আমি করছি। তা যেন না ঘটে সেটাই আমি চাচ্ছি। প্লিজ আমি এই মুহূর্তে এ দ্বীপ ছাড়তে চাই। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের প্রতিক্রিয়া ‘সাংঘাতিক হতে পারে। আপনাকেও এখান থেকে সরে যাওয়া দরকার।’ প্রায় এক নিঃশ্বাসে কথাগুলে বলে থাম্ল সে। তার কণ্ঠ উদ্বেগে ভরা।
কর্নেল ওসামা আবার কিছুটা বিস্মিত হলো। কিন্তু সে ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন না তুলে বলল, ‘চলুন আপনার গাড়িতে। আমি বলে দিচ্ছি, আমার গাড়িটা আমার লোকেরা নিয়ে যাবে। কর্নেল ওসামা বলল মেয়েটিকে লক্ষ্য করে।
দু’জনেই হাঁটতে লাগল।
ঘটনাস্থল ক্লাব-রেস্টুরেন্টটির আউটার গেটের কাছাকাছিই পার্ক করা ছিল মেয়েটির গাড়ি।
মেয়েটি কোনো দিকে বা কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা গিয়ে আনলক করলো গাড়িটাকে। ড্রাইভিং সিটের সাথের দরজা খুলে কর্নেল ওসামাকে সেদিকে আমন্ত্রণ করল। কর্নেল ওসামা গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল।
মেয়েটি দরজা বন্ধ করে গাড়ির সামনের দিকটা ঘুরে, ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে গিয়ে বসল।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
ছুটল সুবর্ণদ্বীপের সাথে কানেকটিং ব্রীজের দিকে।
ব্রীজ পার হয়ে সুবর্ণ নগরীগামী রোড ঘুরে ছুটছে গাড়ি।
সুবর্ণ নগরী সুবর্ণদ্বীপের রাজধানী।
এখন এসব নাম সবই পাল্টে গেছে। সুবর্ণ দ্বীপ হয়েছে ভিক্টর আইল্যান্ড, সুবর্ণনগরী হয়েছে গোল্ড সিটি। এমনকি প্রেসিডেন্ট বা রাজার বাড়ি ‘সুবর্ণ হাউজ’ হয়েছে ভিট্রি হাউজ।
সুবর্ণনগরীতে প্রবেশের পর মেয়েটা অনেকখানি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। এক সময় প্রসন্ন দৃষ্টিতে কর্নেল ওসামার দিকে চেয়ে বলল, ‘আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি।’
কর্নেল ওসামার মুখে এক টুকরো সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটির দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘চিনতে পেরেছেন আমাকে?’
‘হ্যাঁ পেরেছি। আমার মতো অনেকেই আপনাকে জানে না, কিন্তু চিনে। আপনি ভিক্টর আইল্যান্ড মানে সুবর্ণদ্বীপের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেটাল ফিজিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বিস্ময়কর রেজাল্ট করার জন্যে গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোর্টসেও বরাবর চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।’ বলল মেয়েটি।
মেয়েটি মুহূর্তের জন্যে একটু থেকেই আবার বলল, ‘কিন্তু আপনার হাতে ভয়ানক অস্ত্র কারবাইন কেন?’
‘কারবাইনটি হাতে না থাকলে তো আপনাকে বাঁচাতে পারতাম না।’ কর্নেল ওসামা বলল।
‘ঘটনাটা আমার ভুলবার নয়। এই ঘটনা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আতঙ্কের, সবচেয়ে আনন্দের। যখন আমি সন্ত্রাসীদের হাতে পড়েছিলাম, সেটা ছিল আমার কাছে মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ আতঙ্ক। আবার যখন বেঁচে গেলাম, তখন মনে হয়েছিল দুনিয়ার সব খুশি যেন দু’হাত ভরে পেয়ে গেলাম। কিন্তু আমি এ বিষয়ে প্রশ্ন করিনি। আমার বিস্ময় হলো প্রতিভাবান একজন বিজ্ঞান-ইঞ্জিনিয়ারের হাতে কারবাইনের মতো ভয়াবহ অস্ত্র কেন?’ বলল মেয়েটি।
‘আমি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলাম। অতএব হাতে কারবাইন থাকতেই পারে।’ কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ বলল।
‘যিনি হবেন যন্ত্র বিজ্ঞানের ইঞ্জিনিয়ার, তিনি সেনাবাহিনীতে! অবাক ব্যাপার। যাক, এখনও কি সেনাবাহিনীতে আছেন?’ বলল মেয়েটি।
‘এ প্রশ্ন কেন?’ কর্নেল ওসামা বলল।
‘কারণ আপনার হাতে কারবাইন, কিন্তু গায়ে সেনাবাহিনীর ইউনিফরম নেই।’ বলল মেয়েটি।
‘আপনি ঠিক বলেছেন। কর্নেল র্যাংকে উঠার পর আমি সেনাবাহিনী থেকে রিটায়ারমেন্ট নিয়েছি। আর কারবাইন আল্লাহই আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। ভালো কাজে ব্যবহারের জন্যেই, কিছুক্ষণ আগে তা প্রমাণ হলো। কর্নেল ওসামা বলল।
মেয়েটির ঠোঁটে হাসি। বলল, ‘যুক্তি সাজাবার অদ্ভুত ক্ষমতা তো আপনার! আমার কাছে মনে হচ্ছে আপনি কথারও ইঞ্জিনিয়ার।
কর্নেল ওসামাও একটু হাসল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ কোনো কথা বলল না। মেয়েটিও কর্নেল ওসামার দিক থেকে চোখ সামনে ফিরিয়ে নিয়েছিল।
সেও চুপচাপ। দৃষ্টি তার সামনে। তার দৃষ্টিতে নানা কথা, নানা চিন্তা, নানা প্রশ্নের খেলা।
এক সময় চোখ ফিরিয়ে কর্নেল ওসামার দিকে চেয়ে বলল, ‘আপনি আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন না?’
‘আপনার পরিচয় আমি জানি।’ বলল কর্নেল ওসামা।
‘জানেন? কে আমি বলুন তো?’ মেয়েটি বলল।
কর্নেল ওসামা একটু গম্ভীর হলো। তাকাল মেয়েটির দিকে বলল, ‘দস্যু সম্রাট দ্বিতীয় হেরাল্ডের গ্রান্ড গ্রান্ড ডটার ইভা হেরাল্ড আপনি। যার পিতা বর্তমান দস্যু সরকারের প্রধান, চতুর্থ হেরাল্ড।’
ইভা হেরাল্ড তাকাল কর্নেল ওসামার দিকে। তার চোখে-মুখে দারুণ বিব্রতভাব। বিব্রত ভাবটা আবার সঙ্গে সঙ্গেই অসহনীয় এক বেদনায় রূপান্তরিত হলো। ফুটে উঠল চোখে-মুখে গভীর বেদনার ছাপ। বলল, ‘আপনি এভাবে সাধারণের মতো কথা বলেন?’ কণ্ঠটি বেদনাসিক্ত, নরম, অশ্রু ভেজা।
কর্নেল ওসামা তাকাল ইভা হেরাল্ডের দিকে দ্রুত। তার বুকে গিয়ে বেঁধেছে একটা অশ্রুভেজা কণ্ঠের শক্ত তীর। বলল নরম কণ্ঠেই, সত্যের তো সাধারণ, অসাধারণ বলে কোনো আলাদা রূপ নেই মিস ইভা হেরাল্ড।’
‘তা নেই। তবে সত্যের সম্পূর্ণতা, অসম্পূর্ণতা নামের একটা বিভক্তি আছে। সম্পূর্ণ সত্য জানলে, আমি মনে করি, আমার পরিবারকে দস্যু বললেও কিছু সমবেদনা তার সাথে থাকতো। বলল ইভা হেরাল্ড। তার কণ্ঠ ভারি এবং আবেগপূর্ণ
ইভা হেরাল্ডের শান্ত ও আবেগমাখা কণ্ঠ কর্নেল ওসামার হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। বলল সে, ‘স্যরি, সম্পূর্ণ সত্য কিছু থাকলে সেটা আমি জানি না মিস ইভা হেরাল্ড। কর্নেল ওসামার কণ্ঠ নরম ও সহানুভূতিপূর্ণ।
‘আমি জানি মি. কর্নেল ওসামা, আমার প্রপিতামহ লুটতরাজ, গণহত্যা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যম সুবর্ণদ্বীপে তার দখল ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। তার উত্তরসূরীদের শাসনকালেও হত্যাসহ অত্যাচার, অবিচার, সন্ত্রাস অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু আমার প্রপিতামহ দ্বিতীয় হেরাল্ড জলদস্যু ছিলেন না এবং অত্যাচারী স্বভাবেরও ছিলেন না। আমার গ্রান্ড দাদু দ্বিতীয় হেরাল্ড, যার পুরো নাম হেরাল্ড ফেয়ার হেয়ার নরওয়ের বিখ্যাত রাজবংশের রাজা ছিলেন। ইউরোপে নেপোলিয়ান যুদ্ধের পর ১৮১৪ সালে আমার গ্রান্ড দাদুর নেতৃত্বে নরওয়ে স্বাধীন হয়। আমার গ্রান্ড দাদু দেশকে একটি সংবিধানও প্রদান করেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন। প্রজাদের তিনি ভালোবাসতেন। কোনো অবিচার- অত্যাচার নরওয়েতে ছিল না। আমাদের নরওয়ের প্রথম রাজার নাম অনুসারে তিনি দ্বিতীয় হেরাল্ড ফেয়ার হেয়ার নাম গ্রহণ করেন। দিন ভালোই চলছিল। দ্রুত সমৃদ্ধ হয়ে উঠছিল নরওয়ে। নরওয়ের এই সোনালি দিনে নরওয়ের মাথায় বাজ পড়ল। বাইরের চাপে এবং সুইডেনের ষড়যন্ত্রে নরওয়ে ও সুইডেনকে একীভূত করা হলো একটা ইউনিয়ন কাঠামোর আড়ালে। একক রাজার অধীনে এক প্রশাসনের নামে যে শাসন ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা হলো, তাতে কার্যত নরওয়ে তার স্বাধীনতা হারাল। আমার গ্রান্ড দাদু জনমতের চাওয়া অনুসারে এই অন্যায় মেনে নেননি। এই কারণে ষড়যন্ত্রকারীরা মিলিতভাবে আমার গ্রান্ড দাদুকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করল। গ্রান্ড দাদু রাজভাণ্ডার এবং কিছু লোকজন সাথে নিয়ে জাহাজে করে সমুদ্র পথে দূরে সরে গেলেন। কিন্তু সমুদ্রে সপ্তম দিনেই তার জাহাজ আক্রান্ত হলো জলদস্যুদের দ্বারা। রাজভাণ্ডারের অনেক কিছু তিনি হারালেন। এরপরেই তিনি আত্মরক্ষার জন্যে বিশাল জাহাজবহর গড়ে তুললেন। এই জাহাজবহর নিয়ে কি করবেন তিনি! কোথাও জাহাজ নোঙর করার বা মাটিতে নামার মতো নিরাপদ বা আপন কোনো জায়গা ছিল না তার। কতদিন তিনি পানিতে ঘুরবেন! অবশেষে কি হবে তাঁর! বাধ্য হয়ে তিনি জলদস্যু সিন্ডিকেটে যোগ দেন। কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল দ্বীপ বা নিরাপদ কোনো স্থল এলাকা পেলে সেখানে তিনি বসতি গড়বেন, সুযোগ পেলে তিনি রাজ্য স্থাপনের দিকে এগোবেন। তিনি তার স্বপ্নের দ্বীপ বা দেশের সন্ধানে ঘুরতে লাগলেন। অবশেষে মিলল। তাঁর স্বপ্নের সেই রাজ্যই হলো ‘সুবর্ণ দ্বীপ’। জানি এতে লক্ষ প্রাণের বিনাশ হয়েছে, একটা স্বাধীন ও শান্তিপ্রিয় জাতির শান্তি, স্বাধীনতা লুণ্ঠিত হয়েছে। গ্রান্ড দাদুর এটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ অবশ্যই। এই অপরাধ তিনি করেছেন আশ্রয়ের জন্যে একখণ্ড মাটি পাবার প্রয়োজনে। তিনি অপরাধী হওয়ার সাথে সাথে তিনি হয়তো কিঞ্চিত সহানুভূতিও পেতে পারেন।’ থামল ইভা হেরাল্ড। অবরুদ্ধ আবেগে কাঁপছিল তার কণ্ঠ 1 ‘ঠিক বলেছেন মিস ইভা হেরাল্ড। আমি দুঃখিত। আমাদের ইসলাম ধর্মও ক্ষুধার তাড়নায় যারা চুরি-ডাকাতি করে, তাদের আলাদাভাবে বিবেচনা করতে বলেছে।’ বলল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ।
‘ধন্যবাদ আপনাদের ধর্মকে। আপনাদের ধর্মের মতো এমন বাস্তববাদী ধর্ম আর দ্বিতীয়টি নেই।’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘আমাদের ধর্ম সম্পর্কে এমন চমৎকার মন্তব্য আপনি কি আপনাদের লোকদের কাছে করতে পারবেন?’ বলল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ।
‘অবশ্যই বলতে পারব এবং বলেও থাকি। এমনকি আমার বাবাকেও আমি ছাড় দেই না। রাজ্য রক্ষার নামে তারা যা করেন, করছেন তা অন্যায় এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ।’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘আপনি সত্যিই রাজকুমারী। রাজপুত্র, রাজকুমারীরা মাঝে মাঝে এমন সাহসী হবার ইতিহাস আছে।’ বলল কর্নেল ওসামা।
‘আমি রাজকুমারী নই, প্লিজ। আমি একটা ঐতিহ্যের উত্তরসূরী মাত্র। সে ঐতিহ্য আমার জন্যে বেদনাদায়ক। একটা সাধারণ মেয়ে হলেই ভালো হতো। তাহলে যন্ত্রণাদায়ক বর্তমান এবং দুঃসহ অতীত স্মৃতির ভার বয়ে বেড়াতে হতো না।’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘মানুষের দুঃখ আপনাকে কাঁদায়, একজন রাজকুমারীর জন্যে এটা বড় কথা অবশ্যই।’ বলল কর্নেল ওসামা। গম্ভীর কণ্ঠ তার।
‘কাঁদায় হয়ত না, কিন্তু জ্বলজ্যান্ত অপরাধের দুঃসহ ভার আমি বহন করতে পারি না।’ ইভা হেরাল্ড বলল। তারও গম্ভীর কণ্ঠ।
‘আপনার এই সমস্যার সমাধান কি, তা কখনো কি চিন্তা করেছেন?’ বলল কর্নেল ওসামা। কিছুটা হালকা কণ্ঠ তার।
আমি রাজা নই যে, সমাধান আমি বের করব, আবার আমি মন্ত্রী উপদেষ্টাদের মতো পদাধিকারীও নই যে, সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দিতে পারব।’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘রাজা মন্ত্রীরা ছাড়া কি কেউ সমাধান বের করতে পারে না?’ জিজ্ঞাসা কর্নেল ওসামার।
ইভা হেরাল্ড তাকাল কর্নেল ওসামার দিকে। কিন্তু চোখে তার শূন্য দৃষ্টি। বলল, ‘পারার কথা, কিন্তু তার জন্যে যোগ্যতা ও সুযোগ প্রয়োজন।
‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, মানে চাইলে আল্লাহ সুযোগ সৃষ্টি করে দেন।’
আবার কর্নেল ওসামার দিকে দৃষ্টি ফেরাল ইভা হেরাল্ড। বলল, ‘আপনার এই মূল্যবান শিক্ষা আমি মনে রাখব।’
ইভা হেরাল্ড দৃষ্টি ফিরিয়ে সামনে তাকাল।
কর্নেল ওসামার দৃষ্টিও সামনে নিবদ্ধ।
‘ম্যাডাম ইভা হেরাল্ড সামনেই সুবর্ণ হাউজ, মানে ভিত্তি হাউজগামী রাস্তার মুখ। রাস্তার মুখে যে গেট তার একটু আগেই আমি নেমে যেতে… ‘
কর্নেল ওসামাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই ইভা হেরাল্ড বলে উঠল, ‘আমি ম্যাডাম, মিস কিছু নই। প্লিজ আমাকে ইভা হেরাল্ড বলবেন। আমি শুধুই ইভা, সাধারণ এক ইভা। আমার পদ, প্রতিপত্তি, অর্থ-সম্পদ কিছুই নেই। এ সবকিছু আসে যে পথ ধরে, সেই যোগ্যতাও আমার নেই। আপনার শিক্ষা সামনে রেখে ভেবে দেখলাম, আপনি যাকে হেরাল্ড পরিবারের রাজকুমারী বলেছেন, সে একেবারেই নিঃস্ব।’ ভারি কণ্ঠ ইভা হেরাল্ডের।
চোখ বন্ধ করল সে। কয়েক মুহূর্তের জন্যে। বোধ হয় নিজেকে সে সামলে নিল। কিছু বলতে যাচ্ছিল ইভা হেরাল্ড।
কিন্তু তার আগেই কর্নেল ওসামা বলল, ‘রাজকুমারী ইভা, আপনি…’
কর্নেল ওসামার কথায় আবার বাধা দিল ইভা হেরাল্ড। বলল, ‘আবার রাজকুমারী বলছেন? বললাম না, আমি শুধুই ইভা।’
‘ম্যাডাম, মিস বলতে আপনি নিষেধ করেছেন, রাজকুমারী বলতে তো নিষেধ করেননি। সুতরাং রাজকুমারী বলা যায়।’ বলল কর্নেল ওসামা।
‘তাহলে আমিও আপনাকে ‘শাহজাদা’ বলতে পারি। কারণ দরবেশ প্রেসিডেন্ট-এর আপনি উত্তরসূরী এবং সরাসরি তার বংশের আপনি সন্তান।’
হাসল কর্নেল ওসামা। বলল, ‘দরবেশসহ দরবেশ বংশের কেউ বাদশাহ নয়, দরবেশ বংশের কাউকে শাহজাদাও বলা হয় না।’
‘জনাব, ‘সত্য’কে কেউ সত্য না বললেও ‘সত্য’ সত্যই থাকে, মিথ্যা হয়ে যায় না।’ বলল ইভা হেরাল্ড। তার মুখে হাসি।
কথাটা শেষ করেই কর্নেল ওসামাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলে উঠল ইভা হেরাল্ড। বলল, ‘আমাকে বাড়িতে পৌঁছে না দিয়ে এতদূরে নামবেন কেন?’
‘কানেকটিং রাস্তার মুখে যে গেট, এখান থেকেই আপনাদের বাড়ির শুরু। তাই এখানে আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। এটুকু পথ আপনি ড্রাইভ করে যাবেন। আমি চাই, আপনি যেমন একা গিয়েছিলেন, তেমনি একাই ফিরছেন, এটা সকলেই জানুক।’ বলল কর্নেল ওসামা।
ইভা হেরাল্ড একটু চিন্তা করল। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘ধন্যবাদ কর্নেল ওসামা। ঠিক বলেছেন আপনি। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।’
‘আরেকটা বিষয়, ছোট হলেও কপালে আপনার একটা ব্যান্ডেজ আছে। ওটা ঢাকার জন্যে আপনি মাথায় আপনার হ্যাটটা পরে নিন। বলল কর্নেল ওসামা।
এবার মুখ ভরা হাসি হাসল ইভা হেরাল্ড। বলল, ‘ধন্যবাদের পর ধন্যবাদের বিকল্প আর কোনো শব্দ আমার জানা নেই। ধন্যবাদ দু’বার ব্যবহার করছি। আর ব্যবহার ভালো দেখায় না। বলুন তো কি বলি?’
‘বলেছেন তো।’ কর্নেল ওসামা বলল।
‘না বলিনি। কি বলেছি?’ ইভা হেরাল্ড বলল।
কর্নেল ওসামা একটু গম্ভীর হলো। বলল, ‘কেন মুখ ভরা হাসি।’
সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল না ইভা হেরাল্ড। তার মুখ কিছুটা রক্তিম হয়ে উঠল। এক টুকরো লজ্জা এসে আচ্ছন্ন করেছে চোখ দুটিকেও।
কিছুটা আত্মস্থ স্বরে বলল, ‘সে তো হাসি।’
‘হাসির ভাষা কথার চেয়ে আরও স্বচ্ছ, আরও স্পষ্ট, আরও গভীর হয়।’ বলল কর্নেল ওসামা।
মুখ একটু নিচু করল ইভা হেরাল্ড।
হঠাৎ তার মুখ জুড়ে নেমে এলো অনুরাগের রক্তিম ছায়া। বলল, ‘আপনি সে ভাষা বুঝেন?’
‘সবাই তা বুঝে, আমি তাদের বাইরে নই বোধ হয়। কর্নেল ওসামা বলল শান্ত কণ্ঠে।
‘ধন্যবাদ।’ নরম অনুচ্চ কণ্ঠ ইভা হেরাল্ডের।
‘পুরনো ‘ধন্যবাদে’র ব্যবহার কিন্তু আবার হলো!’
হেসে উঠল ইভা হেরাল্ড। হাসি মুখেই বলল, ‘বললাম তো, ও শব্দের কোনো বিকল্প আমি জানি না।
ততক্ষণে কর্নেল ওসামা রাস্তা মুখের গেটের একটু দূরে গাড়ি দাঁড় করিয়েছে। গাড়ি দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গে কর্নেল ওসামা গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির পেছনটা ঘুরে গিয়ে ইভা হেরাল্ডের দরজা খুলে দিল।
ইভা হেরাল্ড নেমে এলো গাড়ি থেকে। তার মুখটা অনেকখানি ভারি হয়ে উঠোছে। মুহূর্ত কয়েক আগের সে হাসি মুখে আর নেই।
দাঁড়াল ইভা হেরাল্ড কর্নেল ওসামার সামনে।
‘আপনি ড্রাইভিং উঠুন। আমি যাচ্ছি। ভাববেন না, একটা গাড়ি ডেকে নিয়ে আমি চলে যাব।’
কথাটা শেষ করেই আবার বলে উঠল, ‘কপালের আঘাতটা তো মা-বাবা, ভাই-বোনদের কাছে ঢাকতে পারবেন না। আমি ভাবছি আপনি বলবেন, ছোট্ট একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। হঠাৎ ব্রেক কষতে গিয়ে কপালটা ড্রাইভিং হুইলের সাথে ঠুকে গেছে।
ইভা হেরাল্ড কোনো কথা বলল না।
বিস্ময়-বেদনার এক দৃষ্টি নিয়ে সে কর্নেল ওসামার দিকে তাকিয়ে। তার মনে নানা কথার আকুলি-বিকুলি, তাকে নিরাপদ করার, তাকে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ থেকে বাঁচাবার জন্য ওর এত চিন্তা! একজন মানুষের চিন্তা এত পরিচ্ছন্ন হয়, চোখের দৃষ্টি এত পবিত্র হয়। এত পথ আমরা এক সাথে এলাম, গাড়ির নিরিবিলি পরিবেশে আমরা পাশাপাশিই ছিলাম। আমার এই দুটি চোখ তাকে বার বার দেখেছে। কিন্তু ও একবারও আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলেনি। প্রায় সময় ওর দৃষ্টি সামনে ছিল। কিন্তু এতটা বয়স পর্যন্ত তার মতো পুরুষদের চোখে সে যা দেখে অভ্যস্ত, সেই লোভ, অপবিত্র পিপাসার বিন্দুমাত্র প্রকাশ তার চোখে-মুখে সে দেখেনি। কি অপরূপ স্বচ্ছ, পবিত্র হিরের টুকরো মানুষ! অনেক মুসলমানকে সে চেনে, জানে। তাদের তো এমন দেখেনি সে! আদর্শনিষ্ঠ মুসলমানরা কি তাহলে এমনই হয়!
এসব চিন্তায় নির্বাক, বাকহারা হয়ে পড়েছিল ইভা হেরাল্ড।
‘তাহলে চলি আমি।’ বলল কর্নেল ওসামা। চমকে উঠে সম্বিত যেন ফিরে পেল ইভা হেরাল্ড।
নিজেকে সামলে নিয়ে আবার চোখ তুলে তাকাল ইভা হেরাল্ড কর্নেল ওসামার দিকে। চোখ-মুখ জুড়ে বেদনার প্রকাশ। বলল, ‘মেহমান বাড়িতে এলে, তাদের যাবার সময় বলতে হয়, আবার আসবেন। আমি আপনাকে আসতে বলতে পারি?’
‘অবশ্যই পারেন। সুযোগ পেলে আসতে পারি।’ বলল কর্নেল ওসামা। মনে মনে ভাবল প্রেসিডেন্টের মেয়ের সাথে জানাশুনা সাগর সাইমুমকে সাহায্য করতে পারে।
‘আর সুযোগ না পেলে?’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘সুযোগ না পেলে তো আপনিও দেখা করতে পারবেন না। অতএব দুজনের অবস্থা সমান সমান।’ বলল কর্নেল ওসামা।
বেদনা বিজড়িত ইভা হেরাল্ডের ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘আপনার কাজ ও বুদ্ধির মতো কথাও অপরূপ। ধন্যবাদ।
‘ধন্যবাদ।’ বলে বিদায় নিয়ে চলতে শুরু করেই কর্নেল ওসামা ঘুরে দাঁড়াল। বলল, ‘একটা সত্য আপনাকে বলে যাই, আমার যে নাম, ভিক্টর ম্যাথিয়াস, আপনি জানতেন, সেটা আমার আসল নাম ছিল না। আমার নাম ওসামা ওবায়দুল্লাহ, যা আপনি কোনোভাবে জেনেছেন। যেহেতু এ নাম নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যেতো না, তাই আমাকে ভিক্টর ম্যাথিয়াস নাম নিতে হয়েছিল। সেনাবাহিনীতে ভর্তির সময়ও এ নাম ব্যবহার করেছি। এ সত্যটা আপনার জানা থাকা উচিত, তাই বললাম।’ বলে যাবার জন্যে আবার ঘুরে দাঁড়াল।
ইভা হেরাল্ডের চোখ-মুখ প্রসন্নতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ঘুরে দাঁড়ানো কর্নেল ওসামাকে লক্ষ্য করে একটু উচ্চ কণ্ঠে বলল, ‘শুনুন, ভিক্টর ম্যাথিয়াস এবং ওসামা ওবায়দুল্লাহর মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য করি না।’
ওসামা ওবায়দুল্লাহ মাথাটা একটু পেছন দিকে ঘুরিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ।
হাঁটতে লাগল হাত তুলে দাঁড় করানো একটা ট্যাক্সির দিকে।
ট্যাক্সিটি চলতে শুরু না করা পর্যন্ত ইভা হেরাল্ড দাঁড়িয়ে থাকল ট্যাক্সির দিকে তাকিয়ে। তার চোখ-মুখে বেদনার ছাপ আরও গভীর হয়েছে।
তার বুকের কোথায় যেন এক অপরিচিত কষ্ট।
কষ্টকর এক নাড়িছেঁড়া টান তাতে।
শান্তির দ্বীপে সংঘাত – ৪
৪
রাত ৮টা।
ডিনার সেরে ইভা হেরাল্ড তার স্টাডি রুমের সোফায় এসে বসল।
পড়ার টেবিলে একটা বই খোলা। পড়তে পড়তে উঠেই সে ডিনারে গিয়েছিল।
এখন ক’মিনিট সে রেস্ট নিতে চায়। তারপর পড়ার টেবিলে যাওয়ার তার ইচ্ছা।
ইভা হেরাল্ডের স্টাডির দরজায় এসে দাঁড়াল হ্যানস ফেয়ার হেয়ার হেরাল্ড। ইভা হেরাল্ডের বড় ভাই।
‘ভেতরে আসতে পারি ইভা?’ হ্যানস হেরাল্ড বলল।
উঠে দাঁড়াল ইভা হেরাল্ড। বলল, ‘এসো ভাইয়া।
হ্যানস হেরাল্ড ঘরে ঢুকল। বলল, ‘গুড ইভনিং ইভা।’
হ্যানস হেরাল্ড গিয়ে বসল পাশের সোফায়।
‘গুড ইভনিং ভাইয়া।’ বলে ইভা হেরাল্ড তার সোফায় বসে পড়ল।
‘ইভা কেমন আছিস তুই? কপালের ক্ষত দেখছি একদম ভালো হয়ে গেছে।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
‘ভালো আছি ভাইয়া। কপালটা কবে ঠিক হয়ে গেছে, তুমি আজ দেখছ?’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘প্রতিদিনই দেখছি। শুধু দেখছি নয়, এটা নিয়ে ভেবেছি। এখনও ভাবছি। আজ এটা নিয়েই তোকে কয়েকটা প্রশ্ন করব। বলত যে ঘটনার একটা ফল হিসেবে তোর কপাল আহত হয়েছিল, সেই ঘটনা তুই গোপন করলি কেন?’
ইভা হেরাল্ড তাকাল ভাইয়া হ্যানস হেরাল্ডের দিকে।
সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নের উত্তর দিল না। ভাবছে, ব্যাপারটা ভাইয়া জানতে পেরেছে। আর কে কে জানতে পেরেছে? বাবা-মারা কি জানতে পেরেছে? কতটা জানতে পেরেছে?
উত্তর দিতে দেরি হওয়ায় হ্যানস হেরাল্ডই আবার বলল, ‘কিরে ইভা কথা বলছিস না কেন?’
‘ভাইয়া, আমি ভেবেছিলাম ব্যাপারটা বাবা জানতে পারলে একটা মহা হৈচৈ হবে। এই হৈচৈ-এ আমি জড়িয়ে পড়ব। এটা আমি চাইনি। তাই আমি ব্যাপারটা গোপন করেছি।’ বলল ইভা হেরাল্ড।
‘ঠিক করিসনি। ওদের মতো অপরাধীরা ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নয়। ওরা স্কিনহেডেড হওয়া, বর্ণবাদী হওয়ার অপরাধ আড়াল করার ওদের একটা কৌশল। তাছাড়া যারা ঘটনার সাথে জড়িত, তারা ভিক্টর আইল্যান্ডের নয়। ওরা আমাদের সাগর এরিয়ার বাইরে নোঙর করা এক জাহাজের ক্রিমিনাল। ওরা বিভিন্ন দ্বীপে লুটতরাজ, নারী অপহরণ ইত্যাদি জঘন্য কাজের সাথে জড়িত। লুটের মাল যেমন, তেমনি যে নারীদের ওরা আপহরণ করে নিয়ে যায়, তাদের আর পাওয়া যায় না। ওরা জঘন্য নারী ব্যবসায়ীও। থামল হ্যানস হেরাল্ড।
শিউরে উঠল ইভা হেরাল্ড তার ভাই হ্যানস হেরাল্ডের কথা শুনে। বুকটা তার কাঁপতে লাগল। সেদিন যদি তাকে ওদের হাত থেকে উদ্ধার করা না হতো, তাহলে কি হতো তার পরিণতি!
কোনো কথা বলতে পারল না ইভা হেরাল্ড।
হ্যানস হেরাল্ডই আবার বলল, ‘তোর উচিত ছিল ওদের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশকে টেলিফোন করা, তাহলে ওদের অবশিষ্টদের পুলিশ ধরতে পারত।’
‘ভাইয়া, স্কিনহেডেডদের আমি আমাদের লোক মনে করেছিলাম। আর ওরা যদি এই দ্বীপের লোক নাও হয়ে থাকে, তাহলেও স্কিনহেডেডদেরই অংশ তারা। ওদের সাথে সরকারের বড় ধরনের কোনো গণ্ডগোল হোক, আমি তা চাইনি।’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘তোর কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু ওরা সরকারের চেয়ে বড় নয়। ওদের সরকার ব্যবহার করছে, সরকারকে ওরা ব্যবহার করতে পারে না। ঘটনাটা সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ না হওয়ায় ঐ বাহিরাগত স্কিনহেডেডরা আমাদের দ্বীপের স্কিনহেডেডদের ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছে। ওরা তোর ফটো এবং তোকে যে উদ্ধার করেছে তার ফটো এখানকার স্কিনহেডেড নেতার কাছে জমা দিয়ে বলেছে, এই দু’জন যোগসাজস করে একটা ঘটনা ঘটিয়ে তাদের চারজন লোককে হত্যা করেছে। এর প্রতিকার তারা চায়।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
‘কেন ভাইয়া, জান্নাতুল আরদ রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি’তে তো সব দৃশ্যই পাওয়া যাবে।’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘স্কিনহেডেডদের সাথীরা পরে এসে রেস্টুরেন্ট ভাঙচুর করেছে এবং সেদিনের সিসিটিভির ফিল্ম নিয়ে গেছে। যার ফলে তোকে যে ওরা অপহরণ করেছিল তার কোনো প্রমাণ নেই।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
‘কেন কোনো গোয়েন্দা রিপোর্ট আসেনি? ইভা হেরাল্ডের জিজ্ঞাসা।
‘গোয়েন্দা রিপোর্টে সেখানে একটা ঘটনা ঘটার কথা আছে। তোর এবং তাদের কোনো কথা সে রিপোর্টে নেই। কিন্তু চারজন স্কিনহেডেডের লোক নিহত হবার ঘটনা সচিত্র রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েেিছ। এর ফলে ক্রিমিনালরা বেঁচে গেল, কিন্তু ধরা পড়ে গেল তোকে যে বাঁচিয়েছে, সেই বেচারা। তার আরও বিপদ হলো তার পরিচয়ও প্রকাশ হয়ে পড়েছে। সে প্রাক্তন সেনা অফিসার এবং এ দ্বীপের সবচেয়ে বড় আসামি দরবেশ বংশের এক লোক। সবচেয়ে বড় খবর হলো, সে সাগর সাইমুমের নেতা। এর ফলে ক্রিমিনাল স্কিনহেডেডরা একদম ক্লিন হয়ে গেল। আর আসামি হয়ে গেল তোকে উদ্ধারকারী ওসামা ওবায়দুল্লাহ। শুরুতেই যদি শয়তানদের ফাঁদে ফেলা যেত, তারা এই ষড়যন্ত্র করতে পারতো না।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
আতঙ্ক-উদ্বেগে চুপসে গেছে ইভা হেরাল্ড। তার ভেতরটা যেন কাঁপছে। ওর এই বিপদটা তার কারণেই ঘটল।
সঙ্গে সঙ্গেই কিছু বলতে পারল না ইভা হেরাল্ড। তার ভাইয়াকে তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল মনে হচ্ছে। কিন্তু ভাইয়া কি করবে?
ইভা হেরাল্ড মুখ নিচু করে বসেছিল। মুখ তুলে সে তার ভাইয়ার দিকে তাকাল। বলল, ‘এখন কি হবে ভাইয়া?’
‘সেটাই ভাবনার বিষয়। সরকার ও স্কিনহেডেডরা এক হয়ে গেছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, সরকার শত্রুপক্ষের একজন নেতার সন্ধান পেয়েছে, তাকে তারা শেষ করতে চায়। আর স্কিনহেডেডদের টার্গেট হলো তাদের চারজন স্কিনহেডেড হত্যাকারীর তারা প্রতিশোধ নিতে চায়। একই লক্ষ্য দুই পক্ষের। এই অবস্থায় আমি করার দেখছি না। তাকে নির্দোষ প্রমাণের এখন কোনো উপায় নেই।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
‘ভাইয়া বলত, একজন উপকারী ও নির্দোষ মানুষের বিরুদ্ধে এই শত্রুতা অন্যায় কিনা? সে সাগর সাইমুমের নেতা, এটা বানানো অভিযোগ হতে পারে। আর সে দরবেশ বংশের ছেলে এটা কোনো দোষের ব্যাপার নয়, যতক্ষণ না সে অপরাধ করে। আর চারজন স্কিনহেডেড সেদিন নিহত হয়েছে তাদেরই অপরাধের কারণে। এতে কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহর কোনো দোষ নেই, বরং সে যে কাজ করেছে তার জন্যে তার রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাওয়া উচিত।’ থামল ইভা হেরাল্ড।
‘তোর প্রত্যেক কথা সত্য, কিন্তু এই সত্যটা শোনার এবং মানার কেউ নেই। বাবা মানে সরকারের প্রধান লক্ষ্যই হলো, এই ভিক্টর আইল্যান্ডে হেরাল্ড রাজবংশের রাজত্ব যে কোনো মূল্যে নিরাপদ রাখা। এ জন্যে বাবার সরকার দুটি ‘বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। একটি হলো, দরবেশ বংশ ও তাদের সমর্থকদের নিমূর্ল করা। আর দ্বিতীয়টা, বর্ণবাদী, সন্ত্রাসী হোয়াইট এবং স্কিনহেডেডদের বিশ্বব্যাপী সিন্ডিকেটকে দ্বীপের জন্যে সাহায্য লাভ ও দ্বীপের নিরাপত্তা বিধানের কাজে ব্যবহার করা। সুতরাং বাবার সরকার এর বাইরে আর কোনো কিছুই চিন্তা করতে রাজি নয়।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
চোখ-মুখ ছলছল করছে ইভা হেরাল্ডের। প্রায় কান্নার সুরে বলল, ‘ভাইয়া, লোকটি আমাকে সাহায্য করতে গিয়েই এই বিপদে পড়ল। সেদিন সে রেস্টুরেন্টে অনেক লোক ছিল, আশেপাশের রেস্টুরেন্টেও ছিল। আমি চিৎকার করেছি সাহায্যের জন্যে। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। কেউ মৌখিক প্রতিবাদও করেনি। কিন্তু ওসামা ওবায়দুল্লাহ একটা মেয়েকে অপহরণ করা হচ্ছে দেখেই ছুটে এসেছে। নিজের নিরাপত্তার চাইতে তিনি অনেক বড় করে দেখেছেন একটা মেয়ের নিরাপত্তাকে। এই মানুষটিই আজ কঠিন বিপদে। আমি এক অসহায় মেয়ে মানুষ কি করতে পারি তার জন্যে। কান্নায় ডুবে গেল শেষের কথাগুলো তার। তার দু’গণ্ড বেয়ে নামল অশ্রুর ধারা।
দু’হাতে মুখ ঢাকল ইভা হেরাল্ড।
হ্যানস হেরাল্ড উঠে দাঁড়িয়ে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, কাঁদিস না বোন। ওরা যেমন ভালো লোক, তেমনি আল্লাহতে গভীরভাবে বিশ্বাসী। আশা রাখ আল্লাহ ওকে সাহায্য করবেন। আমিও দেখব, কি করতে পারি তার জন্যে
একটু থামল। একটু ভাবল। বলল, ‘আচ্ছা বোন ওকে সতর্ক করে দেয়ার কোনো পথ আছে কিনা। টেলিফোন নাম্বার থাকলে সবচেয়ে ভালো হতো।’
‘ভাইয়া, আমি ওর নাম ছাড়া কিছুই জানি না।’ বলল ইভা হেরাল্ড।
এ সময় মোবাইল বেজে উঠল হ্যানস হেরাল্ডের।
হ্যানস হেরাল্ড মোবাইল তুলে নিল।
‘হ্যালো’ বলে ওপারের সাড়া পেয়েই বলল, ‘হ্যাঁ স্কার্ল, কি খবর?’ ওপারের কথা শুনল। মাঝে একবার প্রশ্ন করল, ‘এখন কোথায় সে? তার অবস্থা কি?’
ওপারের কথা আরও কিছু শুনল। বলল, ‘একটু খোঁজ নাও কোথায় রেখেছে তাকে
কল অফ করে তাকাল ইভা হেরাল্ডের দিকে। তার চোখে-মুখে বিমৰ্ষতা নেমে এসেছে।
আর ইভা হেরাল্ড উৎকণ্ঠিত। অস্থির তার চোখ-মুখ।
হ্যানস হেরাল্ড নরম কণ্ঠে বিষণ্ণ সুরে বলল, ‘বোন খুব খারাপ খবর। ওসামা ওবায়দুল্লাহকে ধরা হয়েছে। তার ছবি সব জায়গায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। গোয়েন্দাদের খবরের ভিত্তিতে আমাদের রাজধানীর বাইরে এক জায়গায় তাকে ঘিরে ফেলা হয়। মারাত্মক সংঘর্ষ হয়। সেনা, পুলিশ ও স্কিনহেডেডদের মোট পনের জন লোক তার হাতে মারা গেছে। আহত হয়েছে তার চেয়ে বেশি। শেষে তাকে আহত অবস্থায় বন্দী করা হয়েছে।’
ইভা হেরাল্ড দু’হাতে মুখ ঢেকে সোফায় এলিয়ে পড়েছিল।
বোনের এই অবস্থা হ্যানস হেরাল্ডকেও স্পর্শ করেছে। তারা দুই ভাই-বোন পিঠাপিঠি। ছোটবেলা থেকে তারা এক সাথে বেড়ে উঠেছে। তাদের একজন আরেকজনকে না হলে চলে না। গভীর স্নেহের সম্পর্ক ওদের মধ্যে। বোনের দুঃখ তার মনেও গভীর দুঃখের সৃষ্টি করেছে। কিন্তু হ্যানস নিজের মনকে শাসানী দিয়ে বলল, ‘বোনের মতো তাকেও নরম হলে চলবে না। তাতে বোন আরও ভেঙে পড়বে। শক্ত হতে হবে তাদের। বাস্তবতার মুখোমুখি তাদের হতে হবে।’
হ্যানস হেরাল্ড বোনের কাছে একটু সরে গিয়ে তার মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘ইভা ভেঙে পড়ে লাভ নেই। দুর্বলের কান্নার কোনো মূল্য হয় না সবলের কাছে। সবলের কাছে কিছু পেতে হলে সবলের সমকক্ষ হতে হবে। দেখ, তোকে বাঁচিয়েছে যে ছেলেটা, সে একা হয়েও বড় একটা সশস্ত্র, প্রশিক্ষিত দলের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। একা হয়েও সে তিরিশ-পঁয়ত্রিশজন প্রতিপক্ষকে আহত নিহত করেছে। আহত না হওয়া পর্যন্ত তাকে ধরা যায়নি, নিষ্ক্রিয় করা যায়নি। তার পরাজয় হয়নি ইভা। সে বন্দী হয়েছে বীরের মতো। তার জন্যে কাঁদলে তার অসম্মান হয়। বীরের জন্যে বীরের মতই চিন্তা করা দরকার।’
ইভা উঠে সোজা হয়ে বসল। চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে তার মুখ।
বলল ইভা হেরাল্ড, ‘তার জন্যে কি করব ভাইয়া। আমি তো বীর নই।
‘বীর নস তুই। কিন্তু বীরের মেয়ে, বীরের নাতনী, একজন মহান বীরের প্রপৌত্রী এবং তোর ভাই হিসাবে সোনাবাহিনীতে আমার রেকর্ডও খারাপ নয়।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
চোখ মুছল ইভা হেরাল্ড। বলল, ‘ওসামা কেমন আহত ভাইয়া?’
‘তার বাম বাহুতে গুলি লেগেছে।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
‘ওসামাকে একটা হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। কিন্তু কোন হাসপাতালে তা জানতে পারিনি। খোঁজ নেবার জন্যে বলেছি। খোঁজ পেলে তার চিকিৎসার বিষয়টা এবং কেমন আছে তা জানা যাবে।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
‘ভাইয়া, প্রথমেই দরকার তার প্রতি যেন সুব্যবহার হয় তা নিশ্চিত করা। তারপর আরও কিছু করা যায় কিনা দেখতে হবে।’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘ঠিক বলেছিস ইভা। বাবাকে আমি এ বিষয়ে বলব। বাবা সব ব্যাপার জানেন না। বিশেষ করে তোকে তার উদ্ধারের ঘটনা।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া। আমিও বাবাকে কি কিছু বলব?’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘না ইভা, তুই এর সাথে জড়াস না। বাবা অন্য কিছু মনে করে ফেলতে পারেন। তাহলে ব্যাপারটা আরও খারাপ হয়ে যাবে। ওসামার উপর বিপদ বাড়তে পারে।’ বলল হ্যানস দ্রুত কণ্ঠে 1
‘অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া। তুমি ঠিক বলেছ। আমার নীরব থাকাই ভালো। যদি কিছু পারি নীরবেই করব। তাহলে তুমি ভাইয়া বাবাকে তাড়াতাড়ি বলো।’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘অবশ্যই, কাল ব্রেকফাস্টের পর বাবার সাথে আমার কথা হবে। তিনি ডেকেছেন। সেখানেই সুযোগ বুঝে তোর উদ্ধারের কাহিনী বাবাকে বলব। তারপরেই বাবাকে বলব জীবন বাজী রেখে এ দেশের প্রেসিডেন্টের মেয়েকে উদ্ধারকারী ওসামার সুব্যবহার পাওয়া উচিত।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
হ্যানস হেরাল্ডের কথা শুনে ইভা হেরাল্ডের মুখ অনেকখানি সহজ হয়ে উঠল। বলল, ‘ভাইয়া, বাবার কাছ থেকে কি ফল আশা করছ?’
‘তুই বাবার হৃদয়ের একটা টুকরো, তুই জানিস না? তুই বাড়ির সবার আদরের, কিন্তু তুই বাবার মাথার মণি। আমি…।’
হ্যানসের কথার মাঝখানে ইভা হেরাল্ড বলে উঠল, ‘যেমন তুমি মায়ের নয়নের মণি।
‘হিংসা করবি না। মা কিন্তু কিছু দেবার সময়, তোকেই বেশি দেয়, ভালোটা দেয়।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
‘সে আমি জেদ করি বলে। তুমি তো জেদ করো না।’ ইভা হেরাল্ড বলল। তার মুখে হাসি।
‘জেদ করব কেন? আমার ভাগ থেকেও তোকে আমি দিই না?’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
‘দাও ভাইয়া। তুমি এত আদর কর, অপরাধ করলেও বলবে না কিছু, তাইতো তোমাকে আমি আমার সব কথা বলতে পারি।’ ইভা হেরাল্ড বলল। তার কণ্ঠ আবেগে আপ্লুত।
হ্যানস হেরাল্ড উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘এখন চলি। জরুরি কিছু কাজ পড়ে আছে। ওসামার খোঁজ-খবর কতটা হলো, সেটা দেখতে হবে।’
একটু থেমে বোনের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘কোনো চিন্তা করবি না, কাঁদা-কাটা করবি না। মনে রাখবি, তুই নরওয়ের হেরাল্ড রাজবংশের মেয়ে। আমাদের গ্র্যান্ড দাদু দেশ ছেড়েছেন, কিন্তু তিনি যাকে ন্যায়, সত্য মনে করেছেন, তার উপর অটল থেকেছেন। সব হারিয়েও তিনি বাঁচার জন্যে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। তাই মনে রাখিস, দুঃখ আমাদের জয় করবে না, দুঃখকেই আমরা জয় করব।’ হ্যানস যাবার জন্যে পা বাড়াল।
ইভা হেরাল্ডও উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘তাই যেন আমরা পারি ভাইয়া। ধন্যবাদ।’ হ্যানস হেরাল্ড চলে গেল।
‘তোমার নাম কি?’
প্রশ্নটি যার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো সে বিরাট বপু স্কিনহেডেড একজন শ্বেতাংগ।
‘তোমরা জানতে চেয়েছ আমার নাম। আমি ওসামা ওবায়দুল্লাহ।’ বলল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ। তার চুল উষ্কখুষ্ক। চেহারা বিপর্যস্ত, গায়ের জামা-কাপড় ধুলিধূসরিত। বিরাট একটা তক্তপোষের উপর সে শুয়ে। তার বাম বাহুতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। ডান হাত একটা লোহার ক্লিপ দিয়ে তক্তপোষের সাথে আটকানো। পা দুটি শিকল দিয়ে বাঁধা।
‘বহু কষ্ট করে জেনেছি তোমার আসল নাম। তবু জিজ্ঞাসা এই কারণে করলাম যে, তোমার স্বীকারোক্তির রেকর্ডটা আমাদের কাজে লাগবে। তুমি তো বাঁচবে না। তখন এই রেকর্ডটা তোমার লোকদের শোনাতে হবে।’ বলল বিরাট বপু স্কিনহেডেড শ্বেতাংগ লোকটি।
স্কিনহেডেড শ্বেতাংগ লোকটির সাথে বসে আছে আরও তিনজন। দু’জন পুলিশ। তাদের পোশাক ও ইনসিগনিয়া দেখে মনে হয় বড় পুলিশ অফিসার হবে। তৃতীয়জন স্কিনহেডেড শ্বেতাংগ লোকটি।
একটু থেমে বিরাট বপু স্কিনহেডেড সেই শ্বেতাংগ লোকটি আবার প্রশ্ন করল, ‘তুমি আমাদের সাথী চারজন লোককে হত্যা করেছ। এই অপরাধের শাস্তি কি জান?’
‘আমি সবজান্তা নই। একমাত্র মহান আল্লাহই সব জানেন, সর্বজ্ঞ তিনি।’
বলল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ।
প্রশ্নকর্তা স্কিনহেডেড লোকটি ক্রোধে চিৎকার করে বলল, ‘চুপ করো হারামজাদা।’
আর সাথে সাথে পাঁজরে একটা লাথি চালিয়ে বলল, ‘তোমার আল্লাহ সর্বজ্ঞ হলে আমরা তোমাকে খাঁচায় পুরতে যাচ্ছি, সেটা তোমার আল্লাহ জানতে পারেনি কেন?’
লাথির আঘাত সামলে নিয়ে বলল, ‘অবশ্যই জানতে পেরেছেন। আপনাদের পরিকল্পনা আগেই তিনি জানেন। আপনারা কি করবেন ভাও তিনি জানেন।
‘তাহলে তোমাকে রক্ষা করেনি কেন?’ স্কিনহেডেড প্রশ্নকর্তা বলল।
‘আপনাদের একটা পরিকল্পনা আছে, আমার আল্লাহরও একটা পরিকল্পনা আছে।’ বলল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ।
হো হো করে হাসল স্কিনহেডেড লোকটি। বলল, ‘থাকো এ বিশ্বাস নিয়ে। তোমাকে জানাচ্ছি, চারজনকে হত্যার জন্য তোমাকে মৃত্যু দণ্ডাদেশ আমরা দিয়ে রেখেছি। তবে যেহেতু তোমার আরও অপরাধ আছে, তোমার পেট থেকে আরো অনেক কথা জানার আছে, তাই দণ্ডাদেশ কার্যকরী করতে একটু বিলম্ব হবে।’
একটু থামলো স্কিনহেডেড লোকটি। একটু পরামর্শ করল পাশের পুলিশ অফিসারের সাথে। দৃষ্টি ঘোরালো ওসামা ওবায়দুল্লাহর দিকে। বলল, ‘তোমাদের ‘সাগর সাইমুম’ কতদিন ধরে কাজ করছে?’
‘সাগর সাইমুম আমি প্রতিষ্ঠা করিনি। অতএব এ প্রশ্নের জবার আমি দিতে পারব না।’ বলল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ।
‘সাগর সাইমুম কোন লক্ষ্যে কাজ করছে, সেটা তো জানো অবশ্যই?’ সেই স্কিনহেডেড লোকটি বলল।
‘এটা তো তোমরাও জানো এবং এ দেশবাসীর সকলেই জানে। এ দেশের মুসলিম এবং আদিবাসীদের উপর যে জুলুম, অত্যাচার, হত্যা, গুমের মতো অবিচার চলছে এসবের প্রতিবাদ করা, প্রতিকার চাওয়া।’ বলল কর্নেল ওসামা।
‘কে জুলুম অত্যাচার করছে?’ বলল প্রশ্নকর্তা স্কিনহেডেড লোকটি।
‘এই দেশের দখলদার সরকার। কর্নেল ওসামা বলল।
কথাটি কর্নেল ওসামার মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কিনহেডেড লোকটি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার বুট পরা পায়ের একটা লাথি ছুটে গেল কর্নেল ওসামার মুখ লক্ষ্যে।
‘এত বড় স্পর্ধা একজন বন্দীর!’ বলল স্কিনহেডেড লোকটি অনেকটা স্বগোতোক্তির মত।
লাথির আঘাতে ঠোঁট ও নাক থেঁতলে গিয়ে গল গল করে রক্ত বেরিয়ে এলো। চোখ বুজে সহ্য করল এই নির্যাতন। মুখ থেকে কোনো শব্দ বেরোল না তার।
কর্নেল ওসামা, আপনার হিতাহিত জ্ঞান কি কিছুই নেই? মৃত্যু আপনার মাথার উপর। আপনার কি ভয় নেই?’ একজন পুলিশ অফিসার বলল।
‘মৃত্যু যখন আসবার তখন আসবেই। ভয় করে লাভ কি?’ বলল কর্নেল ওসামা।
‘তাহলে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত তুমি?’ স্কিনহেডেড লোকটি বলল।
‘না আমি মুক্তির জন্য প্রস্তুত।’ বলল কর্নেল ওসামা।
হো হো করে সেই হাসি হেসে উঠল স্কিনহেডেড লোকটিসহ সকলেই।
‘আপনার শরীরের যে হাল হয়েছে, তাতে সম্ভবত আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। একজন ভালো লোক কি এমন আকাশকুসুম কল্পনা করতে পারে?’ বলল একজন পুলিশ অফিসার।
‘ঠিক আছে মুক্তির জন্য দিন গুনতে থাক। এখন আমার প্রশ্নের জবাব দাও। সাগর সাইমুমের ঘাঁটিগুলো কোথায় বল?’ স্কিনহেডেড লোকটিই প্রশ্ন করল।
‘সুবর্ণ দ্বীপের প্রতিটি বাড়িই সাগর সাইমুমের ঘাঁটি। সুতরাং সাগর সাইমুমের ঘাঁটি কোথায়, কতটি, এসব প্রশ্ন অবান্তর।’
একজন পুলিশ অফিসারকে লক্ষ্য করে স্কিনহেডেড লোকটি বলল, ‘এ সাংঘাতিক ঘোড়েল মি. সিমসন। এভাবে তাকে কথা বলানো যাবে না। বৈদ্যুতিক আসনের ব্যবস্থা করতে হবে। সাগর সাইমুমের ঘাঁটিগুলো এবং তাদের কিছু পরিচয় আমাদের উদ্ধার করতেই হবে। এই শয়তানকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সাগর সাইমুম ভবিষ্যতে আমাদের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে। আমাদের এই ভিক্টর দ্বীপ শুধু একটা দ্বীপ রাষ্ট্রই নয়, এটা আমাদের আশা ভরসার স্থল ‘নিউ নাজী’দের শক্তিকেন্দ্র বা রাজধানীর মতো হয়ে উঠেছে। একে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে।’
পুলিশ অফিসার সিমসন স্কিনহেডেড লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঠিক বলেছেন, এইভাবে তাকে কথা বলানো যাবে না। কিন্তু কি করা যায় বলুন। তাকে জেলখানা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। যা করার আমাদের দ্রুত করতে হবে।’
‘দেখুন, ওসব আইন আমরা মানি না। আমাদের চারজন লোককে সে খুন করেছে। এতটা সময় তার বেঁচে থাকার কথা নয়। আপনারা তার রাষ্ট্রদ্রোহের বিচার করতে চান, তার কাছ থেকে কথা আদায় করতে চান, সেজন্যই আমরা কিছু করতে পারিনি।’ বলল স্কিনহেডেড লোকটি।
পুলিশ অফিসার সিমসন একটু হাসল। বলল, ‘আমরাও এসবের ধার খুব একটা ধারি না। কিন্তু কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ হঠাৎ করেই আমাদের হাতে পড়েছে। তার কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু আমাদের জানা নেই। তার উপর সাগর সাইমুম আমাদের জন্য একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। আর এই কর্নেল ওসামা যদি সাগর সাইমুমের একজন নেতা হয়ে থাকে তাহলে এটা হবে আমাদের জন্য একটা বড় বিষয়। তাকে হত্যার চেয়ে এখন তার কাছ থেকে আমরা যা জানতে চাই তা জানা এবং তাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে সাগর সাইমুমের কাছে পৌঁছতে পারা আমাদের জন্য এখন বড় বিষয়।
‘আমরা আপনাদের সাথে একমত। আমরা তো চাচ্ছি কথা আদায় করতে। এখন আমাদের কাছে তাকে কথা বলানোর জন্য সবচেয়ে সহজ পন্থা সেটা হল তাকে ইলেকট্রিক আসনে বসানো। এতে তার বহিরাঙ্গের কোনো ক্ষতি হবে না, কিন্তু এতে আমরা বড় সাফল্য পাবো। তার প্রতিরোধ ক্ষমতা ধসে পড়লে তার মুখ থেকে কথা গড়গড় করে বেরিয়ে আসবে দেখবেন। বলল স্কিনহেডেড লোকটি।
‘আমিও তাই মনে করি।’ বলল পুলিশ অফিসার সিমসন।
‘তাহলে আর দেরি কেন, ব্যবস্থা করতে বলি?’ স্কিনহেডেড লোকটি বলল।
‘ঠিক আছে, ব্যবস্থা করুন।
কথাটা বলেই পুলিশ অফিসার সিমসন তাকাল কর্নেল ওসামার দিকে। বলল, ‘শুনলেন তো, আপনাকে নাচানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আমরা পুলিশরা অন্তত আপনার সাথে খুবই ভালো ব্যবহার করেছি। এক সময় আপনি আমাদের দেশপ্রেমিক এলিট বাহিনীর একজন খুব ব্রাইট অফিসার ছিলেন। এ বিবেচনা থেকেই আমরা আন্তরিকভাবে আপনার সহযোগিতা চেয়েছি। আপনি সহযোগিতা করেননি। কিন্তু এটা করে আপনি শুভবুদ্ধির পরিচয় দেননি। এখনো সময় আছে, আপনি আমাদের সহযোগিতা করুন। কথা না বলে কি আপনি নিজেকে এবং সাগর সাইমুমকে রক্ষা করতে পারবেন? পারবেন না। আপনাদের সবাইকেই মরতে হবে, নয়তো দ্বীপ ছেড়ে পালাতে হবে।’
‘আমরা মরতেও চাই না, দ্বীপ ছেড়ে পালাবোও না। ইনশাল্লাহ সত্যের জয় হবেই।’ বলল কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ।
‘বড় বড় কথা বলবেন না। অনেকেই এমন বড় বড় কথা বলে, কিন্তু নাচন শুরু হলে শরীরটা যখন ধসে পড়ে, ভেতরের মনটা তখন সড়সড় করে কথা বলে ওঠে। বাহাদুরী না করে বাস্তববাদী হোন। পুলিশ অফিসার সিমসন বলল।
‘বাহাদুরী আমি করছি না। আমি সত্য ও ন্যায়ের উপর আছি। অত্যাচার করার শক্তি আপনাদের আছে। অত্যাচার সহ্য করার শক্তি আমি আল্লার কাছে চাইব। তিনিই আমার ভরসা।’ বলল কর্নেল ওসামা।
বিরক্তিতে মুখ বাঁকিয়ে স্কিনহেডেড লোকটির দিকে তাকিয়ে পুলিশ অফিসারটি বলল, ‘মি. রুডিগার কাজ শুরু করুন।’
কর্নেল ওসামার শুয়ে থাকা তক্তপোষটিকেই বৈদ্যুতিক আসনে পরিণত করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক কানেকশন, দেহের সাথে বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ, কর্নেল ওসামার দেহটিকে তক্তাপোষের সাথে বেঁধে ফেলা- সব কাজই সম্পন্ন হয়েছে। লাল ও সাদা বাটনওয়ালা ক্ষুদ্র সুইচবোর্ড হাতে নিয়ে স্কিনহেডেড রুডিগার প্রস্তুত। তার চোখে-মুখে বন্য তৃপ্তির কুৎসিত প্রকাশ।
রুডিগারের তর্জনী সেট হলো সুইচ বোর্ডের লাল বোতামে। তর্জনী চেপে বসতে যাচ্ছিল লাল বোতামে।
এমন সময় ওয়ারলেস বেজে উঠল পুলিশ অফিসার সিমসনের। শব্দের দিকে চোখ বুলাল স্কিনহেডেড রুডিগার।
তার তর্জনীটা আপনাতেই সরে এলো লাল বোতামের উপর থেকে।
পুলিশ অফিসার ওয়ারলেস তুলে নিয়ে ‘হ্যালো’ বলেই নড়েচড়ে শটান হয়ে বসল এবং ওপারের কথা শুনতে থাকল এবং অবিরাম ‘স্যার’, ‘ইয়েস স্যার’ করতে লাগল। মাঝে সে একবার তাকাল রুডিগারের দিকে।
একনাগাড়ে মিনিট খানেকের মতো কথা শোনার পর পুলিশ সিমসন বলে উঠল খুব বিনয়ের সাথে, আপনি ঠিক বলেছেন স্যার। যা করতে হবে তা সব দিক ঠিক রেখেই করতে হবে। আপনার নির্দেশে সব ব্যবস্থা আমি করছি স্যার।
‘ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ স্যার।’ বলে ওয়ারলেস থেকে মুখ সরিয়ে তা পাশে রেখে দিয়েই পুলিশ অফিসার সিমসন তাকাল রুডিগারের দিকে। বলল, ‘হলো না মি. রুডিগার, ওকে কথা বলানো এখন আর গেল না। উপরের হুকুম এসেছে।
রুডিগার উৎসুক্য নিয়ে তাকিয়ে ছিল পুলিশ অফিসার সিমসনের দিকে। কোনো ভালো খবর শোনার জন্য তার মন উন্মুখ ছিল। কিন্তু পুলিশ অফিসার সিমসনের কথা শুনে মুখে একরাশ বিস্বাদ নিয়ে বলল, ‘কে ওয়ারলেস করেছিল? কি হুকুম উপরের?
‘পুলিশের অপারেশন চীফ মি. ক্যাসপারের কাছ থেকে হুকুম এসেছে। এখনই মি. ওসামাকে রাজধানীতে পুলিশের কেন্দ্রীয় জুডিশিয়াল ব্রাঞ্চের কাস্টডিতে পাঠাতে হবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার লোকজন বর্তমানে আমাদের ভিক্টর আইল্যান্ড সফর করছে মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্যে। সরকার মনে করছে বিশেষ কোনো অভিযোগের ভিত্তিতেই তারা হঠাৎ করে ভিক্টর আইল্যান্ডে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে তারা জেলখানাগুলোসহ পুলিশ ও সেনা কাস্টডি দেখতে চাইতে পারে।’ বলল পুলিশ অফিসার সিমসন।
‘তার মানে এখন আমাদেরকে হ্যান্ডস আপ করে বসে থাকতে হবে। আচ্ছা মি. সিমসন কবে, কখন আমরা মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে এক পয়সার মূল্য দিয়েছি।’ বলল ক্রোধের সাথে রুডিগার।
‘তা দিলে আমাদের এই দ্বীপ রাষ্ট্র হতোও না, টিকেও থাকতে পারতো না, এটা আমরা জানি মি. রুডিগার। কিন্তু পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে কৌশল হিসেবে অনেক কিছুই করতে হয়।’ পুলিশ অফিসার মি. সিমসন বলল।
‘সেটা আপনাদের সরকারের ব্যাপার। কিন্তু আমরা এসব মানি না। আমরা এটা জানি, অব্যাহত আক্রমণই টিকে থাকা এবং বিজয়ের একমাত্র হাতিয়ার। আমি এখন বুঝতে পারছি ওসামা ওবায়দুল্লাহকে আপনাদের সরকারের হাতে তুলে দেয়াই আমাদের ভুল হয়েছে।’ বলল রুডিগার। কঠোর তার কণ্ঠ।
‘আমি আপনার সাথে একমত রুডিগার। কিন্তু কিছু করার নেই।’ বলে পুলিশ অফিসার সিমসন তাকালো তার সহকারী পুলিশ অফিসারের দিকে। এরপর বলল, ‘মি. ওভাল আপনি যান, আমাদের টিমকে প্রস্তুত করুন। আমরা আল-কবির উপত্যকা থেকে হাইওয়েটা এভোয়েড করে হেরাল্ড রোড ধরে রাজধানীতে পৌঁছব। আগে পিছে দুটি পুলিশ লরি থাকবে। মাঝখানের জিপে আমি ও আপনি মি. ওসামাকে নিয়ে উঠব।
একটু থামলো পুলিশ অফিসার সিমসন। সঙ্গে সঙ্গে আবার বলে উঠলো, ‘তবে মি. গুস্তাভ আজ নয় কাল সকালে যাত্রা করাই সঠিক হবে। আপনি হেড কোয়ার্টারে এ সংবাদ জানিয়ে দিন, সকাল দশটার মধ্যে আমরা রাজধানীতে পৌঁছে যাব।’
পুলিশ অফিসার উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘সেটাই ভালো হবে স্যার। তবে স্যার, হেরাল্ড রোড অনেকটাই দুর্গম। চড়াই-উৎরাইগুলোও খুব শার্প। সাধারণ গাড়ি-ঘোড়া চলে না ওই রোডে। শুধু সেনাবাহিনীর গাড়ি চলে।
‘তা হোক মি. গুস্তাভ। হাইওয়ের চেয়ে অর্ধেক সময়ে রাজধানীতে পৌঁছে যাব। সে সুযোগই সেনাবাহিনী নেয়।
‘ইয়েস স্যার’, বলে পুলিশ অফিসার যাত্রায় প্রস্তুতির জন্য চলে গেল।
কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ তখনো তক্তাপোষে শুয়ে। তার হাত-পা বাঁধা।
কর্নেল ওসামা চোখ বুজে শুয়ে ছিল।
কিন্তু সব কথাই তার কানে প্রবেশ করছিল।
মানবাধিকার সংস্থার ভিজিটের কারণে ওরা একজন বন্দীর শাস্তি বন্ধ রাখল শুনে মনে মনে হাসল কর্নেল ওসামা। রাজধানী সুবর্ণ নগরীতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দক্ষিণ-পূর্ব প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈঠক চলাকালে তার মতো দশজন স্বাধীনতাকামীকে ওরা ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করেছিল। সেটা মাত্র ছয় মাস আগের ঘটনা। ওরাই মাত্র আজ ছয় মাস পরে মানবাধিকার সংস্থার ভিজিটকে ভয় পাচ্ছে। এই ভিজিটের বাস্তব কোনো মূল্য নেই। তাহলে এই ভিজিটকে ওরা অজুহাত বানাচ্ছে কেন?
কর্নেল ওসামার মনে অনাহুতভাবেই ইভা হেরাল্ডের মুখ ভেসে উঠল। ও নিশ্চয়ই এ খবর জেনেছে। কি করছে সে?
কর্নেল ওসামা হঠাৎ করেই ওদের হাতে পড়েছে। সেদিন কর্নেল সুবর্ণ দ্বীপের উত্তর উপকূলের একটা প্রাইভেট কমার্শিয়াল পোর্টে গিয়েছিল একটা নির্দিষ্ট বোট নিয়ে সাগরে বের হতে। বোটটি কমার্শিয়াল পোর্টের বোট বহরে রেজিস্ট্রিকৃত। এই বোটটি চালায় সাগর সাইমুমের একজন কর্মী।
এ ধরনের রেজিস্টার্ড বোট নিয়ে সাগরে বেরুবার সুবিধা হলো পুলিশের ঝামেলায় পড়তে হয় না। বোটের নাম ও বোটের নাম্বার দেখলেই তারা বুঝে যায় এটা অবৈধ বোট নয়।
সাইমুম কর্মীর বোটের নাম্বার কর্নেল ওসামার কাছে ছিল। সে নাম্বার দেখেই কর্নেল ওসামা বোটের কাছে যায়। বোটম্যান তার দিকে এগিয়ে আসে। তার চোখের দিকে তাকিয়েই কর্নেল ওসামা নিশ্চিত হয় এ বোটম্যান সাগর সাইমুমের কর্মী নয়। বোট ঠিক আছে, কিন্তু বোটম্যান বদল হয়েছে বা বদলানো হয়েছে। কর্নেল ওসামার চিন্তা আর সামনে এগোতে পারেনি। পোর্টে এবং পোর্টের বিভিন্ন বোটে যারা ছিল, তারা একযোগে এসে তাকে ঘিরে ধরে। তাদের সবার হাতে রিভলভার আর তা তার দিকে তাক করা।
কর্নেল ওসামা বুঝল এরা সবাই ছদ্মবেশী পুলিশ।
আরও বুঝল সাগর সাইমুমের কর্মী বোট চালকের পরিচয় নিশ্চয়ই কোনভাবে পুলিশের কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিল। তার মোবাইল ট্যাপ করে বা অন্য কোনোভাবে পুলিশ জানতে পেরেছিল যে, সাগর সাইমুমের একজন কর্মীর বোট নিয়ে আমি সাগরে বেরুবার জন্য পোর্টে আসছি। তারা পাকাপোক্ত আয়োজন করে রেখেছিল আমাকে ধরার জন্য।
.
সকাল তখন ৯টা।
আল-কবির উপত্যকা থেকে হেরাল্ড রোড ধরে তিনটি গাড়ির একটি বহর চলছে।
আল-কবির সুবর্ণ দ্বীপের রাজধানী শহর সুবর্ণ নগরী বা ভিক্টর সিটি থেকে পঞ্চাশ মাইল পুবে দ্বীপের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের একটা উপত্যকা। এ উপত্যকার মধ্যে দিয়ে হেরাল্ড রোডটি পাহাড়ের আরও উঁচুতে সামরিক বাহিনীর ট্রেনিং কলেজ পর্যন্ত উঠে গেছে। হেরাল্ড রোডটি আল-কবির উপত্যকা থেকে পাহাড়-উপত্যকা ডিঙিয়ে সোজা চলে গেছে রাজধানী সুবর্ণ নগরীতে। দখলদারদের আমলে রাজধানী সুবর্ণ নগরীর নতুন নাম হয়েছে ভিক্টর সিটি, যেমন সুবর্ণ দ্বীপের নাম হয়েছে ভিক্টর আইল্যান্ড।
আল-কবির উপত্যকা থেকে বের হওয়া পুলিশের তিন গাড়ির বহরটি তখন আল কাররার নদীর শাখা ‘তালিয়া’র ব্রীজের উপর।
তালিয়া শাখা নদীটি এখানে তালিয়া উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত আরও উত্তরে চলে গেছে। তালিয়া উপত্যকাটি খুব প্রশস্ত নয়। তালিয়া শাখা নদীটি সংকীর্ণ পরিসরের বলে খুবই খরস্রোতা। তালিয়া উপত্যকার কিছু কিছু অঞ্চলে ফসলের চাষ হয়, কিন্তু তালিয়ার ব্রীজ অঞ্চলের গোটাটাই বন-বাদাড়ে ভরা।
পুলিশের তিনটি গাড়ির বহর যখন তালিয়া ব্রীজে উঠল, তখন তালিয়া ব্রীজের চারদিকে আরেকটা ভয়াবহ দৃশ্য।
গোটা শরীর কালো কাপড়ে আবৃত মুখোশধারী পঞ্চাশজনের একটা দল ব্রীজের দু’দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে পুলিশের তিনটি গাড়িবহরকে।
ব্রীজের সামনে-পেছনে সড়কের পাশের ঝোঁপঝাড়ে ওরা লুকিয়ে ছিল। পুলিশের তিন গাড়ির বহর যখন ব্রীজে উঠল, তখন ওরা ঝোঁপঝাড় থেকে বেরিয়ে ব্রীজের দুই পাশের সড়কে উঠে এলো।
সবার হাতে মেশিনগান।
ব্রীজের সামনে-পিছনে দু’দিক থেকে তারা গুলিবৃষ্টি করতে করতে ছুটল পুলিশের গাড়িগুলোর দিকে।
পুলিশের গাড়ি তিনটি তখন ব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে পড়েছে। তিনটি গাড়িই লাগালাগি করে পরপর দাঁড়ানো।
দু’দিক থেকে আসা গুলির ঝাঁক এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে পুলিশের তিনটি গাড়ির উপর। গুলিবৃষ্টির একটা অংশ পুলিশের গাড়িগুলোর ডান ও বাম পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। আর কিছু গুলি সামনে ও পেছনের দুইটি পুলিশ লরীকে সরাসরি আঘাত করছে। লরীর পুলিশরা পাল্টা আক্রমণের কোনো সুযোগ পায়নি। তারা লরীর মেঝেতে শুয়ে পড়েছে। দুই লরীরই ফ্রন্ট কেবিন গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। সামনে লরীর ড্রাইভার-পুলিশ ও একজন পুলিশ অফিসার নিহত হয়েছে।
মাঝের পুলিশ জীপটি এখনও নিরাপদ আছে।
আক্রমণকারীদের সংখ্যা ও আক্রমণের গ্রাভিটি আঁচ করতে পেরে চারদিকে ওয়ারলেস করাসহ বিপদ সাইরেন বাজিয়ে দিয়েছে পুলিশ অফিসার সিমসন।
পুলিশ কর্মকর্তা সিমসন ও পুলিশ অফিসার গুস্তাভ তাদের কারবাইন থেকে দুপাশ দিয়ে দুজন সুযোগমতো গুলি করে যাচ্ছে।
তালিয়া ব্রীজের কয়েক গজ সামনে থেকেই উপত্যকার চড়াই শুরু হয়েছে। চড়াইটা শুরুতেই তিরিশ ডিগ্রি খাড়া উঠে গেছে। চড়াই-এর শীর্ষটা খুব দূরে নয়।
পুলিশ বহরের বিপদ সাইরেন বেজে চলেছে।
চড়াই-এর শীর্ষে সেনাবাহিনীর দুটি ভারি গাড়ি দ্রুত উঠে এসেছে।
গাড়ি দুটি থমকে দাঁড়াল চড়াই শীর্ষে।
সেনাবাহিনীর দুটি গাড়ির সামনেরটি একটি আর্মড কার। পেছনেরটা কাভারড ট্রুপস ক্যারিয়ার
আর্মড কারে বসা একজন কর্নেলের চোখে দূরবীন। দূরবীন চোখে রেখেই সে বলল, ‘তিনটি পুলিশের গাড়ি অ্যামবুশের শিকার। ব্রীজের দুপাশের সন্ত্রাসীরা এখনও ব্রীজে উঠতে পারেনি।’
আর্মড কারের ড্রাইভিং সিটে বসা সেনা অফিসারটির কাঁধে ক্যাপ্টেনের ইনসিগনিয়া। পেছনের সিটগুলোতে আরও তিনজন সেনা অফিসার। তাদের তিনজনের কাঁধের ইনসিগনিয়া বলছে, তারা তিনজনই মেজর র্যাঙ্কের অফিসার।
কর্নেল অফিসারের কথা শুনে পেছনের তিনজন অফিসার অ্যাটেনশন হয়ে বসল এবং সঙ্গে সঙ্গেই দুপাশের দুই মেজরের চেয়ার পাশের দিকে ঘুরে গেল। তাদের দুজনের সামনে আর্মড কারের দেয়ালে ভেসে উঠল নয় ইঞ্চি বর্গের স্ক্রিন এবং কী বোর্ড। অনুরূপ স্ক্রিন তৃতীয় মেজর এবং কর্নেলের সামনেও এসে সেট হয়েছে। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে তালিয়া ব্রীজের সামনে ও পেছনের দুই নিখুঁত লাইভ দৃশ্য
কর্নেল স্ক্রিনের দৃশ্যে চোখ রেখে নির্দেশ দিল, ‘মেজর কমান্ডার, টোটাল অ্যাকশন।
নির্দেশের সাথে সাথে পেছনে বসা তৃতীয় মেজরের ডান হাত অ্যাটেনশন অবস্থায় কাঁধ পর্যন্ত উপরে উঠল এবং মুখে ধ্বনিত হলো: ‘ফায়ার অ্যান্ড ব্লক এন্ট্রি ইন টু ব্রীজ ফ্রম ফ্রন্ট অ্যান্ড রিয়ার, মেজর ওয়ান অ্যান্ড মেজর টু।’
নির্দেশের সাথে সাথে দুই মেজরের, ওয়ান অ্যান্ড টু, দুই হাতের দুই তর্জনি ফায়ার পয়েন্ট অ্যাডজাস্ট করে নিয়ে দুটি লাল বোতামের উপর চেপে বসল মুহূর্তেই। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ছাদে সেট করা দুই ফায়ার টিউবের চার মুখের দুই অ্যাডজাস্ট হওয়া মুখ থেকে বিশ সেকেন্ড ধরে কয়েক শত গুলির ঝাঁক গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল একদম অরক্ষিত মুখোশধারী সন্ত্রাসীদের উপর।
ব্রীজের দুপাশে সন্ত্রাসীরা যারা উবু হয়ে বা দাঁড়িয়ে যে যে অবস্থায় গুলি করতে করতে ছুটছিল পুলিশের গাড়ির দিকে, তারা সেখানেই মুখ থুবড়ে পড়ল। শুধু একজন ব্রীজের ওপাশের প্রান্ত থেকে আহত হয়েও ছুটে পালাচ্ছিল।
চারমুখো ব্যারেলে একটা মুখ নড়ে উঠে টার্গেট অ্যাডজাস্ট করেই গুলি ছুঁড়ল এক পশলা।
পলায়নপর লোকটি সড়কের ধার বরাবর চলে গিয়েছিল। সে গুলি খেয়ে পড়ে গেল নিচে।
সেনাবাহিনীর দুইটি গাড়ি স্টার্ট নিয়ে নেমে আসতে লাগল ব্রীজের দিকে।
পুলিশের অফিসার ও সেপাইরা গাড়ি থেকে নেমে অস্ত্র বাগিয়ে আস্তে আস্তে এগোতে লাগল ব্রীজের দুই প্রান্তের দিকে। তারা সেনাবাহিনীর দুই গাড়ি দেখতে পেয়েছে। তারাই যে পুলিশের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে তাও বুঝতে পেরেছে সবাই।
পুলিশরা এগিয়ে গিয়ে দেখল, সেনাবাহিনীর ভারি মেশিনগানের ‘গুলি সন্ত্রাসীদের কাউকেই বাঁচতে দেয়নি। তারা পালাবারও সুযোগ পায়নি।
পুলিশ সন্ত্রাসীদের মুখোশ খুলে ফেলল। তাদের কালো ইউনিফরমও পরীক্ষা করল।
সেনাবাহিনীর গাড়ি দুটি প্রায় ব্রীজের কাছে এসে গেছে।
পুলিশ অফিসার সিমসন ও গুস্তাভ কয়েক পা এগিয়ে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়াল।
সুবর্ণ দ্বীপ অর্থাৎ ভিক্টর আইল্যান্ডের নতুন বিধান অনুসারে পুলিশ সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত অধঃস্তন একটা বাহিনী। এ বাহিনীর কাজ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা দেখা।
সেনাবাহিনীর আর্মড কার পুলিশ অফিসার দুজনের পাশে এসে দাঁড়াল।
পুলিশ অফিসার সিমসন অ্যাটেনশন অবস্থা থেকে দুধাপ এগিয়ে আর্মড কারের সামনের দরজা খুলে দিয়ে দুধাপ পিছনে হটে অ্যাটেনশন লাইনে এসে গুস্তাভের পাশে এসে দাঁড়াল।
গাড়ি থেকে নামল কর্নেল। তার বুকের নেমপ্লেটের সবুজ পটভূমির উপর লাল অক্ষরে লেখা কর্নেল আড্রিয়ান।
গাড়ি থেকে নেমে কর্নেল তাদের মুখোমুখি হতেই পুলিশ অফিসার সিমসন এবং গুস্তাভ পা ঠুকে স্যালুট জানাল কর্নেলকে।
স্যালুট নিয়ে কর্নেল বলল, ‘স্ট্যান্ড ইজি মি. সিমসন এবং মি. গুস্তাভ।
পুলিশ অফিসার দুজনের বুকের নেমপ্লেটে তাদের নাম লিখা ছিল।
‘ধন্যবাদ স্যার।’ সহজভাবে দাঁড়িয়ে বলল পুলিশ অফিসার সিমসন।
‘সন্ত্রাসীরা কারা?’ কি উদ্দেশ্য ছিল ওদের? কি ভাবছেন ‘আপনারা?’ বলল কর্নেল আড্রিয়ান।
‘স্যার কর্নেল ওসামাকে আমরা নিয়ে যাচ্ছি রাজধানীতে। তাকে ছিনিয়ে নেবার জন্যেই ছিল ওদের এই অভিযান। যারা মারা পড়েছে তাদের সবার পোশাকে সাগর সাইমুমের ইনসিগানিয়া এবং সবাই আদিবাসী ও আরব বংশোদ্ভুত।’ পুলিশ অফিসার সিমসন বলল।
‘ও গড! কর্নেল ওসামাকে ছিনিয়ে নেয়ার অভিযান ছিল এটা! কর্নেল ওসামা কি মাঝের গাড়িতে? সে নিরাপদ আছে?’ বলল উদ্বিগ্ন কণ্ঠে কর্নেল আড্রিয়ান।
‘জি স্যার, উনি মাঝের গাড়িতে। ভালো আছেন। শুরু থেকেই উনি খুব শান্ত আছেন।’ পুলিশ অফিসার সিমসন বলল।
‘উনার কথা মনে পড়লে আমার খুব কষ্ট হয়। এ বয়সী চৌকশ ব্রিলিয়ান্ট অফিসার আমাদের সেনাবাহিনী এর আগে পায়নি। এত অল্প বয়সে এত প্রফেশনাল অ্যাওয়ার্ড জেতার রেকর্ডও আমাদের সেনাবাহি- নীতে নেই। বলল কর্নেল আড্রিয়ান।
‘স্যার চলুন, ওর সাথে কথা বলবেন।’ পুলিশ অফিসার সিমসন বলল।
‘না থাক। মনটা আর বেশি খারাপ করতে চাই না। শৃঙ্খলিত বন্দীর বেশে তাকে দেখার কথা আমরা কেউ ভাবিনি। ঈশ্বর তার ভালো করুন, তিনি তাকে সুবুদ্ধি দান করুন।’ বলল কর্নেল আড্রিয়ান।
উপরের অনুমতি নিয়ে একজন পুলিশ অফিসার বন্দী কর্নেল ওসামার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে কর্নেল ওসামাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘সাগর সাইমুমের যে লোকরা তাকে ছিনিয়ে নিতে এসেছিল তারা সবাই মারা পড়েছে।’
শুনে কর্নেল ওসামা বললেন, ‘এটা ঠিক নয়। সাগর সাইমুমের লোকরা এভাবে এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করে না।’
‘তা উনি বলতেই পারেন। সাগর সাইমুমকে উনি একটা রেম থেকে অবশ্যই বাঁচাতে চাইবেন। কিন্তু মানুষগুলো আদিবাসী ও আরব বংশোদ্ভূত হওয়া এবং সাইমুমের ইউনিফরম পরিহিত- এই দুই সত্যকে উনি ঢাকবেন কী করে?’ বলল পুলিশ অফিসার সিমসন।
আগের সেই পুলিশ অফিসার বলল, ‘স্যার ইউনিফরমের ব্যাপারে আমি তাকে বলেছিলাম। তিনি জবাবে বলেন যে, সাগর সাইমুমের কোনো ইউনিফরম নেই। সাগর সাইমুম জনগণের অংশ। অতএব জনগণের পোশাকই তাদের পোশাক।’
ভাবছিল কর্নেল আড্রিয়ান। বলল, ‘হ্যাঁ, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সন্ত্রাসীরা আদিবাসী ও আরব বংশোদ্ভুত। কিন্তু তবু আমি মনে করি, তিনি আমাদেরকে ভাবনার একটা খোরাক দিয়েছেন।’
‘তা ঠিক স্যার।’
বলেই পুলিশ অফিসার তাকাল সেই পুলিশ অফিসারের দিকে। বলল, ‘সন্ত্রাসীরা কতজন, গোণা হয়েছে?’
‘হয়েছে স্যার। ওরা উনপঞ্চাশ জন।’ বলল পুলিশ অফিসারটি।
‘আহত একজন ছুটে পালাচ্ছিল। তাকে গুলি করা হয়। গুলি খেয়ে সে রাস্তার দক্ষিণ পাশে গড়িয়ে নিচে পড়ে গেছে। তাকে কি গোণা হয়েছে?’
পুলিশ অফিসার সিমসন তাকাল সেই পুলিশ অফিসারটির দিকে।
পুলিশ অফিসারটি বলল, ‘রাস্তার পাশে গড়িয়ে পড়া এমন কোনো লাশ আমরা তুলিনি। আমরা বিষয়টা জানতাম না। নিশ্চয় সে গণনার মধ্যে নেই।’
‘আমি দেখছি স্যার।’ বলেই সে ছুটল রাস্তার পুলিশদের কাছে। তারপর কয়েকজন পুলিশকে নিয়ে ছুটল সে রাস্তার দক্ষিণ পাশে।
মাত্র পাঁচ মিনিট।
একটা লাশকে ধরাধরি করে কয়েকজন পুলিশ উঠে এলো রাস্তার দক্ষিণ পাশ থেকে। অন্য লাশদের সারিতে নিয়ে গিয়ে লাশটিকে রাখল।
অন্যান্য লাশের চেয়ে এ লাশটিকে কিছুটা লম্বা এবং মোটা তাজা দেখা যাচ্ছে।
‘এই-ই বোধ হয় দলের সরদার। বলে পুলিশদের সাথে থাকা সেই পুলিশ অফিসার, মি. হেড্ডা, এগিয়ে এসে টান দিয়ে লাশটির মুখোশ খুলে ফেলল। মুখ ও মাথা লাশটির উন্মুক্ত হয়ে গেল। তার মুখোশ মুখ ও মাথা দুটোকেই কভার করেছিল।
লাশটির মুখের উপর নজর পড়তেই চমকে উঠল পুলিশ অফিসার হেড্ডা। একদম নিরেট শেতাংগ, স্কিনহেডেড লাশটি। অন্য উনপঞ্চাশটি লাশের সাথে এর মিল নেই।
পুলিশ অফিসার হেড্ডা দ্রুত নজর ফেরাল ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসার ও সেনা কর্মকর্তাদের দিকে। কণ্ঠ একটু উঁচু করেই বলল পুলিশ অফিসার সিমসনকে উদ্দেশ্য করে, ‘স্যার, যে লাশটি নিচ থেকে তুলে আনলাম সে শ্বেতাংগ এবং স্কিনহেডেড।’
পুলিশ অফিসার হেড্ডার কথা শুনেই কর্নেল আড্রিয়ান এবং পুলিশ অফিসার সিমসনরা ছুটে এলো লাশটির কাছে।
পুলিশ অফিসার সিমসনের নজর লাশের চেহারার উপর পড়তেই বলে উঠল, ‘ও গড! ভয়ংকর ব্যাপার।’
কর্নেল আড্রিয়ান লাশের দিক থেকে নজর সরিয়ে সিমসনের দিকে চেয়ে বলল, ‘কি ব্যাপার মি. সিমসন? আপনি কি এই স্কিনহেডেড শ্বেতাংগকে চেনেন? আদিবাসী ও আরবদের সাথে এ কেন?’
পুলিশ অফিসার সিমসনের চোখে-মুখে তখনও অপার বিস্ময়। বলল, ‘স্যার, সোর্ন (SWORN. Super White Organisation of Royal Nation)-এর ভিক্টর আইল্যান্ড শাখার উনি সেকেন্ড ইন কমান্ড। নাম হের রুডিগার। সপ্তাহখানেক আগে তিনি ইউক্রেন থেকে জার্মানি হয়ে এখানে এসেছেন।
‘এটা কিভাবে সম্ভব মি. সিমসন! সাগর সাইমুম তো সোর্ন-এর নাম্বার ওয়ান এনিমি! তাহলে সোর্ন-এর ভিক্টর আইল্যান্ডের সেকেন্ড ইন কমান্ড হের রুডিগারের পরনে সাগর সাইমুমের ইউনিফর্ম কেন?’ বলল কর্নেল আড্রিয়ান।
‘জানি না স্যার, এ অবাক করা ব্যাপার নিয়ে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সরকার কি ভাববেন। তবে আমার যা মনে হচ্ছে তা বলতে পারি। বিষয়টা হচ্ছে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার ব্যাপার। স্যার সোর্ন-এর হের রুডিগারই কর্নেল ওসামাকে পুলিশ হাসপাতাল থেকে কিডন্যাপ করে আল-কবির উপত্যকায় সোর্ন-এর ঘাঁটিতে নিয়ে আসে। তাদের টার্গেট ছিল কর্নেল ওসামার কাছ থেকে কিছু কথা আদায় করার পরে তাকে হত্যা করা। পুলিশ এটা জানতে পেরে দ্রুত আল-কবিরে এসে কর্নেল ওসামার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। সরকারের পরবর্তী নির্দেশে তাকে রাজধানীতে পুলিশের জুডিশিয়াল ব্রাঞ্চের কাস্টডিতে পৌঁছে দেয়ার সিদ্ধান্ত আসে। এই সিদ্ধান্তের বিরোধী ছিল হের রুডিগার। এ অবস্থা সোর্ন-এর অনুগত বা কেনা অথবা কোনভাবে বাধ্য করা কিছু আদিবাসী ও আরব বংশোদ্ভূতদের গায়ে সাগর সাইমুমের ইউনিফর্ম পরিয়ে এখানে নিয়ে এসেছিল কর্নেল ওসামাকে ছিনিয়ে নিয়ে ক্রসফায়ারের নামে তাকে হত্যা করা এবং এর দায় সাগর সাইমুমের কাঁধে চাপানো। এতে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলাও হলো এবং নিজেদের উপর দায় না নিয়ে হত্যাও করা হলো কর্নেল ওসামাকে।’ বলল পুলিশ অফিসার সিমসন
‘ধন্যবাদ মি. সিমসন। ঘটনা এটাই। কিন্তু ঈশ্বর ওদের সাজানো ছক একেবারে উল্টে দিয়েছেন। কর্নেল আড্রিয়ান বলল।
‘শুধু ষড়যন্ত্রের ছক উল্টে দেয়া নয়। সোর্ন-এর ষড়যন্ত্র ঈশ্বর একেবারে নগ্ন করে দিয়েছেন। আমি মনে করি এতে বিরাট উপকার হলো ভিক্টর আইল্যান্ড সরকারের।’ বলল পুলিশ অফিসার সিমসন।
ভাবছিল কর্নেল আড্রিয়ান। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘আমি বিষয়টার মধ্যে আমাদের জন্য বিরাট সমস্যা দেখছি। সোর্ন যদি ভিক্টর আইল্যান্ড ভিত্তিক হতো এবং আমাদের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো তাহলে বলার কিছু ছিল না। কিন্তু সোর্ন বিশ্বের নাজীবাদী (শেতাঙ্গ বিশ্ব রাষ্ট্র গঠনের অভিলাষী) সংগঠনগুলোর একটা সিন্ডিকেট। এরা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে কাজ করে। যেমন ইউক্রেনে এরা ‘আজভ ব্যাটেলিয়ান’ নাম নিয়ে কাজ করেছে। আমাদের আইল্যান্ডে এরা যেমন আমাদের সাহায্য করা ও নিরাপত্তা দেয়ার নাম করে ঢুকেছে তেমনিভাবে এরা ইউক্রেনেও ঢুকেছিল। কিন্তু শীঘ্রই এরা কৌশলে জনমতকে ব্যবহার করে ইউক্রেনে নিজেদের সরকার গঠন করে নিয়েছিল। তারা ইসরাইল ও পশ্চিম থেকে অঢেল সাহায্য পেয়েছিল। কিন্তু রাশিয়াকে তারা ম্যানেজ করতে পারেনি। তাই ইউক্রেন থেকে তাদের সরতে হয়েছে। আমাদের ভিক্টর আইল্যান্ডে সোর্ন-এর যারা এসেছে, তাদের অধিকাংশই ইউক্রেন থেকে পালিয়ে আসা। একটু থামল কর্নেল আড্রিয়ান।
এই সুযোগে পুলিশ অফিসার সিমসন বলে উঠল, ‘মারাত্মক ব্যাপার! ইউক্রেনের পুনরাবৃত্তি তারা ঘটাবে বলে আশঙ্কা করেন? আপনি বললেন, পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে তারা বিভিন্ন নামে কাজ করে। সেসব দেশেও কি এমনটা ঘটেছে?’
ইউক্রেনের পুনরাবৃত্তি তারা আমাদের ভিক্টর আইল্যান্ডে ঘটাবে কথাটা এভাবে বলা যাবে না। তবে একটা আশঙ্কার ব্যাপার তো আছেই। ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে তারা কাজ করছে। কোথাও ‘দ্য বেইস’ নামে, কোথাও ‘প্যাট্রিয়েট মুভমেন্ট’ নামে, কোথাও মিলিশিয়া মুভমেন্ট, অ্যারিয়ান রিপাবলিকান, অলট রাইট, আইডেন্টিটারিয়ান নামে। কিন্তু সবার লক্ষ্য এক। কিন্তু সব দেশে তারা ক্ষমতা দখল করেছে, এটা নয়। ইউরোপ, আমেরিকার গণতান্ত্রিক দেশে প্রকাশ্যে তাদের পক্ষে এটা সম্ভবও নয়। তবে কিছু দেশে ক্ষমতার শেয়ার পেতে শুরু করেছে। আমাদের দেশের পরিস্থিতি ইউরোপ আমেরিকা থেকে ভিন্ন। আমাদের দেশে সরকার ও জনতার মধ্যে বিভেদের যে দেয়াল, তা সেখানে নেই। এই সুযোগের সুবিধা যে কেউ নিতে পারে। আজকের ঘটনা তার খুব ছোট একটা প্রতিচ্ছবি।’
পুলিশ অফিসার সিমসনের মুখটা ম্লান হয়ে গেছে। কর্নেল আড্রিয়ানের কথা শেষ হতেই পুলিশ অফিসার সিমসন দ্রুত বলে উঠল, ‘আমাদের পুলিশ হেডকোয়ার্টারে এখানকার এই ঘটনা দ্রুত জানাতে চাই।’
‘হ্যাঁ মি. সিমসন এখনি জানিয়ে দেন। আমিও জানাচ্ছি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে।’ বলল কর্নেল আড্রিয়ান।
‘ইয়েস স্যার।’
বলে পুলিশ অফিসার সিমসন তার বেল্টের খাপ থেকে অয়্যারলেস বের করে নিয়ে কয়েক ধাপ সরে গেল।
কর্নেল আড্রিয়ানও তার ওয়ারলেস নিয়ে তার গাড়ির দিকে এগোলো।
শান্তির দ্বীপে সংঘাত – ৫
৫
ভিক্টর আইল্যান্ডে দখলদার সরকারের মন্ত্রীসভার বৈঠক।
মন্ত্রীসভার বৈঠকে সাধারণত প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্ব দেন।
কিন্তু আজকের মন্ত্রীসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নয়, খোদ প্রেসিডেন্ট অর্থাৎ রাজা চতুর্থ হেরাল্ডের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ভিক্টর আইল্যান্ডে দখলদার সরকারের সত্তর সদস্যের একটা পার্লামেন্ট আছে। দখলদারীর পূর্বে সুবর্ণদ্বীপে পার্লামেন্ট ছিল একশ চল্লিশ সদস্যের। পূর্বে প্রতি পাঁচ হাজার লোক দ্বারা নির্বাচিত একজন পার্লামেন্ট সদস্য ছিল। এখন দেড় হাজারে একজন। পার্লামেন্টের সব সদস্যই শ্বেতাংগ এবং তারা প্রকৃত পক্ষে নির্বাচিত নয়, মনোনীত। ভিক্টর পরিবার এবং এই পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্টরাই এই মনোনয়ন দেয়। মন্ত্রীসভার ২১ জন সদস্যের সবাই শাসক সিন্ডিকেটের সদস্য। এই সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে ভিক্টর পরিবার এবং এই পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে। ভিক্টর আইল্যান্ডে বসতির অধিকার কে পাবে আর কে পাবে না তা নির্ধারণ করে এই সিন্ডিকেটই। তবে ‘সোর্ন’-এর লোক যারা ভিক্টর আইল্যান্ডে বসতি গাড়ছে, তাদের কথা আলাদা। তাদের বসতির বিষয়টা দেখে ‘সোর্ন’-এর কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ। আইল্যান্ডের ভিক্টর সরকার তাদের সিদ্ধান্তের প্রতি একটা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দান করে মাত্র।
মন্ত্রীসভার বৈঠকে ২১ জন সদস্যের সবাই উপস্থিত।
প্রধানমন্ত্রী যে আসনে বসে মন্ত্রীসভায় সভাপতিত্ব করেন, সেই আসনেই তিনি বসে। তার আসনটি মন্ত্রীসভার সদস্যদের ফ্লোর থেকে ৬ ইঞ্চি উঁচু একটা মঞ্চে।
প্রধানমন্ত্রীর আসন থেকে ছয় ফুট পেছনে এবং তিন ফুট উঁচুতে আরেকটা প্রশস্ত মঞ্চ। এখানেই রাজাসন বা প্রেসিডেন্টের বসার সিংহাসন। মন্ত্রীসভার বৈঠকে এই আসনটি খালি থাকে। আজ কিন্তু খালি নেই। রাজা চতুর্থ হেরাল্ড সিংহাসনে সমাসীন। তিনিই আজ মন্ত্রীসভায় সভাপতিত্ব করছেন।
রাজা হেরাল্ড বিশেষ পার্সোনাল সিকিউরিটি দ্বারা পরিবেষ্ঠিত হয়ে বিশেষ দরজা দিয়ে পার্লামেন্ট হলে প্রবেশ করলে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীপরিষদের সব সদস্য উঠে দাঁড়ায়। ধ্বনি ওঠে, যিশু ঈশ্বর সব সময় সদয় থাকুন আমাদের মহান রাজার প্রতি
রাজা চতুর্থ হেরাল্ড সিংহাসনে বসে তার সামনে রাখা ফাইলে নজর বুলাল। মাথা তুলে সোজা হয়ে বসে সামনে তাকালো। তার গুরুগম্ভীর কন্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীসভার সকল সদস্যকে সুস্বাগতম। জরুরি আহ্বানে সাড়া দিয়ে আপনারা যথাসময়ে হাজির হয়েছেন, সেজন্য সকলকে ধন্যবাদ।’
একটু থেমেই রাজা হেরাল্ড তাকাল প্রধানমন্ত্রীর দিকে। বলল, ‘মি. প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসভায় আজকের আলোচনা এজেন্ডা পেশ করুন। প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডারিক ফারল্যান্ড একটু নড়েচড়ে উঠে দাঁড়াল। একটু পিছনে ফিরে রাজার উদ্দেশ্যে একটা লম্বা বাউ করে কথা শুরু করল, ‘মহান রাজাধিরাজ প্রেসিডেন্ট রাজা চতুর্থ হেরাল্ড-এর ‘প্রতি আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এবং তাঁর দীর্ঘ, সুস্থ ও সফল জীবনের জন্য আমাদের প্রার্থনা।’
কথা শেষে আরেকটি বাউ করে চেয়ারে বসল প্রধানমন্ত্রী। বলল মন্ত্রীসভার সদস্যদের দিকে চোখ তুলে, ‘মন্ত্রীসভার সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, আমাদের মহান রাজাধিরাজ প্রেসিডেন্ট জরুরি প্রয়োজনে অত্যন্ত শর্ট নোটিশে মন্ত্রীসভার এই বৈঠক আহ্বান করেছেন। বিশেষ নিরাপত্তাজনিত কারণেই বৈঠকের এজেন্ডা, আগাম জানানো হয়নি। এজেন্ডা পেশের মাধ্যমেই মন্ত্রীসভার বৈঠকের কাজ শুরু হবে। আমি এজেন্ডা পেশ করছি।
আজকের মন্ত্রীসভার জন্য একটাই মাত্র জরুরি এজেন্ডা সেটা হলো তালিয়া নদীর ব্রিজে আমাদের পুলিশ স্কোয়ার্ড-এর উপর সন্ত্রাসী হামলাজনিত উদ্ভূত পরিস্থিতি। পরিস্থিতিটা আমাদের জন্য খুবই বিব্রতকর এবং ভিক্টর আইল্যান্ডের জন্য একটা হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। আপনারা জানেন, ঠিক সময়ে সেনাবাহিনীর একটি দল সেখানে এসে না পড়লে আমাদের পুলিশ স্কোয়ার্ড-এর কেউই বাঁচত না এবং আমাদের মূল্যবান বন্দী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ ওরফে ভিক্টর ম্যাথিয়ানকে সন্ত্রাসীরা ছিনিয়ে নিয়ে যেত। সংবাদপত্রসহ সব মিডিয়ায় প্রচার করা হয়েছে কর্নেল ওসামার দল সাগর সাইমুম’ এই সন্ত্রাসী আক্রমণ পরিচালনা করে এবং ছোট্ট একটি পুলিশ স্কোয়ার্ড সন্ত্রাসীদের পরাভূত করতে সমর্থ হয়। সেনাবাহিনীর একটা ইউনিট এসে পড়লে সন্ত্রাসীরা পাল্টা আক্রমণের শিকার হয় এবং উনপঞ্চাশজন সন্ত্রাসী নিহত হয়। কিন্তু যে কথাটা প্রচার করা হয়নি সেটা হল ভিক্টর আইল্যান্ডে সোর্ন-এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ডেপুটি কমান্ডার হের রুডিগারের নেতৃত্বে এই সন্ত্রাসী হামলা পরিচালিত হয় এবং তিনিও আমাদের সেনা ইউনিটের পাল্টা হামলায় নিহত হন। সন্ত্রাসীদের সংখ্যা ছিল পঞ্চাশজন। আসলে সব মিডিয়া হের রুডিগারকে বাদ দিয়ে সন্ত্রাসীদের সংখ্যা ঊনপঞ্চাশজন দেখিয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রীকে একটু থামতে হলো। প্রধানমন্ত্রীর কথায় সোর্ন ও হের রুডিগার সন্ত্রাসী হামলার সাথে যুক্ত থাকার কথা প্রকাশ হবার সাথে সাথে গোটা মন্ত্রীসভায় বিরাট গুঞ্জন উঠল। অনেকের কণ্ঠে উচ্চারিত হলো, কি সর্বনাশ এটা কি সত্য?’
প্রধানমন্ত্রী সবার দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, এটা সত্য। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই ঘটেছে। ঊনপঞ্চাশটি লাশের সাথে সাগর সাইমুমের ইউনিফর্ম পরা হের রুডিগারের লাশও সংরক্ষিত আছে।
একজন তরুণ মন্ত্রী উঠে দাঁড়িয়ে রাজা চতুর্থ হেরাল্ডকে একটা দীর্ঘ বাউ করে বলল, ‘এটা কেন, কিভাবে ঘটতে পারে! সোর্ন শুধু আমাদের মিত্র, আমাদের শক্তিই নয়, গোটা দুনিয়ায় ওরা শ্বেতাঙ্গ অর্থাৎ পশ্চিমী স্বার্থের পক্ষের একটা বড় শক্তি।
‘আমাদের তরুণ মন্ত্রীকে ধন্যবাদ। আপনি যে প্রশ্ন তুলেছেন সেটাই আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়।’
বলে একটু থেমেই আবার শুরু করলো প্রধানমন্ত্রী, ‘আমরা মনে করছি, তারা তাদের একটা বাড়াবাড়ি দিয়েই এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে। আপনারা অবগত আছেন সাগর সাইমুমের শীর্ষকর্তা ‘ডাবল জিরো’ ছদ্মনামে পরিচিত কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহকে আমরা রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করেছি। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ টিমের পাহারায় সামরিক হাসপাতালে সে চিকিৎসাধীন ছিল। ভিক্টর আইল্যান্ডে সোর্ন-এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হের রুডিগারের নেতৃত্বে সোর্ন- এর বিশ-পঁচিশজন সদস্যের একটা দল জোর করে হাসপাতালে ঢুকে হাসপাতাল থেকে কর্নেল ওসামাকে তুলে নিয়ে যায় আল-কবির ‘উপত্যকায় তাদের ঘাঁটিতে। বাধা দিলে সংঘর্ষ হতো, হাসপাতালে আহত-নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটতো। এই কারণে আমাদের পুলিশ ও সেনা সদস্যরা ধৈর্য ধারণ করে। বিষয়টা সরকারের অবগতিতে আনা হলে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয় আপোসে তাদেরকে বুঝিয়ে, সরকারের সিদ্ধান্তের কথা বলে কর্নেল ওসামাকে কেন্দ্ৰীয় জুডিশিয়াল কাস্টডিতে নিয়ে আসার জন্যে। হের রুডিগার প্রথমে বিরোধিতা করলেও শেষে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। এরপরেই পুলিশের একটি স্কোয়াড হেরাল্ড রোড ধরে কর্নেল ওসামাকে নিয়ে রাজধানীতে আসছিল। পথে তালিয়া উপত্যকার তালিয়া নদীর ব্রিজে আমাদের পুলিশের স্কোয়াড় সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়। ভাগ্যক্রমে সেনাবাহিনীর একটা টিম এ পথে আসছিল। তারা সন্ত্রাসীদের উপর পাল্টা হামলা চালিয়ে পুলিশ স্কোয়ার্ড ও বন্দীকে রক্ষা করে। সাইমুমের ইউনিফর্মে নিহত সন্ত্রাসীদের দেখে সেখানে উপস্থিত পুলিশ ও সেনা সদস্যরা মনে করেছিল সাইমুম সন্ত্রাসীরাই তাদের নেতা কর্নেল ওসামাকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্যই এই অভিযান চালায়। কিন্তু পরে সব সন্ত্রাসীদের বডি চেক করতে গিয়ে সাইমুমের ইউনিফর্ম পরা নিহত হের রুডিগারের লাশ পাওয়া যায়। ৫০জনের মধ্যে সেই ছিল একমাত্র শ্বেতাঙ্গ। অন্যরা সবাই ছিল আদিবাসী ও আরব বংশোদ্ভূত। সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থল থেকে বিষয়টি সরকারকে জানানো হলে তাদেরকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় যে হের রুডিগারের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টা গোপন করতে হবে এবং সন্ত্রাসীদের সংখ্যা দেখাতে হবে ৪৯জন। প্রচার হবে যে সাগর সাইমুমের ৪৯জন সন্ত্রাসী তাদের নেতা কর্নেল ওসামাকে ছিনিয়ে নিতে এসে সবাই মারা পড়েছে। থামল প্রধানমন্ত্রী।
সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়ালো সেই তরুণ মন্ত্রী। উঠে দাঁড়িয়ে রাজা চতুর্থ হেরাল্ডকে একটা বাউ করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমরা যে তাৎক্ষণিকভাবে যৌক্তিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি এজন্য মহামান্য রাজা চতুর্থ হেরাল্ড এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সেই সাথে প্রশ্ন রাখছি, সোর্ন ও হের রুডিগারের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আপাতত গোপন রাখতে পারলেও অবশেষে গোপন রাখা যাবে না। কারণ ভিক্টর আইল্যান্ডের সোর্ন কর্তৃপক্ষের নিশ্চয়ই জানা আছে হের রুডিগারের কথা এবং তারা অবশ্যই বসে থাকবে না। এই অবস্থায় আমাদেরকে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেটা হলো, আমরা অফেন্সিভে যাবো না, আমরা ডিফেন্সিভ অবস্থানে থাকব এবং এই ক্ষেত্রে আমরা প্রথম হব না, আমরা ওদের অ্যাকশনকে ফলো করব।’
তরুণ মন্ত্রীর কথা শেষ হলে উঠে দাঁড়াল মন্ত্রীসভার সিনিয়র সদস্য অর্থমন্ত্রী। রাজা চতুর্থ হেরাল্ডকে একটা বাউ করে বলল, ‘তরুণ মন্ত্রী মি. কার্লকে ধন্যবাদ। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় সামনে এনেছেন, এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত এখনই হওয়া দরকার। কিন্তু তার আগে একটা বিষয় আমাদের কাছে পরিষ্কার হওয়া দরকার, সাগর সাইমুমের সাথে হের রুডিগার বা সোর্ন-এর সম্পর্ক সংযোগ হলো কি করে?
‘ধন্যবাদ অর্থমন্ত্রী মহোদয়। আমাদের তরুণ মন্ত্রী কার্ল-এর মতোই আপনার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই আমরা কিন্তু চিন্তা করছি। ঊনপঞ্চাশজন আদিবাসী ও আরব বংশোদ্ভুত সন্ত্রাসীদের পরিচয়, উদ্ধারে আমাদের গোয়েন্দা বিভাগকে কাজে নামানো হয়। আজ সকালেই পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেয়েছি। ঊনপঞ্চাশজন সন্ত্রাসীর মধ্যে পঁয়ত্রিশজনের পরিচয় উদ্ধার করা গেছে। এরা সকলেই বোট নির্মাণ, হোটেল-রেস্টুরেন্টে প্রজেক্টের শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। অবশিষ্ট চৌদ্দজনও ডে লেবার শ্রেণির লোক। তাদের কারও সাথেই সাগর সাইমুমের কানেকশন পাওয়া যায়নি। মনে করা হচ্ছে, এই গরীব লোকদের অর্থের লোভ এবং চাকরি হারাবার ভয় দেখিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে বা ব্যবহার করে আসা হচ্ছে। কর্নেল ওসামার বক্তব্য এই মতকেই সমর্থন করছে। জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে কর্নেল ওসামা বলেছেন, ‘সাগর সাইমুমের দলীয় পরিচয় জ্ঞাপক কোনো ইউনিফর্ম নেই।’ আরেকটি কথা তিনি বলেছেন, সেটা হলো এত বড় দল নিয়ে হামলা করা, বা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত সাগর সাইমুমের নেই। সব মিলিয়ে এটাই এখন পরিষ্কার যে, সোর্ন-ই কর্নেল ওসামাকে ছিনতাই করতে চেয়েছিল এবং এর দায় চাপাতে চেয়েছিল সাগর সাইমুমের ঘাড়ে। থামলো একটু প্রধানমন্ত্রী।
নোট শিটের ওপর নজর বুলাল। হাতে তুলে নিল কলম।
এ সময় অতিরিক্ত ক্যাবিনেট সচিব অনুমতি নিয়ে সভাকক্ষে প্রবেশ করল। তার হাতে একটা ইনভেলাপ। ইনভেলাপটির রং লাল।
সে এসে ইনভেলাপটি দিল ক্যাবিনেট সচিবের হাতে।
ক্যাবিনেট সচিব ইনভেলাপটি খুলল।
পড়ল ভেতরের কাগজ। কুঞ্চিত হলো তার কপাল।
দ্রুত উঠে এসে ইনভেলাপসহ কাগজটি দিল প্রধানমন্ত্রীর হাতে।
প্রধানমন্ত্রী চিঠিটি পড়ল। পড়ার সাথে সাথে তার চোখে মুখে প্রবল অস্বস্তির ছায়া নেমে এলো। সে দ্রুত ইনভেলাপের সাথে চিঠিটাকে গেঁথে একটা ফাইলে ঢুকাল। ফাইল হাতে উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত পদক্ষেপে গিয়ে দাঁড়াল প্রেসিডেন্সিয়াল ডেস্কের সামনে। একটা বাউ করে সেটা এগিয়ে দিল রাজার সামনে।
‘মি. ফার্ডিন্যান্ড, জরুরি কিছু?’
বলে রাজা চতুর্থ হেরাল্ড বাম হাত দিয়ে আনফোল্ড করল ফাইলটা। তার সামনে এলো ভেতরের চিঠিটি।
পৃথিবীর লেটার হেড এর উপর নজর পড়তেই মুখে অসন্তুষ্টির একটা ছায়া ফুটে উঠে দ্রুত মিলিয়ে গেল।
‘বসুন মি. ফার্ডিন্যান্ড। চিঠির উপর চোখ বুলাতে বুলাতেই বলল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
প্রধানমন্ত্রী বসল টেবিলের বাম পাশে একটু দূরে রাখা চেয়ারটিতে।
চিঠির উপর চোখ রেখেই রাজা চতুর্থ হেরাল্ড বলল, ‘মি. ফার্ডিন্যান্ড কি ভাবছেন আপনি?’
‘আপনি যা ভাবছেন সেটাই হবে। তবে মন্ত্রীসভার সদস্যদের মত জানার পর আমরা সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হবে এক্সেলেন্সি। আমি তাৎক্ষণিকভাবে যেটা ভেবেছি সেটা হলো, ওদের আল্টিমেটাম চব্বিশ ঘণ্টার। সময় ক্ষেপণের কৌশল আমাদের বের করতে হবে এবং সেই সুযোগে সব দিক দিয়ে বেস্ট একটা সিদ্ধান্ত আমাদের নিতে হবে।’ বলল প্রধানমন্ত্রী ফার্ডিন্যান্ড।
‘ধন্যবাদ মি. ফার্ডিন্যান্ড। আপনি ঠিক ভেবেছেন। দেখা যাক, মন্ত্রীসভার সদস্যরা কি বলেন। ধন্যবাদ।’ রাজা চতুর্থ হেরাল্ড বলল।
‘আমাদের মহান রাজার কল্যাণ ও দীর্ঘ জীবন লাভ হোক। বলে প্রধানমন্ত্রী নিজের আসনে ফিরে এলো।
মন্ত্রীসভার সদস্যরা সবাই উদগ্রীব প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নতুন কিছু শোনার জন্য।
প্রধানমন্ত্রী তার সামনে বসা মন্ত্রীসভার সদস্যদের সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তরুণ মন্ত্রী মি. কার্ল আমরা অফেন্সিভে যাব, না ডিফেন্সিভে থাকব- এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছিলেন। মন্ত্রীসভার অন্যতম সদস্য সম্মানিত অর্থমন্ত্রী এ ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সম্মানিত সদস্যবৃন্দ ওরা মানে সোর্ন অফেনসিভে এসে গেছে। এইমাত্র ওদের একটা চিঠি পেলাম। চিঠিতে ওরা চব্বিশ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে। এই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের গ্রেফতারকৃত কর্নেল ওসামাকে ওদের হাতে নিঃশর্তভাবে তুলে দিতে হবে। যদি যথাসময়ে কর্নেল ওসামাকে ওদের হাতে তুলে না দেওয়া হয় তাহলে সোর্ন-এর সাথে ভিক্টর আইল্যান্ডের যে চুক্তি হয়েছে তা বাতিল হয়ে যাবে, সোর্ন থেকে ভিক্টর আইল্যান্ড বহিষ্কৃত হবে এবং সোর্ন-এর লোকেরা ভিক্টর আইল্যান্ড ত্যাগ করবে।’
প্রধানমন্ত্রী একটু থামল। একটা দম দিল যেন। কথার শেষের দিকে তার কন্ঠ কিছুটা শুকনো হয়ে উঠেছিল। কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে আবার সে বলে উঠল, ‘চিঠির বিষয়বস্তু এটুকুই। চিঠির আল্টিমেটাম নিয়েই মন্ত্রীসভার আলোচনা শুরু হবে। এ আলোচনায় সবকিছুই এসে যাবে। মন্ত্রীসভার সম্মানিত সদস্যদেরকে আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
‘আমার মনে হয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয় বিষয়টার উপর একটা উদ্বোধনী বক্তব্য দিলে ভালো হবে। এতে আলোচনা একটা দিক নির্দেশনা পাবে।’ বলল পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ভিক্টর সিটি স্টেট ইউনিভার্সিটির ফরেন রিলেশনস বিভাগের প্রধান অধ্যাপকও তিনি।
‘ধন্যবাদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়।
বলে একটু থেমেই আবার শুরু করল, ‘সোর্ন-এর এই চিঠি থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল যে, সেদিন তালিয়া উপত্যকায় আমাদের পুলিশ স্কোয়ার্ড-এর উপর যে হামলা হলো তার দায়ভার সোন নিতে চায় না। এই কারণেই হের রুডিগার সম্পর্কে কোনো উচ্চবাচ্য তারা করেনি। এটা তাদের জন্য একটা দুর্বল পয়েন্ট। যা আমরা ইচ্ছা করলে ব্যবহার করতে পারি। দ্বিতীয় বিষয় হলো, তাদের আল্টিমেটাম। তাদের দাবি মেনে নিয়ে যদি কর্নেল ওসামাকে নিঃস্বার্থভাবে তাদের হাতে তুলে দেই, তাহলে তাদের সাথে আমাদের বিরোধ আপাতত মিটে যায়। আর যদি তাদের দাবি না মানা হয় তাহলে সোর্ন-এর বৈরিতার সম্মুখীন হতে হবে। সে অবস্থা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে আমি জানি না। তৃতীয় বিষয় হলো, আমাদের রাষ্ট্রের নীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা মধ্যবর্তী কোনো অবস্থান সৃষ্টি করতে পারি কিনা। এ বিষয়গুলোর উপর সবার মত এলে আমরা কোনো একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি।’ থামল প্রধানমন্ত্রী।
একজন ইয়ং মন্ত্রীর স্পিকার স্ট্যান্ডে নীল বাতি জ্বলে উঠল
‘বলুন মি. শিক্ষা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী।’ বলল প্রধানমন্ত্রী।
মহামান্য রাজা চতুর্থ হেরাল্ড’ বলতে শুরু করল শিক্ষা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে সমস্যা আমাদের সামনে এনেছেন তাকে আমি খুব জটিল মনে করি না। আমি ধন্যবাদ জানাই সোর্নকে যে, তারা হের রুডিগারের নিহত নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। আমরা যে কারণে গোপন করেছি, সেই একই কারণে তারা হের রুডিগারের সন্ত্রাসী অভিযানে অংশগ্রহণ এবং তার নিহত হওয়াকে হজম করে গেছে। ফলে সোর্ন-এর সাথে আমাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটার একটা বড় কারণ দূর হয়ে গেল। এখন যদি আমরা সন্ত্রাসী দল সাগর সাইমুমের নেতা কর্নেল ওসামাকে তাদের হাতে নিঃশর্তভাবে তুলে দেই, তাহলে আমরা সোর্ন-এর সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কে ফিরে যেতে পারি। আর এতে আমাদের বিন্দুমাত্র ক্ষতি নেই। কারণ সাগর সাইমুম আমাদের এক নম্বর শত্রু এবং আমাদের শত্রু বলেই তারা সোর্ন-এরও শত্রু। তার উপর সোর্ন-এর চারজন লোককে কর্নেল ওসামা হত্যা করেছে। সুতরাং প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য কর্নেল ওসামাকে হাতে পাওয়া তাদের অধিকার বলে আমি মনে করি।’ থামল শিক্ষা, যুব ক্রীড়া মন্ত্ৰী।
এবার নীল বাতি জ্বলে উঠল তরুণ মন্ত্রী কার্ল-এর স্পিকার স্ট্যান্ডে।
অনুমতি পেলে তার কথা সে শুরু করল, ‘আমাদের প্রিয় মহামান্য রাজা চতুর্থ হেরাল্ড এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের সম্মানিত শিক্ষা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী জটিল সমস্যার যে সহজ সমাধান দিয়েছেন, তা যদি গ্রহণ করা যেত খুবই ভালো হতো। অনেক ঝামেলা চুকে যেত। কিন্তু সম্মানিত মন্ত্রী কিছু বিষয় এড়িয়ে গিয়ে একটা সহজ সমাধান দাঁড় করিয়েছেন যা গ্রহণ করলে আইন, সংবিধান বলে আমাদের কিছু থাকবে না এবং সোর্ন-এর ঔদ্ধত্যকে আকাশে তোলা হবে। কর্নেল ওসামা এবং সাগর সাইমুম আমাদের এক নম্বর শত্রু, এ ব্যাপারে দ্বিমত করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু তাই বলে একটা সত্য ঘটনাকে আমলে নেব না, আমাদের মিত্র বা বন্ধুদের ঘৃণ্য স্বেচ্ছাচারী আচরণ আমাদের মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত করবে আর আমরা তা দেখব না। তা হয় না। কর্নেল ওসামা সোর্ন-এর চারজন লোককে হত্যা করেছে কথাটা এভাবে বলা যায় না। বরং সোর্ন-এর চারজন ক্রিমিনাল একজন নারীকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার সময় নারীটিকে উদ্ধার করতে আসা কর্নেল ওসামার হাতে নিহত হয়েছে— এটাই সত্য। অতএব সোর্ন-এর চারজন লোক হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সোর্ন-এর হাতে আমাদের বন্দীকে আমরা তুলে দিতে পারি না। আর ঘটনা এটা না হয়ে যদি কর্নেল ওসামা ভিক্টর আইল্যান্ডের শত্রু হিসেবে সোর্ন তাকে তাদের হাতে নিতে চায়, তাহলে সেটাও অযৌক্তিক। ভিক্টর আইল্যান্ডের বিরুদ্ধে কর্নেল ওসামার অপরাধের বিচারের জন্য ভিক্টর আইল্যান্ডের সরকার রয়েছে এবং সে বিচার কাজ শুরু হয়েছে। সুতরাং কর্নেল ওসামাকে সোর্ন-এর হাতে তুলে দেওয়ার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। আর যদি সোর্নকে তুষ্ট করার জন্য কর্নেল ওসামাকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন সোর্ন-এর হাতে তুলে দেওয়ার কথা ওঠে, তাহলে আমার প্রশ্ন, এই তুষ্ট করার শেষ সীমা কোথায় গিয়ে ঠেকবে? আমার শেষ কথা হলো সরকারের মধ্যে কোনো সরকার আমরা মানবো না, আমরা আরেক ইউক্রেন হতে চাই না।’
তরুণ মন্ত্রী কার্ল থামার সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রী বলে উঠল, ‘ধন্যবাদ, প্রযুক্তিমন্ত্রী মি. কার্ল।’ মন্ত্রীসভার সম্মানিত সদস্যবর্গ, আমাদের মহামান্য রাজার অনুমোদন সাপেক্ষে মি. কার্লের বক্তব্য থেকে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন’-এই তিনটি শব্দ এবং তার বক্তব্যের শেষ বাক্য মন্ত্রীসভার প্রসিডিং থেকে বাদ দেওয়া হলো
মন্ত্রীসভার প্রবীণ সদস্য অর্থমন্ত্রী থিয়োডোর উইলিয়ামের স্পিকার স্ট্যান্ডে নীল বাতি জ্বলে উঠলে সে উঠে দাঁড়াল। রাজা চতুর্থ হেরাল্ডকে বাউ করে মহামান্য রাজা ও প্রধানমন্ত্রীকে সম্বোধন করে বলল, ‘ধন্যবাদ প্রযুক্তিমন্ত্রী মি. কার্ল। অনেক সময় কঠিন সত্যকে হজম করা যায় না। আপনার কথা নিরেট কিছু সত্যকে মন্ত্রীসভার প্রসিডিং হজম করতে পারল না। তাতে কিছু এসে যায় না। আপনার কথা শুধু বায়ুমণ্ডলে নয়, আমাদের সকলের মনেও অমর হয়ে থাকবে।’
একটু থামল অর্থমন্ত্রী থিয়োডোর উইলিয়ামস। শুরু করলো আবার, ‘মহামান্য রাজা ও প্রধানমন্ত্রী, কর্নেল ওসামা আমাদের বিচারাধীন আসামি। তার বিচার কাজ শুরুও হয়েছে। কারো চাপ বা অনুরোধে কোনো অবস্থাতেই তাকে অন্যের হাতে তুলে দেয়া যায় না। তার ওপর কর্নেল ওসামার বিষয়টি একটা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। প্রায় ষাটটি মুসলিম দেশ এবং তাদের সংগঠন ওআইসি কর্নেল ওসামাসহ ভিক্টর আইল্যান্ডের লোকাল জনগণের মানবাধিকার ইস্যুটিকে জাতিসংঘের নজরে এনেছে। জাতিসংঘের যে মানবাধিকার টিম ভিক্টর আইল্যান্ড সফর করছে, তাদের প্রধান এজেন্ডা হলো আদিবাসী ও আরব বংশোদ্ভূত লোকরা কেমন আছে তা দেখা ও জানা। আমি শুনেছি, তারা চায় কর্নেল ওসামার বিচার কাজ পর্যবেক্ষণের জন্য লোক এখানে মোতায়েন রাখতে। এ অবস্থায় কর্নেল ওসামাকে আদালতে সোপর্দ করা ছাড়া অন্য কিছু করার সুযোগ আমাদের নেই। এ তো গেল একদিক, অন্যদিকে সোর্ন-এর সাথে বিরোধে জড়ানো আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য খুবই ক্ষতিকর হবে। তরুণ মন্ত্রী কার্ল তার বক্তব্যের শেষ বাক্যে যে কথা বলেছেন সে ব্যাপারটা আমরা অনেকেই জানি এবং আমি মনে করি সরকার আরও বেশি জানেন। এ অবস্থায় তাদের মাথায় তুললে আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিপদে পড়বে। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী মহোদয় যে কথা বলেছেন, সেই মধ্যবর্তী কোনো অবস্থানই আমাদের সৃষ্টি করতে হবে, যাতে দুই ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার পথ আমরা সৃষ্টি করতে পারি। অব দা রেকর্ড আমি বলতে চাই, সাগর সাইমুমের বিপদ সম্পর্কে আমরা জানি, সোন কি করছে, কি করবে- সে সম্পর্কে সরকারের কিছু জানা থাকলে মন্ত্রীসভাকে অবহিত করা দরকার। আমার আরো কিছু কথা আছে সেটা পরে বলব।’ থামলো অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী থামলে,স্বয়ং রাজা চতুর্থ হেরাল্ড কথা বলে উঠল। বলল, ‘অর্থমন্ত্রী অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। আমি চাই সোর্ন সম্পর্কে মন্ত্রীসভাকে অবিলম্বে ব্রিফ করা হোক। এজন্য মন্ত্রীসভার বৈঠক মন্ত্রীসভার বিশেষ সভাকক্ষে শিফট করা হলো। সবাই জানেন, বিশেষ স্ক্যানিং ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে সেই সভাকক্ষে প্রবেশ করতে হবে। কারো কাছে কোনো প্রকার ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস থাকতে পারবে না। সে মিটিংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্য, সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফ, তিন বাহিনীর প্রধান, গোয়েন্দা প্রধান এবং প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাও থাকবেন। এখন থেকে তিন ঘণ্টা পর সে বৈঠক শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী মহোদয় ব্যবস্থা করুন। প্রেসিডেন্ট হাউস ‘গোল্ড প্যালেস’- এর রয়্যাল ক্যান্টিনে লাঞ্চের জন্য সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
বলে রাজা চতুর্থ হেরাল্ড তার আসন থেকে উঠে দাঁড়াল।
উঠে দাঁড়াল মন্ত্রীসভার সবাই।
রাজা চতুর্থ হেরাল্ড সভাকক্ষ থেকে চলে গেলে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীসভার সদস্যদের লক্ষ্য করে বলল, ‘আপনারা ফ্রেশ হয়ে নিন। তারপর আমরা সবাই রয়্যাল ক্যান্টিনে যাব।’
সবাই বেরিয়ে এলো সভাকক্ষ থেকে।
.
রাজা চতুর্থ হেরাল্ডের সভাপতিত্বে মন্ত্রীসভা এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠক ঠিক তিন ঘণ্টা পরেই শুরু হলো। বৈঠকের শুরুতেই রাজার নির্দেশক্রমে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান সোর্ন ও সাগর সাইমুমের তৎপরতার উপর দীর্ঘ রিপোর্ট পেশ করল। শেষে দীর্ঘ রিপোর্টের একটা সারাংশ উপস্থাপন করল যাতে বলা হলো: ‘এক. সোর্ন যে জনশক্তি বাইরে থেকে ভিক্টর আইল্যান্ডে নিয়ে আসে, তার মধ্যে খুব বেশি হলেও বিশ শতাংশ বৈধ পথে নিয়ে আসে। শুধু এরাই ইমিগ্রান্ট হিসেবে রেজিস্ট্রেশন পায়। অবশিষ্টদের আশি শতাংশকেই নানা কৌশলে জনসাধারণের মধ্যে মিশিয়ে ফেলা হয়।
দুই. এখন বেশি লোক আসছে ইউক্রেন ও পূর্ব ইউরোপ থেকে। এদের প্রায় সকলেরই সামরিক ট্রেনিং আছে।
তিন. ভিক্টর আইল্যান্ডে অবৈধ মানুষের মতো অবৈধ অস্ত্রও ঢুকছে, যার মধ্যে হেভি অস্ত্রও শামিল আছে।
চার. প্রথমে সোর্ন-এর লোকরা সবার সাথে মিলেমিশে বিভিন্ন বাড়িতে বাস শুরু করে। ধীরে ধীরে তারা নিজেদের মধ্যে ঘাঁটি তৈরির দিকে মনোযোগ দেয়। শুরুর দিকে ওরা অনুমতি নিয়ে বা সরকারের জ্ঞাতসারেই এটা করত। কিন্তু এখন তারা অনুমতি নিয়ে একটা ঘাঁটি তৈরি করলে দশটা গোপনে করে থাকে। এখন তাদের বৈধ ঘাঁটির চেয়ে, অবৈধ ঘাঁটির সংখ্যা অনেক বেশি।
পাঁচ. এক সময় ইউক্রেন বিশ্ব শ্বেতাঙ্গ-নাজী জাতীয়তাবাদীদের ট্রেনিং ও আশ্রয় কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছে ভিক্টর আইল্যান্ড এক নতুন ইউক্রেনে পরিণত হতে যাচ্ছে। গোটা দুনিয়া থেকে শ্বেতাঙ্গ-নাজী জাতীয়তাবাদীদের এখানে এনে জড়ো করা হচ্ছে। তাদের সামরিক ট্রেনিংও দেয়া হচ্ছে। এ কথা বলা অমূলক হবে না যে, আমাদের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি আরেকটা সেনাবাহিনী গড়ে উঠছে। যুক্তি দেয়া হয় যে, এদের তৈরি করা হয় বিভিন্ন দেশের ব্যবহারের প্রয়োজনে। কিন্তু এদের কথায় আস্থা রাখার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। বরং অন্যান্য অনেক দেশে এদের ভূমিকা আমাদের নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কাকেই ঘণীভূত করে।
ছয়, শ্বেতাঙ্গ-নাজী জাতীয়তাবাদ শুধু আদর্শিকভাবে অসহনশীল নয়, এই আদর্শের ধারক লোকরাও অসহনশীল, চরমপন্থী এবং প্রতিষ্ঠিত আইন কানুনের ব্যাপারে বেপরোয়া। সম্প্রতি একজন সম্মানীয়া তরুণীকে অপহরণ প্রচেষ্টার ঘটনা ঘটে। সেটাকে প্রথমে তাৎক্ষণিকভাবে একটা সাধারণ ঘটনা বলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী অনুসন্ধানে দেখা গেছে এটা একটা পরিকল্পিত ঘটনা। বেশ আগে থেকেই তারা মেয়েটির উপর নজর রেখেছিল। সেদিন পরিকল্পিতভাবেই এই অপহরণ প্রচেষ্টার ঘটনার ঘটায়। কেউ যাতে বাধা না দেয়, এ ব্যাপারে সকলকেই আগাম সতর্ক করে দেয়া হয়েছিল। পুলিশ প্রহরীদেরও সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। মেয়েটিকে নিয়ে তোলার জন্য উপকূলে জাহাজও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। হঠাৎ কর্নেল ওসামার আগমনে ওদের গোটা পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে যায়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের যে সীমাহীন ঔদ্ধত্যের প্রকাশ ঘটেছে এবং ভিক্টর আইল্যান্ডের সরকারের মর্যাদার প্রতি তারা যে আঘাত করেছে তা কোনো স্বাধীন দেশ ও স্বাধীন জাতিরই সহ্য করার মতো না।
সাত. ভিক্টর আইল্যান্ডের জন্য সোর্ন অত্যন্ত সেনসেটিভ বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ওরা যেমন আমাদের সহ্যের সীমা অতিক্রম করছে, তেমনি তাদের সাথে আমাদের কোনো প্রকার বৈরিতা আমাদের জন্য এবং আমাদের ভিক্টর আইল্যান্ডের জন্য লজ্জাজনক হবে।
অন্যদিকে সাগর সাইমুম বিঘোষিতভাবে আমাদের অস্তিত্বের শত্রু। তারা আমাদেরকে ভিক্টর আইল্যান্ড থেকে তাড়াতে চায়। আমাদের ভিক্টর আইল্যান্ডকে তারা চায় আবার তাদের সুবর্ণদ্বীপে পরিণত করতে। আমাদের রাজধানী গোল্ড সিটিকে তারা বানাতে চায় আগের সেই সুবর্ণ নগরী। আমাদের সরকারকে তাড়িয়ে তারা প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাদের সরকার। তবে এই ব্যাপারে তাদের শক্তি ও প্রস্তুতি উভয়ই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সাগর সাইমুম কোনো সুগঠিত সুসজ্জিত বাহিনী নয়। সাগর সাইমুমের লোকরা বিভিন্ন কাজে, বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। এতে করে তাদের অস্ত্রের ট্রেনিং এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের। কর্নেল ওসামার পিতা সাগর সাইমুমের প্রতিষ্ঠাতা। তবে সাগর সাইমুমকে প্রফেশনাল বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ খুব অল্পই হয়েছে। কর্নেল ওসামার আগে অভিজ্ঞ কোনো নেতৃত্ব সাগর সাইমুম পায়নি। এই অভাব পূরণের জন্য কর্নেল ওসামাকে সেনাবাহি নী থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কর্নেল ওসামা সাগর সাইমুমকে সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছিলেন। তবে সাগর সাইমুমের লোকদের লড়াইয়ের প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার চাইতে তাদের আন্তরিকতা ও আবেগ অনেক বেশি। তাদের বড় সুবিধা হলো তারা জনগণের মধ্যে থেকে কাজ করে এবং তাদের আছে জনসমর্থন। বড় বাহিনী হিসেবে গড়ে ওঠার সুবিধা ও সম্ভাবনা দুই তাদের আছে। তার আগেই আমাদের যা করার তা করতে হবে।
গোয়েন্দা বাহিনীর পক্ষ থেকে ব্রিফিং শেষ হলো।
‘ধন্যবাদ গোয়েন্দা প্রধান ব্রিগেডিয়ার ডেস্টিন।’
বলে একটু থামল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড। সবার দিকে চোখ ফিরাল। বলল, ‘আমি মনে করি আলোচনার বিষয় সবার কাছে পরিষ্কার হয়েছে। এরা আগে কখনো আমরা এত বড় সমস্যায় পড়িনি। প্রত্যেক সমস্যার পাশে তার সমাধানও থাকে। সেই সমাধান আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। আমি থেকে শুরু করে আমাদের সবার এ বিষয়ে নিজস্ব চিন্তা আছে। সেই চিন্তাগুলো সামনে আসলে আমাদের সমস্যার সমাধানও এসে যাবে। এখন ফ্লোর আপনাদের।’ থামল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
উঠে দাঁড়াল সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল জোহান জোনস। রাজা চতুর্থ হেরাল্ডকে একটা লম্বা বাউ করে বলল, ‘আমাদের সামনে দুই বিপদ। একটা ষড়যন্ত্র, অন্যটা শত্রুতা। ষড়যন্ত্র করছে সোর্ন, শত্রুতার মুখোমুখি আমরা সাগর সাইমুমের। একসাথে আমরা দুই পক্ষের সাথে লড়াই করতে চাই না। আমাদের লড়াই প্রথমে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে নয়, লড়াই আমাদের প্রথমে শত্রুর শত্রুতার বিরুদ্ধে। সোর্নকে আপাতত ঠান্ডা রেখে ডান্ডা মারতে হবে সাগর সাইমুমের উপর। আমি মনে করি সোর্ন-এর আল্টিমেটামের সময়সীমার মধ্যে কর্নেল ভিক্টর ম্যাথিয়ান ওরফে কর্নেল ওবায়দুল্লাহকে সোর্ন-এর হাতে তুলে দেওয়া উচিত। এতে আমাদের দুটি লাভ। এক. সাগর সাইমুম নেতা হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়বে। তখন সেই দুর্বল সাগর সাইমুমকে শেষ করে দেয়া আমাদের জন্য সহজ হবে। দুই. কর্নেল ভিক্টর ম্যাথিয়ান অর্থাৎ কর্নেল ওসামাকে আমাদের নিজ হাতে কিছু করা বা বিচার পরিচালনার ঝামেলা থেকে আমরা বেঁচে যাব। আপাতত আমার সংক্ষিপ্ত কথা এটুকুই। সবাইকে ধন্যবাদ।’
কথা শেষ হলে জেনারেল জোহান জোনাস উঠে দাঁড়িয়ে রাজা চতুর্থ হেরাল্ডকে আবার একটা বাউ করে বসে পড়ল।
অর্থমন্ত্রী থিয়োডোর উইলিয়ামের স্পিকার স্ট্যান্ডের নীল বাতি জ্বলে উঠেছে। অর্থমন্ত্রী দাঁড়িয়ে রাজা চতুর্থ হেরাল্ডকে বাউ করে বসে পড়ল। বসে কথা শুরু করল। বলল, ‘মহামান্য রাজা চতুর্থ হেরাল্ড, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীসভা ও জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সম্মানিত সদস্যবর্গ, আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল জোহান জোনাস তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সমস্যার যে সমাধান দিয়েছেন তা অবশ্যই ভেবে দেখার মতো। তার কথা শুনতে শুনতে আমি আমাদের পুলিশ স্কোয়ার্ডের উপর সন্ত্রাসী হামলার যে খবর প্রকাশ হয়েছিল- তা আবার পড়লাম। তাতে সন্ত্রাসীরা তাদের নেতা কর্নেল ওসামাকে ছিনিয়ে নিয়েছিল, একথা যেমন নেই, তেমনি ছিনিয়ে নেয়নি, সেকথাও নেই। তবে সন্ত্রাসীরা পুলিশ ফোর্সকে পরাভূত করেছিল, একথা আছে। পুলিশকে পরাভূত করার অর্থ সন্ত্রাসীরা তাদের নেতা কর্নেল ওসামাকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। এ কথা যৌক্তিকভাবেই প্রতিপন্ন হয়। এর অর্থ কর্নেল ওসামা এখন আমাদের হাতে নেই। তাই তার কোনো দায়ও আমাদের ঘাড়ে নেই।
একটা কথা উঠতে পারে- সেনা ইউনিটের পাল্টা আক্রমণ তো সন্ত্রাসীদের পরাভূত করেছিল এবং পরাভূত সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে কর্নেল ওসামাকে উদ্ধারও করেছিল। এর জবাব হলো, সন্ত্রাসীদের পরাভূত করার অর্থ কর্নেল ওসামাকে উদ্ধার করা নয়। উনপঞ্চাশজন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছিল, কিন্তু এই উনপঞ্চাশজনই যে সন্ত্রাসীদের মোট সংখ্যা-এ কথা নিউজের কোথাও বলা হয়নি। অতএব ঘটনা এটাই হতে পারে যে, উনপঞ্চাশজন সাথীকে প্রতিরোধের জন্যে রেখে অবশিষ্টরা তাদের নেতা কর্নেল ওসামাতে নিয়ে পালিয়েছে। সুতরাং এ কথা আমরা বলতে পারি যে, কর্নেল ওসামা আমাদের হাতে নেই। অতএব কর্নেল ওসামাকে সোর্ন-এর হাতে তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোনো সমস্যা আমি দেখছি না। বরং লাভ আমাদের এই হবে যে, আমরা সোর্ন-এর সাথে আশু সংঘাত থেকে বাঁচব এবং ওদের ষড়যন্ত্র মোকাবিলার জন্য মূল্যবান সময় আমরা হাতে পাব।’ অর্থমন্ত্রীর কথা শেষ হলো।
এবার কথা বলল মন্ত্রীসভার তরুণ সেই সদস্য কার্ল। সে মহামান্য রাজাকে বাউ করে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল জোহান জোনস এবং অর্থমন্ত্রী থিয়োডোর উইলিয়ামসকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘তারা সমস্যা সমাধানের যে পথ দেখিয়েছেন তা অমানবিক হলেও অযৌক্তিক নয়। আমাদের সামনে যদি সমস্যা সমাধানের আর কোনো পথ খোলা না থাকে, তাহলে এই পথই গ্রহণ করতে হবে। তবে এই পথ গ্রহণ করা হবে কি হবে না, তা নির্ভর করছে কর্নেল ওসামা যে প্রকৃতই আমাদের কাছে সেটা প্রকাশ হয়ে পড়েছে কিনা বা আগামীতে প্রকাশ হয়ে পড়বে কিনা তার উপর। কারণ তিনি যে আমাদের জুডিশিয়াল কাস্টডিতে আছেন সেটা সংশ্লিষ্ট পুলিশরা এবং কাস্টডির সাথে জড়িত ব্যক্তিরা জানেন। সুতরাং বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়ার একটা আশঙ্কা আছে। যদি প্রকাশ হয়ে পড়ে বা প্রকাশ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে কর্নেল ওসামাকে সোর্ন-এর হাতে দেয়া যাবে না। কারণ তাতে আমরা বিপদে পড়ব। মানবাধিকার ও ন্যায় বিচার নিয়ে যে হইচই পড়বে তার মোকাবিলা আমরা করতে পারব না। মুসলিম দেশগুলোর সম্মিলিত শক্তিকে ছোট করে দেখা ঠিক হবে না। সেক্ষেত্রে আমরা বিকল্প তালাশ করতে পারি। একটা বিকল্প হলো, চব্বিশ ঘণ্টার আল্টিমেটাম বিষয়ে আমরা সোর্ন-কে বলতে পারি, জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাসমূহ এবং মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়া এড়াবার জন্যে বিচারাধীন আসামি কর্নেল ওসামাকে কিভাবে কোন পন্থায় আমরা সোর্ন-এর হাতে তুলে দিতে পারি, এ নিয়ে ভাববার এবং পথ বের করার জন্যে আমাদের সময় প্রয়োজন। সময় পেলে আমরা ভেবে দেখব, সোর্ন-এর হাতে কর্নেল ওসামাকে তুলে দেবার কোনো নিরাপদ পন্থা বের করা যায় কিনা। বের না হলে বিচারকের কাঁধে বন্দুক রেখে কর্নেল ওসামাকে আমরাই ফায়ার করতে পারি।’ কথা শেষ করল মি. কার্ল।
সভাকক্ষে নেমে এলো নীরবতা।
মন্ত্রীসভার সদস্য বা নিরাপত্তা কাউন্সিল সদস্য কারো স্ট্যান্ডে নীল বাতি জ্বলল না। কেউ কথা বলল না।
প্রধানমন্ত্রী তাকাল রাজা চতুর্থ হেরাল্ডের দিকে।
রাজা চতুর্থ হেরাল্ড তার সিংহাসন সদৃশ চেয়ারের একটু সামনে ঝুঁকে বলল, ‘মন্ত্রীসভা ও নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যবর্গ, আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি জেনারেল জোহান জোনাস এবং অর্থমন্ত্রী থিয়োডোর উইলিয়ামসকে একটি সহজ ও সুন্দর সমাধান পেশ করার জন্যে। আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি মন্ত্রীসভার তরুণ সদস্য কার্লকে। তিনি প্রথম প্রস্তাব অমানবিক মনে করলেও শর্ত সাপেক্ষে তা মেনে নিয়েছেন। তারপর তিনি সমস্যার একটা বিকল্প সমাধান পেশ করছেন। আর কারো যদি- নতুন প্রস্তাব না থাকে, তাহলে উপস্থাপিত দুটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে পারি।’ রাজা চতুর্থ হেরাল্ড থামলেন।
সভাকক্ষে নীরবতা নামল আবার।
প্রধানমন্ত্রী উঠে দাঁড়িয়ে রাজা চতুর্থ হৈরাল্ডকে বাউ করে বলল, ‘মহামান্য রাজা চতুর্থ হেরাল্ড, আমার মনে হয় নতুন প্রস্তাব কারো কাছে নেই। আমরা উপস্থাপিত দুটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু করতে পারি।’
রাজা চতুর্থ হেরাল্ড প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘মন্ত্রীসভা ও নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রিয় সদস্যবৃন্দ, প্রথম প্রস্তাব ও দ্বিতীয় প্রস্তাব এক সাথে হতে পারে। দুটির মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে। তার আগে আমি বলব, মন্ত্রীসভার সদস্য মি. কার্ল বলেছেন, কর্নেল ওসামা আমাদের কাছে আছে একথা সংশ্লিষ্ট পুলিশ বা জুডিশিয়াল কাস্টডির সাথে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে বাইরে গেছে বা যেতে পারে, এ বিষয়ে কিছু বলার থাকলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলুন। বিষয়টি খুবই সেনসেটিভ। কর্নেল ওসামা আমাদের হাতে আছে, এই খবরটা বাইরে গেলে সিদ্ধান্ত এক রকম হবে, না গেলে সিদ্ধান্ত আরেক রকম হতে পারে। বলুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মি. সেবাস্টিন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেবাস্টিন রালফ উঠে দাঁড়াল। রাজা চতুর্থ হেরাল্ডকে বাউ করে বলল, ‘মহামান্য রাজা চতুর্থ হেরাল্ড ও প্রধানমন্ত্রী মহোদয় মন্ত্রীসভা ও নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্যবর্গ, তালিয়া উপত্যকার তালিয়া নদীর তালিয়া ব্রীজে কর্নেল ওসামাকে বহনকারী আমাদের স্কোয়ার্ড আক্রান্ত হওয়া এবং সেনা ইউনিটের সাহায্যে রেসক্যু হওয়ার পর তারা চলে না এসে পুলিশ স্কোয়ার্ড ও সেনা ইউনিটের সাথে পরামর্শ করে স্ব স্ব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে করণীয় সম্পর্কে ব্রিফিং চেয়ে পাঠায়। কর্তৃপক্ষ ৪৯জন সাগর সাইমুমের সন্ত্রাসী নিহত হওয়া এবং নিহতদের মধ্যে সোর্ন-এর হের রুডিগার থাকার ঘটনা জানতে পেরে উভয় পক্ষ মতবিনিময় করেই সরকারকে বিষয়টি অবহিত করে। সরকার থেকে তিনটি বিষয় জানিয়ে দেয়া হয়: এক. হের রুডিগার সম্পর্কে কোনো কিছুই প্রকাশ করা যাবে না। দুই. পুলিশ স্কোয়ার্ডই কর্নেল ওসামাকে রাজধানীতে নিয়ে আসছে, এ বিষয়টি হের রুডিগার এবং সোর্ন-এর সবাই আগেই জানত, এ কথাও প্রকাশ হয়ে গিয়েছে। তাই এ বিষয়টি প্রকাশ করা যাবে। এ ছাড়া তার সম্পর্কে আর কোনো কথাই বলা যাবে না। পুলিশ কিংবা সেনা সদস্যের কেউ-ই তালিয়া উপত্যকার ঘটনা সম্পর্কে সাংবাদিক কিংবা কারো কাছেই কোনো কথা বলতে পারবে না। জুডিশিয়াল কাস্টডির সবাইকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে, কর্নেল ওসামা সম্পর্কে কোনো কথাই বাইরে বলা যাবে না। সুতরাং আমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারি যে, কর্নেল ওসামার বিষয়টি বাইরে প্রচারিত হয়নি এবং হবেও না।’ থামল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এবার উঠে দাঁড়াল পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বলল, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। তারা তাৎক্ষণিকভাবে যে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেজন্যেও তাদের ধন্যবাদ। আমরা প্রথম প্রস্তাবটা তাহলে দ্বিধাহীনভাবে গ্রহণ করতে পারি। তবে আমার একটা প্রশ্ন, কর্নেল ওসামা যে আমাদের কাছে আছে, একথা সোর্ন জানতে পারল কি করে?’
‘কর্নেল ওসামাকে যখন জুডিশিয়াল কাস্টডিতে নেয়া হয়, তখন সেখানে সোর্ন-এর দায়িত্বশীল হাজির ছিল আগে থেকেই। তিনি সেখানে ইচ্ছা করেই এসেছিলেন, না ব্যাপারটা কাকতালীয় ছিল তা আমরা জানি না। তবে হের রুডিগারের নেতৃত্বে কর্নেল ওসামাকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য সন্ত্রাসীদের যে অভিযান তা সোর্ন-এর সিদ্ধান্তেই হয়েছিল। তাই জুডিশিয়াল কাস্টডিতে সোর্ন-এর দায়িত্বশীলের উপস্থিতিও উদ্দেশ্যমূলক হতে পারে।’ বলল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
‘সে উদ্দেশ্য কি হতে পারে?’ প্রশ্ন মন্ত্রীসভার একজন সদস্যের। বলল, ‘একটা বিষয় আমি বুঝতে পারছি না। সোর্ন-এর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হের রুডিগারের ব্যাপারটা তারা চেপে গেল কেন?’
প্রশ্নটির উত্তর দিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বলল, ‘কারণ এক হতে পারে যে, বিষয়টি জানাজানি হলে কিংবা এ নিয়ে হৈ চৈ হলে তারা ঘরে বাইরে সবখানে বেকায়দায় পড়তে পারে। দ্বিতীয় কারণ এই হতে পারে যে, তারা মনে করতে পারে আমরা হের রুডিগারের লাশ পাইনি, খরস্রোতা নদী তালিয়ার পানি লাশটিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। কারণ যাই হোক তারা বিষয়টি না তোলায় আমরা বড় একটা ঝামেলা থেকে বেঁচে গেছি। অন্যদিকে রুডিগারের লাশ না পাওয়ায় সোর্ন কি করতে পারে, কতদূর যেতে পারে সেটা আমাদের কাছে হাতে-নাতে ধরা পড়েছে। থামল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
‘প্রধানমন্ত্রী মি. ফ্রেডারিক ফার্ডিন্যান্ড আপনি আলোচনাকে উপসংহার করে একটা সিদ্ধান্তে নিয়ে আসুন।’ বলল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
‘মহামান্য রাজা চতুর্থ হেরাল্ড এবং মন্ত্রীসভা ও নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্যবর্গ, গুরুত্বপূর্ণ আজকের আলোচনায় দুটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। গোটা হাউজের মত এই দুই প্রস্তাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে প্রথম প্রস্তাবের পক্ষেই যুক্তি বেশি এসেছে। এমনকি প্রথম প্রস্তাবের ক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন তুলে বিকল্প হিসেবে দ্বিতীয় প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক হলে প্রথম প্রস্তাব মেনে নিতে দ্বিতীয় প্রস্তাব উত্থাপনকারীর আপত্তি নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্নটির যে উত্তর দিয়েছেন তা প্রথম প্রস্তাবের পক্ষে ইতিবাচক। এই দিক থেকে প্রথম প্রস্তাবটি হাউজের সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের সরকারের মর্যাদা, বাস্তবতা এবং সার্বিক বিবেচনাকে সামনে রেখে আমি মনে করি প্রথম প্রস্তাবের সাথে দ্বিতীয় প্রস্তাব মিলিয়ে অধিকতর যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারি। প্রথম প্রস্তাবের গোটাটাই গ্রহণ করা হবে আল্টিমেটামের সময়সীমার মধ্যে কর্নেল ওসামাকে সোর্ন-এর হাতে তুলে দেয়ার বিষয়টি ছাড়া। দ্বিতীয় প্রস্তাবে সময় নেয়ার যে কথা বলা হয়েছে, সেটা গ্রহণ করা যুক্তিসংগত এবং আমাদের জন্যে মর্যাদার হবে। একটা রাষ্ট্রের একজন বিচারাধীন আসামিকে আইন ও বিচারকে পদদলিত করে অন্য কারো হাতে তুলে দেয়া আমাদের জন্যে সম্মানজনক হবে না। আমরা সোর্নকে বলতে পারি, আমরা কর্নেল ওসামাকে তাদের হাতে দেব, কিন্তু সেটা কিছুটা অন্যভাবে। বিচারাধীন আসামিকে কি অন্যের হাতে তুলে দেয়ার কোনো বিধান আছে? শীঘ্রই আমরা আদালতের মাধ্যমে তাকে বেল দিয়ে দিব। বিচারালয়ের গেট থেকে সোর্ন তাকে তুলে নিয়ে যাবে। গেটে পৌঁছার আগে সে যাতে কোনোভাবে পালিয়ে যেতে না পারে, সেটা আমরা নিশ্চিত করব।’ থামল প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডারিক ফার্ডিনান্ড।
থেমেই আবার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘আমাদের সকলের প্রিয় মহামান্য রাজা চতুর্থ হেরাল্ড, সবার কথা শুনে আমার যা মনে হয়েছে, আমি যা চিন্তা করেছি সেটা আমি পেশ করলাম। রাজা চতুর্থ হেরাল্ডকে একটা লম্বা বাউ করে বসে পড়ল প্রধানমন্ত্রী ফার্ডিনান্ড।
রাজা চতুর্থ হেরাল্ড পুরো হাউজের উপর একবার চোখ ঘুরিয়ে বলল, ‘প্রধানমন্ত্রী মহোদয়কে ধন্যবাদ। আমিও এ রকমটাই চিন্তা করেছিলাম। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আমাদের সকলের মধ্যে তিনি চিন্তার ঐক্য এনে দিয়েছেন। এখন মন্ত্রীসভা ও জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্যবর্গ বলুন, আর কিছু কি বলার আছে কারো?’
গোটা হাউসের সবাই একসাথে হাততালি দিয়ে রাজা চতুর্থ হেরাল্ড ও প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাল।
রাজা চতুর্থ হেরাল্ড হাউজের সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘প্রধানমন্ত্রী মি. ফার্ডিনান্ড যে সমন্বয়মূলক উপস্থাপন করেছেন, সেটা আমাদের সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রেরও সিদ্ধান্ত। যার সারাংশ হলো:
এক. রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা কর্নেল ওসামাকে সোর্ন-এর হাতে তুলে দেব।
দুই. সোর্ন-এর আল্টিমেটামের সময়সীমার মধ্যে কর্নেল ওসামাকে তাদের হাতে তুলে দিব না।
তিন. কর্নেল ওসামাকে আদালত থেকে বেল করিয়ে আমরা তাকে ছেড়ে দেব এবং সোর্ন তাকে নিয়ে যাবে।’ রাজা চতুর্থ হেরাল্ড কথা শেষ করল।
সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে রাজা চতুর্থ হেরাল্ডের অনুমতি নিয়ে সভা শেষ করল প্রধানমন্ত্রী।
সবার শুভ কামনা করে রাজা চতুর্থ হেরাল্ড বিশেষ দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল সভাকক্ষ থেকে।
সবাই উঠে দাঁড়িয়েছিল।
সবার চোখে-মুখে স্বস্তি।
সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল সবাই।
শান্তির দ্বীপে সংঘাত – ৬
৬
প্রিন্সেস এলিজাবেথ আন্না স্বামীর ঘরে ঢুকে দেখল তার স্বামী বেড সাইড সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসে আছে। দুহাত দুদিকে ছড়ানো। মুখে-চোখে কিছুটা উদাস বিষণ্ণ ভাব।
প্রিন্সেস এলিজাবেথ আন্না গিয়ে স্বামীর পাশে বসল।
ডান হাতটা সে স্বামীর মাথার চুলে ঢুকিয়ে কিছুটা সমবেদনার সুরে বলল, ‘কিছু ঘটেছে নাকি? তোমাকে বেশ উদাস, বিষণ্ণ দেখাচ্ছে।’
প্রিন্সেস এলিজাবেথ আন্নার স্বামী রাজা প্রিন্স অগাস্টাস ফেয়ারহেয়ার স্ত্রীর কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসল। মুখে হাসি টেনে বলল, ‘কি বল আন্না? আমাকে কি সে রকম লাগছে? কিছু ঘটেনি তো?’
রাজা প্রিন্স অগাস্টাস হেরাল্ড ফেয়ারহেয়ার সবার কাছে রাজা চতুর্থ হেরাল্ড হিসেবে খ্যাত।
তার প্রপিতামহ হেরাল্ড ফেয়ারহেয়ার নরওয়ের প্রথম স্বাধীন রাজা ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় হেরাল্ড নাম নিয়ে সিংহাসনে বসেন। আর রাজা ফ্রেডারিক অগাস্টাস সম্ভবত ছিলেন প্রথম হেরাল্ড। তিনি নরওয়ের অলডেন বার্গের একজন প্রতাপশালী ব্যক্তি ছিলেন।
স্বামীর কথা শুনে রানী প্রিন্সেস এলিজাবেথ আন্না মুখ ভার করে বলল, ‘তোমাকে তো নতুন দেখছি না। তোমাকে দেখেই, এমনকি কথা শুনে বুঝতে পারি তুমি কেমন আছ। আমি নিশ্চিত, তুমি কিছু লুকাচ্ছো আমার কাছে।’
রাজা চতুর্থ হেরাল্ডের মুখে গাম্ভীর্য নেমে এলো। সে আবার সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসল। অনেকটা স্বাগত কন্ঠে বলল, ‘রাজ্যে তো সমস্যা থাকবেই। আমরা একটা বড় সমস্যায় পড়েছি, সেটা তো তুমিও জান।’
‘কোনটা? কোন ঘটনা?’ বলল রানী এলিজাবেথ আন্না।
কর্নেল ওসামাকে নিয়ে ঘটনাটা।’ চতুর্থ হেরাল্ড বলল।
‘হ্যাঁ, সেটা তো জানি। এখন তো সে জুডিশিয়াল কাস্টডিতে। খুবই ভালো হয়েছে ওদের হাত থেকে তাকে জুডিশিয়াল কাস্টডিতে এনে। সবাই আমরা যেটা চেয়েছি, সেটাই হয়েছে। এখন আবার কি সমস্যা হলো?’ বলল রানী এলিজাবেথ আন্না।
বড় সমস্যা ভিক্টর আইল্যান্ডে সোর্ন-এর দুই নম্বর নেতা হের রুডিগার সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছে, এটাও তুমি জানো। কিন্তু হের রুডিগার যে সেখানে নিহত হয়েছে এবং কার হাতে সে নিহত হয়েছে, একথা তারা বলতে পারছে না। অন্যভাবে তারা এর প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে। সোর্ন আল্টিমেটাম দিয়েছে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কর্নেল ওসামাকে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। এটাই বড় সমস্যা।’ রাজা চতুর্থ হেরাল্ড বলল।
‘এই আল্টিমেটাম এর অর্থ কি? কর্নেল ওসামার কি দোষ? তোমরা তাহলে এখন কি ভাবছ?’ বলল রানী এলিজাবেথ আন্না।
‘কর্নেল ওসামাকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে নয়। আইন অনুসারে আদালত থেকে কর্নেল ওসামার বেল নিয়ে আমরা তাকে ছেড়ে দেব। সোর্ন তাকে ধরে নিয়ে যাবে।’ রাজা চতুর্থ হেরাল্ড বলল।
‘কি সর্বনাশ! বল কি তুমি! তোমরা এটা করতে পারো না, একটা রাষ্ট্র এটা করতে পারে না। একজন বিচারাধীন আসামিকে হত্যা নির্যাতন করার জন্য সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেয়া যায় না।’
‘আমরা এটা করতে চাইনি আন্না। কিন্তু পরিস্থিতি আমাদের বাধ্য করেছে।’ বলে রাজা চতুর্থ হেরাল্ড মন্ত্রীসভা ও জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল কেন, কিভাবে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে তা সংক্ষেপে তুলে ধরে বলল, ‘সোর্ন-এর সাথে এখন বিরোধ বাধাতে আমরা কেউ চাইনি, তাই আমাদের উপায় ছিল না কর্নেল ওসামাকে ওদের হাতে তুলে না দিয়ে।’
রানী এলিজাবেথ আন্নার চোখ মুখ ভারী হয়ে উঠেছিল। বলল, ‘তোমরা নিজেদের এবং রাষ্ট্রস্বার্থের অস্ত্র দিয়ে মানবতাকে কুরবানি দিয়েছ। ওসামা ছেলেটাকে আমি দেখিনি, চিনি না, জানিও না। কিন্তু সে নিজের জীবন বিপন্ন করে আমার মেয়ের সম্মান ও জীবন বাঁচিয়েছে। আমরা বিনিময়ে তাকে কি দিলাম। আমরা…।’
রানী এলিজাবেথ আন্নার কথা আর এগোতে পারলো না। কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল তার কন্ঠ
রাজা চতুর্থ হেরাল্ড রানী এলিজাবেথের একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, ‘আমিও কষ্ট পেয়েছি আন্না। কিন্তু আমাদের কষ্ট এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজন এক নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে রাজা-রানী হিসেবে বা প্রেসিডেন্ট বা প্রেসিডেন্ট পত্নী হিসেবে রাষ্ট্রের প্রয়োজনকেই আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।
রানী এলিজাবেথ কিছু বলতে যাচ্ছিল। এ সময় ইন্টারকমে তাদের মেয়ে ইভা হেরাল্ডের কথা শোনা গেল।
এলিজাবেথ আন্না ইন্টারকমে অন করে বলল, ‘বল মা।’
বাবা তো আছেন মা, আমি আসছি।’ বলল ইভা হেরাল্ড।
‘ওয়েলকাম। এসো মা।’ বলল রানী এলিজাবেথ আন্না।
ইন্টারকম অফ হয়ে গেল।
ফিরে এসে স্বামীর পাশে না বসে পাশের সোফায় গিয়ে বসল। বলল স্বামীকে লক্ষ্য করে, ‘তোমার মেয়ে আসছে।’
‘‘এ সময় তো তার বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার কথা।’ বলল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
‘আজ একটু আগেই ফিরেছে। দুই ভাই বোন একসাথেই এসেছে।’ রানী এলিজাবেথ আন্না বলল।
ইভা হেরাল্ড এসে গেছে।
দরজা নক করে বলল, ‘আমি ইভা, আসতে পারি বাবা?’ ইভার মা রানী এলিজাবেথ আন্না উঠে গিয়ে নব ঘুরিয়ে দরজা খুলে বলল, ‘এসো মা।’
ইভা তার মায়ের সাথে প্রবেশ করল ঘরে।
পরনে তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পোশাক।
শ্বেতাঙ্গ হলেও তার গায়ের রংটা কাশফুল সাদা নয়, হালকা গোলাপি। হাজারো মেয়ের মধ্যে চোখে পড়ার মতো সে। কিন্তু আজ তার মুখটা মেঘ ঢাকা রোদের মতো, বিষণ্নতায় ভরা।
বাবাকে ‘গুড ইভনিং’ বলে মাকে জড়িয়ে ধরে হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু তার হাসিটা বেদনায় ম্লান হয়ে গেল।
‘মা ইভা, কি ব্যাপার! বিশ্ববিদ্যালয়ের পোশাক পাল্টাওনি? মনে হচ্ছে ফ্রেশও হওনি। অসুখ করেনি তো?’ বলল বাবা চতুর্থ হেরাল্ড। তার চোখে মুখে কিছুটা উদ্বেগ।
‘না বাবা, শরীর ভালো আছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে মনটা খারাপ হয়ে গেছে বাবা।’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘কি ব্যাপার? কি হয়েছে বলত?’ বলল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
ইভা হেরাল্ড একটুক্ষণ চুপ থাকল। বলল, ‘বাবা, তোমরা নাকি কর্নেল ওসামাকে সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দিচ্ছ?’
‘তুমি কোথায় শুনলে?’ বলল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
‘বাবা, তুমি এ রাষ্ট্রের প্রধান। আমি তোমার মেয়ে। তোমাদের মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত জানা আমার পক্ষে কি অসম্ভব?’ ইভা হেরাল্ড বলল।
সাথে সাথেই আবার শুরু করল ইভা হেরাল্ড ‘বাবা, তুমি কি জানো না, তোমার মন্ত্রীসভার সদস্যরা কি জানে না সোর্ন-এর সন্ত্রাসীরা কি করেছে, আর কর্নেল ওসামা কি করেছে? কি করে তারা পারল সেই সোর্ন-এর সন্ত্রাসীদের হাতে কর্নেল ওসামাকে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে!’ ইভা হেরাল্ড বলল। তার কণ্ঠ কান্নায় ভারি।
‘মা ইভা, তুমি যা বললে মন্ত্রীসভায় সে বিষয়টিও বিবেচনায় আনা হয়েছে। সবাই সোর্ন-এর লোকদের সন্ত্রাস ও আইন অমান্যকারী কাজ সম্পর্কে একমত এবং কর্নেল ওসামার প্রশংসনীয় কাজ সম্পর্কে কারো দ্বিমত নেই। কিন্তু এরপরও তাদের আল্টিমেটাম অনুসারে কর্নেল ওসামাকে তাদের হাত তুলে না দিয়ে উপায় ছিল না। তবে আল্টিমেটামের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তাকে ওদের হাতে তুলে দিচ্ছি না এবং আমরা সরাসরি তাকে তাদের হাতে তুলেও দেব না। আদালত থেকে বেল নিয়ে কর্নেল ওসামাকে ছেড়ে দেয়া হবে। তারপর তাকে ধরে নিয়ে যাবার দায়িত্ব সোর্ন-এর। আমরা এতটুকুই করতে পেরেছি মা।’ বলল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
‘বাবা, তোমরা একটা রাষ্ট্র, সন্ত্রাসী সোর্নের কাছে এতটা অসহায়?’ কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল ইভা হেরাল্ড।
‘মা, সোর্ন একটা বিশ্বজোড়া নাজী বর্ণবাদী সংগঠন। ওদের জনবল, অস্ত্রবলের কাছে আমাদের মতো ক্ষুদ্র রাষ্ট্র কিছুই নয়। তার উপর তারা ইউক্রেন থেকে উৎখাত হবার পর বিশ্বের কয়েক স্থানে জড়ো হবার পরিকল্পনা নিয়েছে। তার মধ্যে আমাদের ভিক্টর আইল্যান্ড একটি। যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ওদের হাতে বিসর্জন দিতে হবে। এটা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু এই মুহূর্তে ওদের সাথে সংঘাতে গেলে আমরা পারব না। এজন্যে আমাদের সময় প্রয়োজন। এই সময় নেবার জন্যেই আমরা ওদের দাবি মেনে নিয়ে ওদের সাথে বিরোধ মিটাতে চেয়েছি।’ বলল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
‘এটা করে কি শেষ রক্ষা হবে বাবা। যেখানে রাষ্ট্রকে ওরা দুর্বল পায়, সেখানেই তারা রাষ্ট্রের মাথায় চেপে বসে। ইউক্রেনে প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত ওদের লোক ছিল। ওদের হাত থেকে বাঁচতে হলে শক্তি বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা লাভের কোনো বিকল্প নেই। সবার আগে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি প্রয়োজন। বাবা, ভিক্টর আইল্যান্ডের লক্ষ লক্ষ মানুষ তোমাদের শক্তির উৎস হতে পারে। কিন্তু…।’
ইভা হেরাল্ডের কথার মাঝখানেই তার পিতা চতুর্থ হেরাল্ড বলে উঠল, ‘কিন্তু ওরা তো আমাদের এক নম্বর শত্রু।
‘ওদের রাজ্য আমরা দখল করেছি। ওরা শত্রু হওয়া তো স্বাভাবিক। এখন কর্নেল ওসামাকে নিয়ে তোমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছ, তাতে শত্রুতা তো আরো বহুগুণ বাড়বে।’ বলল ইভা হেরাল্ড।
বললাম তো মা, এ সিদ্ধান্ত নেয়া ছাড়া আমাদের কোনো উপায় ছিল না। এখন যা করণীয়, সেটা হলো সোর্ন-এর সাহায্যে প্রথমে আমাদের স্থানীয় শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। স্থানীয় শত্রুদের পথ থেকে সরানোর পর আমরা সোর্নকে দ্বীপ থেকে তাড়াব।’ রাজা চতুর্থ হেরাল্ড বলল।
‘স্যরি বাবা, তোমরা উল্টাপথে চলছ। স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে আপোষ করলে তোমরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিরাট শক্তি পেয়ে যেতে এবং সহজে সোর্ন-এর সন্ত্রাসীদের তাড়াতে পারতে।’ বলল ইভা হেরাল্ড।
হাসল চতুর্থ হেরাল্ড। বলল, ‘মা, তুমি একজন অভিজ্ঞ স্ট্র্যাটেজিস্ট-এর মতো কথা বলেছ। এটা হলে খুশি হতাম, কিন্তু এটা হবার নয়।’
‘যিনি এটা সম্ভব করতে পারতেন তাকেই তোমরা শেষ করে দিচ্ছ বাবা।’ কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে বলল ইভা হেরাল্ড।
‘দুঃখিত মা, তাকে রক্ষার কোনো উপায় নেই। হয় তাকে সোর্ন- এর হাতে মরতে হবে, নয়তো মরতে হবে আমাদের আদালতের হাতে।’ বলল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
‘ঈশ্বরের কথা ভুলে যেও না বাবা। তার ন্যায়দণ্ড সর্বব্যাপী। তিনি যা ইচ্ছা করেন আর সেটাই হয়। চোখ মুছে বলল ইভা হেরাল্ড।
‘ঈশ্বরকে ভুলবো কেন মা, আমরা তার সাহায্য চাই।’ বলল চতুর্থ হেরাল্ড।
‘তার সাহায্য চাইলে তার ন্যায়দণ্ড হাতে নিতে হবে।’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘ঠিক মা, কিন্তু আমরা কত দুর্বল সেটা তিনি জানেন।’ বলল চতুর্থ হেরাল্ড।
ইভা হেরাল্ড কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার মা রানী এলিজাবেথ আন্না তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘মা ইভা, তুমি ভিতরে ভিতরে এত বড় রাজনীতিক ও ধর্মবেত্তা হয়ে উঠেছ আজ বুঝলাম। থাক, বাপ বেটির লড়াই এখন আর নয়। ঈশ্বরের হাতে সব ছেড়ে দিয়ে চল আমরা নাস্তার টেবিলে যাই। ইভা মা, তুমি তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাস্তার টেবিলে এসো।’
বলে উঠে দাঁড়াল রানী এলিজাবেথ আন্না।
উঠে দাঁড়াল ইভা হেরাল্ড। বলল, ‘বাব্রা আসি।’
রাজা চতুর্থ হেরাল্ড আবার সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে। বলল, ‘মা ইভা, আমাদের রাজবংশে কোনো মেয়ের হাতে রাজদন্ড ওঠেনি। তুমি বোধ হয় তার যোগ্য হয়ে উঠছ। আমি খুব খুশি হয়েছি মা। আরেকটা কথা মা, তোমার মন যা চাইছে, আমাদের মনও তাই চাইছে। ছেলেটা খুব ভালো, আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ মা। কিন্তু মা, আমি তো শুধু তোমার বাবা নই, আমি তো দেশের রাজা। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব আমার হাতে। তোমার বাবা এখানে অসহায় মা।’ থামল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
শেষে তার কথাগুলো নরম ভারী হয়ে উঠেছিল।
ইভা হেরাল্ড তাকিয়ে ছিল তার বাবার দিকে। তার চোখে-মুখে করুণ বেদনার একটা ছায়া নামল।
সে এগিয়ে এসে বসল পিতার পাশে। বলল, ‘বাবা একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’
পিতা চতুর্থ হেরাল্ড মেয়ের পিঠে হাত রেখে বলল, ‘অবশ্যই মা।’
‘সাগর সাইমুম নামে সত্যিই কি কিছু আছে বাবা? এই ছোট্ট দ্বীপে এই রকম কিছু কোথায় থাকবে? সাগর সাইমুমের নামে কর্নেল ওসামাকে বড় আসামি সাজানো হয়নি তো?’ বলল নরম কণ্ঠে ইভা হেরাল্ড।
‘না মা, সাগর সাইমুম সত্য। তবে আমরা এখনো তাদের কোনো ঘাঁটি খুঁজে পাইনি। শুধুমাত্র দুজন কর্মীকে ধরা গেছে, কিন্তু তারা মরে গেছে, কিন্তু মুখ খোলেনি। মাত্র গতকাল আমাদের গোয়েন্দা মনিটারিং ব্যুরো থেকে এই রিপোর্ট পেয়েছি। অবাক হয়েছি রিপোর্টটি পড়ে। বলে রাজা চতুর্থ হেরাল্ড পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে ইভা হেরাল্ডের হাতে দিল।
ইভা হেরাল্ড দ্রুত কাগজে চোখ বুলাল। পড়ে যেটা জানলো সেটা হলো দুইটি ওয়ারলেস কোডের আরবি কথোপকথনে ভিক্টর আইল্যান্ডে ছদ্মনামে বিশটি সাগর সাইমুম ঘাঁটি অপারেট করার কথা বলা হয়েছে। চার ডিজিটের ওয়ারলেস কোড থেকে আট ডিজিটের সাগর সাইমুম বিষয়ে সাংকেতিক ভাষায় অনেক তথ্য প্রেরণ করা হয়েছে। আট ডিজিটের ওয়ারলেস কোডটি এশিয়ার কোনো একটি দেশের হবে। তার মানে সাগর সাইমুমের সাথে বাইরের খুব বড় রকমের যোগসাজস আছে। সমস্যা দাঁড়িয়েছে ভিক্টর আইল্যান্ডে সক্রিয় চার ডিজিটের ওয়ারলেস কোড চ্যানেলে কথা বলে কোনো জবাব পাওয়া যায় না। তবে কথাগুলো শুধু রেকর্ড হয়েছে, সেখান থেকে এই ইনফরমেশনটুকু পাওয়া গেছে। চার ডিজিট কোডের ওয়ারলেসটির লোকেশনও আইডেন্টিফাই করা যায়নি। এটা একদম লেটেস্ট প্রযুক্তির ওয়্যারলেস। এই ওয়ারলেসের কমিউনিকেশন সবসময় মনিটরিং-এ ধরা পড়ে না। ওয়েভলেনথ সংশ্লিষ্ট বিশেষ প্রযুক্তির কারণে হঠাৎ মনিটরিং-এর আওতায় আসে। ওয়ারলেসের এই প্রযুক্তিটি আমাদের রাষ্ট্রে এখনো পুরোপুরি আসেনি। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় দিক হলো, এর কনট্যাক্টে আসা সব কোড, সব নাম্বার, সব চ্যানেলের লোকেশন সে আইডেন্টিফাই করতে পারে, কিন্তু তার লোকেশন কেউ আইডেন্টিফাই করতে পারে না।
ইভা হেরাল্ড চার ডিজিট এবং আট ডিজিট-এর ওয়ারলেস কোড ভালো করে দেখে নিয়ে তাকাল পিতার দিকে। বলল, ‘হ্যাঁ বাবা, এটা যদি সাগর সাইমুমের ওয়ারলেস হয়, তাহলে দেখছি ওরা কমিউনিকেশনের সবচেয়ে মডার্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
‘মা, এজন্যে তোমাকে দেখতে দিলাম যে তারা দেখ কতটা এগিয়েছে। যাদের কমিউনিকেশন প্রযুক্তি এত উন্নত তাদের সংগঠন তাহলে কেমন হবে। চিন্তা করতে পার, এই ছোট্ট দ্বীপে তাদের বিশটি ঘাঁটি কাজ করছে! তারা কতটা সংগঠিত এ থেকে বোঝা যায়। এই রিপোর্ট পাওয়ার আগে আমার কল্পনাতেও ছিল না যে তারা এতটা এগিয়েছে।’ বলল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
মনটা হেসে উঠলো- ইভা হেরাল্ডের। কিন্তু মুখে গাম্ভীর্য টেনে বলল, ‘এদের বৈরী না করে বাবা, এদের সাথে নিলে ভালো করতে।’
‘মা, তুমি একটু আগেও বলেছ এই কথা। কিন্তু এটা সম্ভব নয়। যাদের আমরা পথে বসিয়েছি, তারা আমাদের পথে বসাতে চাইবে, এটাই বাস্তবতা। বলল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
‘বাবা তুমি এক’শ বছর আগের কথা বলছো এক’শ বছরে অনেক কিছু বদলে যায়। ইভা হেরাল্ড বলল।
‘ইতিহাস বদলায় না মা। ইতিহাস এমন একটা কালের পাতা যা চিরদিন জ্বলজ্বল করে জ্বলেই থাকে।’ বলল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
ইতিহাস বদলায় না বাবা, কিন্তু ইতিহাসের নতুন পাত্র-পাত্রীরা বদলায়। ইভা হেরাল্ড বলল।
রাজা চতুর্থ হেরাল্ড উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘ঠিক বলেছ মা। তোমার শুভকামনা সত্যি হলে খুশিই হতাম। কিন্তু তা হচ্ছে না।’
ইভা হেরাল্ড কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার বাবা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘আর কথা নয়। চল। তোমার মাকে আবার ফিরে আসতে হলে অনর্থ বাধাবে।’
ইভা হেরাল্ড উঠে দাঁড়িয়েছিল। হাঁটতে হাঁটতে বলল, মা’র অনর্থ বাধানো কিন্তু বাবা অর্থের স্বার্থেই।
‘জোরে বলো না মা। তোমার মা শুনলে তার অনর্থের পরিসর আরো বাড়বে। তাতে আমার বিপদ।’ বলল রাজা চতুর্থ হেরাল্ড।
মুখটিপে হাসলো ইভা হেরাল্ড।
দুজনেই বেরিয়ে এলো ঘর থেকে।
নাস্তার পর বাবা রাজা চতুর্থ হেরাল্ড, তার কক্ষের দিকে চলে গেলে ইভা হেরাল্ড তার ভাই হ্যানস ফেয়ারহেয়ার হেরাল্ডকে বলল, ‘ভাইয়া, তুমি কি আমাকে একটু সময় দেবে?’
‘ঠিক আছে, তুমি যাও। আমি মার সাথে কয়েকটা কথা বলে আসছি।’ বলল হ্যানস ফেয়ারহেয়ার হেরাল্ড।
‘হ্যাঁ, এসো আমি গেলাম। ইভা হেরাল্ড বলল।
ঘরে ফিরে ইভা হেরাল্ড তাড়াতাড়ি নিজের হ্যান্ড ব্যাগ থেকে নোটপ্যাড বের করে বাবার গোয়েন্দা রিপোর্টে সাগর সাইমুমের যে চার ডিজিটের এবং আট ডিজিটের ওয়ারলেস কোড পেয়েছে তা নোট করল।
ঘর থেকে বেরিয়ে এলো ইভা হেরাল্ড তার ড্রইং রুমে।
সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল তার ভাইয়ার জন্যে।
অলস অবস্থার সুযোগে চিন্তার মিছিল এসে ভিড় জমাল ইভা হেরাল্ডের মাথায়। হঠাৎ কর্নেল ওসামার মুখটা অন্তর জোড়া রূপ নিয়ে তার মনে ভেসে উঠলো। দেহ জুড়ে এক অশরীরী ছোঁয়ায় কেঁপে উঠল ইভা হেরাল্ড। তার সাথে সাথে হৃদয়ে নামল বেদনার প্লাবন। বাবা তো ফাইনাল কথা বলে দিয়েছেন। কর্নেল ওসামাকে সোর্ন-এর হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। কি করবে সে! সে জীবন বিপন্ন করে বাঁচিয়েছে তাকে। কর্নেল ওসামার এই পরিণতির কথা তার লোকরাও জানতে পারবে না। তাদের আগাম জানাতে পারলে তারা হয়তো কিছু করতে পারত। কিন্তু তাদের পাবে কোথায়, কিভাবে? বাবার কাছ থেকে পাওয়া ওয়ারলেস কোড কি কোনো কাজে আসবে?
এ সময় ড্রয়িং রুমের দরজায় নক হলো। চিন্তায় ছেদ নামল ইভা হেরাল্ডের।
‘নিশ্চয়ই ভাইয়া এসেছে। মনের এই স্বগোতোক্তির সাথে উঠে দাঁড়াল ইভা হেরাল্ড।
দরজা খুলে দিলে ভাইয়া হ্যানসসহ আবার প্রবেশ করল ড্রয়িংরুমে।
দুজনেই বসল।
বসেই হ্যানস বলে উঠল, ‘বাবার কাছে গিয়েছিলে, বাবাকে নরম করতে পেরেছো?’
‘নরম করতে পেরেছি। কিন্তু সিদ্ধান্ত পাল্টাতে পারিনি।’ বলল ইভা হেরাল্ড। তার মুখ শুকনো ও বিষণ্ণ।
‘তাহলে নরম হলেন কি করে?’ হ্যানস বলল।
‘শেষে তিনি বলেছেন, আমি যেটা চাই, বাবা হিসেবে তিনিও সেটা চান। কর্নেল ওসামা ছেলেটা ভালো, তিনি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু তিনি শুধু বাবা নন, দেশের রাজা, দেশের প্রেসিডেন্টও। বারা হিসেবে যেটা তিনি চান, রাজা হিসেবে তা তিনি চাইতে পারছেন না। সবার সাথে তিনি রাজা হিসেবে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্রের স্বার্থেই আমাকেসহ সবাইকে তা মানতে হবে। বাবা হিসেবে তিনি এখানে অসহায়।’ বলল ইভা হেরাল্ড। কান্না মিশ্রিত ভারি কন্ঠ তার।
হ্যানস ছোট বোনের পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘বাবা ঠিক বলেছেন। রাষ্ট্রের স্বার্থ তাঁকেই বেশি দেখতে হবে। সোর্ন নাজী বর্ণবাদীদের আন্তর্জাতিক সংগঠন। ওরা যেমন সন্ত্রাসী, হিংস্র, তেমনি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী। ভিক্টর আইল্যান্ডের মতো ছোট রাষ্ট্র তাদের সাথে সংঘাতে জড়াতে পারে না।
‘বাবাও এই কথাই বলেছেন। কিন্তু ওসামার কি হবে। কি করবো তার জন্য!’ বলতে বলতে কেঁদে ফেলল ইভা হেরাল্ড। তার দুই গন্ড বেয়ে নামল অশ্রুর ধারা।
বড় ভাই হ্যানস ফেয়ারহেয়ার হেরাল্ডের মুখও বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। একমাত্র ছোট বোনটি বাপ-মায়ের কাছে যেমন, তেমনি তার কাছে নয়নের মণি। খুব ভালোবাসে বোনটাকে। তেমনি সে আবার কর্নেল ওসামারও ফ্যান। সেনাবাহিনীতে কর্নেল ওসামার ব্রিলিয়ান্ট রেকর্ড-এর কারণে হ্যানস-এর কাছে সে একজন ‘আইডল’ হয়ে আছে।
‘কেঁদো না ইভা। তার জন্যে কিছু করতে হবে।’ বলল হ্যানস।
দ্রুত মুখ তুলে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিছু করা যাবে ভাইয়া? কি করা যাবে?’
‘আমি শুনেছি আদালত থেকে বেল নিয়ে কর্নেল ওসামাকে ছেড়ে দেয়া হবে। তারপর সোর্ন তাকে ধরে নিয়ে যাবে। বেল নিয়ে তাকে ছেড়ে দেবার পর এবং সোর্ন-এর লোকরা তাকে ধরার আগের সময়টুকু ব্যবহার করে কর্নেল ওসামাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করা, যাতে সে পালিয়ে যেতে পারে অথবা সাগর সাইমুমের কাছে খবরটা পৌঁছানো যাতে ওই সময় সাগর সাইমুম তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে পারে।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
চোখ মুছে লাফ দিয়ে উঠে ইভা হেরাল্ড বলল, ‘ঠিক বলেছ ভাইয়া। এ সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাকে মুক্ত করার এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।’
‘কিন্তু বোন, তাকে মুক্ত করবে কে? একা তার পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়। সরকারি বাহিনী তাকে ছেড়ে দিয়ে খালাস। তারা তাকে সাহায্য করবে না। তুমি আর আমিও পারবো না। তাহলে কে মুক্ত করবে! এটা পারবে সাগর সাইমুম। কিন্তু তারা তো এ ব্যাপারে কিছুই জানে না। তাদেরকে জানানোর কোনো উপায় তো আমাদের হাতে নেই। তাদের কাউকেই তো আমরা চিনি না, জানি না।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
ভাবছিল ইভা হেরাল্ড। বলল, ‘ভাইয়া একটা সুযোগ আছে। কিন্তু জানি না সুযোগটা কতখানি কাজ দেবে।’
‘কি সুযোগ? বল।’ উদগ্রীব কণ্ঠে বলল হ্যানস হেরাল্ড।
ইভা হেরাল্ড চার ও আট ডিজিটের কোড়ের কথা বলল। আরো জানাল যে, সাইমুমের এই ওয়্যারলেস কোড আমাদের গোয়েন্দা বিভাগের মনিটরিং এ হঠাৎ ধরা পড়েছে। সাগর সাইমুম কতটা উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করে, সেটা বুঝবার জন্য বাবা একটা গোয়েন্দা রিপোর্ট আমাকে দেখতে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে আমি সাইমুমের ওয়ারলেসের কোড দুটি পেয়েছি।’
হ্যানস হেরাল্ড ইভা হেরাল্ডের কথা শোনার সাথে সাথে সোৎসাহে হাততালি দিয়ে বলল, ‘কেল্লা ফতেহ। তুমি মোক্ষম জিনিস পেয়ে গেছ। কোথায় তোমার সেই কোড নাম্বার দেখি।’
‘আনছি ভাইয়া। কিন্তু বাবা বলল, ওদের ওয়ারলেস খুবই অত্যাধুনিক। কিছু জটিলতা আছে।’ বলল ইভা হেরাল্ড।
‘যত অত্যাধুনিক হোক, যতই জটিলতা থাকুক, আমার কাছে সব নস্যি। হ্যানস হেরাল্ড বলল।
‘হ্যাঁ, ইলেট্রনিক কমিউনিকেশন তো তোমার একটা সাবজেক্ট। টেনশনে ভুলেই গিয়েছিলাম। যাচ্ছি ভাইয়া, নিয়ে আসি।
বলে ইভা চলে গেল তার শোবার ঘরে।
আধা মিনিটের মধ্যেই কাগজে লেখা কোডটি তার ভাইয়াকে দিল।
ওয়ারলেস কোড দুটির উপর চোখ বুলিয়েই জোরে একটা অট্টহাসি দিয়ে বলল, ‘কোনো জটিলতা নেই ইভা। এই ওয়ারলেস প্রযুক্তি আমাদের দেশসহ অনেক দেশেই নেই। কিন্তু এই প্রযুক্তিতে নতুন কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ও ফাংশান আছে, কিন্তু কোনো জটিলতা নেই। আমি জার্মানীতে এই প্রযুক্তির ওয়ারলেস দেখেছি। আমার ওয়ারলেস দিয়ে এই কোডে সহজে মেসেজ পাঠানো যাবে এবং কথাও বলা যাবে।’
খুশিতে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল ইভা হেরাল্ডের। বলল, ‘ঈশ্বরকে অশেষ ধন্যবাদ কিন্তু সাগর সাইমুমের ওয়ারলেসের ভাষা নাকি আরবি।’
‘চিন্তার কারণ নেই, ইংরেজিসহ অন্য কিছু ভাষার অপশনও তাতে আছে।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
‘থ্যাংকস গড। তাহলে এখন কি করণীয় ভাইয়া?’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘আজ রাতেই ওদের সাথে যোগাযোগ করব। প্রথমে তোমার নামে সব জানিয়ে মেসেজ পাঠাব। তারপর তুমি ওদের সাথে কথা বলবে।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
‘আমাকে কি চিনবে ওরা?’ ইভা হেরাল্ড বলল।
‘তোমাকে কর্নেল ওসামা উদ্ধার করেছিলেন সোর্ন-এর সন্ত্রাসীদের হাত থেকে। তখন সোর্ন-এর চারজন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছিল- এ রিপোর্ট দলের কাছে তাকে অবশ্যই দিতে হয়েছে। এটাই এই ধরনের সংগঠনের নিয়ম। দেখবে তারা খুশি হবে তোমার ওয়ারলেস পেয়ে।’ বলল হ্যানস হেরাল্ড।
কথা শেষ করেই উঠে দাঁড়াল হ্যানস হেরাল্ড। বলল, ‘বাইরে আমার জরুরি কিছু কাজ আছে। রাত আটটার আগে ফিরতে পারব না। চিন্তা করিস না। আজই আমরা ওদের সাথে যোগাযোগ করব।’
‘ধন্যবাদ ভাইয়া।’ বলে ইভা হেরাল্ড উঠে দাঁড়াল।
শান্তির দ্বীপে সংঘাত – ৭
৭
ভিক্টর আইল্যান্ডের জলসীমার অনেক ভিতরে। দুই মাইলের মতো পশ্চিমে দাঁড়ানো জাহাজ থেকে একটা বড় ধরনের বোট নেমে এলো। তার সাথে নেমে এলো কালো পোশাক পরা দুজন আরোহী। দুজনের একজন আহমদ মুসা, দ্বিতীয়জন নৌকমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী।
বোটটি নৌবাহিনীর।
বোটের মাঝখানে দুই লেয়ারের একটা মঞ্চে দুইটি কামান সাজানো।
বোটের ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী।
তার পেছনের সিটে বসেছে আহমদ মুসা।
স্টার্ট নিল বোট।
নিকষ অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে চলল বোটটি।
বোটের সব আলোই নিভানো।
আহমদ মুসা এবং কমান্ডার আলী দুজনের চোখেই নাইট ভিউ গগলস। বোটের কম্পাসের লাল-ইন্ডিকেটর ভিক্টর, আইল্যান্ডের দিকে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে।.
কম্পাসের ইন্ডিকেটর এবং বোটের মাথা এক প্যারালালে।
বোটের সামনে অন্ধকারের কালো দেয়াল ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
নাইট ভিউ গগলস-এর দৃষ্টিসীমা খুব বেশি নয়।
‘স্যার, আমাদের বোট এখন সুবর্ণ দ্বীপের মাঝ বরাবর চলছে। সুবর্ণ দ্বীপের এই অবস্থান থেকে রাজধানী দুই দিক থেকেই সমান দূরত্বে।’ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে ড্রাইভিং সিট থেকে বলল কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী।
‘রাজধানী সুবর্ণ নগরীর সবচেয়ে কাছের ঘাঁটি তোমাদের কোনটা?’ বলল আহমদ মুসা।
‘জেবেল আল কবির থেকে বের হওয়া তালিয়া নদীর একেবারে মোহনার কাছে ছোট একটা পাহাড় আছে। পাহাড়ের পশ্চিম প্রান্তের প্রশস্ত সমতল তট নদীর গা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে পর্যটন বোটকেন্দ্র অবস্থিত। তার সাথে আছে কিছু দোকানপাট। বোটকেন্দ্রের বোট কোম্পানি, বোট চালক, দোকানদার সব আমাদের লোক। বোটকেন্দ্রের পেছনে যে জনবসতি সেটাও আমাদের। এটাই রাজধানীর সবচেয়ে কাছে।’ কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী বলল।
‘তাহলে বোট সেখানেই নিয়ে যাও। কিন্তু ঘাঁটিতে আমি উঠব না। বোট কেন্দ্রের আশেপাশে পর্যটকদের জন্য বাংলো বা বাড়ি আছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আছে স্যার, নদীরে ধার ঘেঁষে এরকম অনেক ভিলা আছে।’ কমান্ডার আব্দুল্লাহ্ আলী বলল।
‘আচ্ছা আব্দুল্লাহ আলী, কর্নেল ওসামার জামিন দেয়ার ডেট কি পাওয়া গেছে?’
‘না, সম্ভবত এখনো ডেট হয়নি। আজকের খবর এখনো দেয়া হয়নি।’ কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী বলল।
‘প্রতিদিনের ডেভলপমেন্ট কি তোমাকে জানানো হয়?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘নতুন খবর বা তথ্য থাকলে জানানো হয়।’ কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী বলল।
‘কার কাছ থেকে এত বিস্তারিত সহযোগিতা তোমরা পাচ্ছ?’ বলল আহমদ মুসা।
‘কর্নেল ওসামা ওবায়দুল্লাহ সোর্ন-সন্ত্রাসীদের হাত থেকে যে মেয়েটাকে বাঁচিয়েছিল, সেই মেয়েটাই এই সাহায্য করছে। একবার আপনাকে এই মেয়েটার কথা বলেছিলাম। সে এই দ্বীপের প্রেসিডেন্ট বা রাজার মেয়ে ইভা হেরাল্ড। সে বাপের একমাত্র মেয়ে। শুনেছি খুবই বুদ্ধিমতি এবং উদারমনা।’ কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী বলল।
‘আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর সাহায্য এভাবেই আসে। সে সত্যিই অত্যন্ত মূল্যবান সাহায্য করছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘স্যার, সে মেসেজ করে এবং পরে ওয়ারলেসে কল দিয়ে না জানালে আমরা জানতেই পারতামনা যে, কর্নেল ওসামা কোথায় এবং তাকে নিয়ে তারা এত বড় মরাত্মক পরিকল্পনা করছে। তারপর থেকে সে নিয়মিতই আমাদের ব্রিফ করে যাচ্ছে।’
‘এটা আল্লাহর খাস রহমত। সে প্রেসিডেন্টের মেয়ে হওয়ার কারণেই ওয়ারলেস সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা পাচ্ছে।’
একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার বলে উঠল, ‘আচ্ছা আব্দুল্লাহ আলী, তুমি ইভা হেরাল্ডের বাবাকে একবার প্রেসিডেন্ট বলেছ, এর আগে রাজাও বলেছ, ব্যাপার কি?’
হাসল কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী। বলল, ‘তিনি নিজের পার্লামেন্টসহ নিজের লোকদের কাছে রাজা চতুর্থ হেরাল্ড, অন্যদের কাছে প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের যে মহড়া হয়, তাতে তিনি নির্বাচিত বলে সাধারণের কাছে প্রেসিডেন্ট।
হাসল আহমদ মুসাও। বলল, ‘আসলে তিনি রাজাই।’
এই সময় বোট ডান দিকে বড় একটা টার্ন নিল।
‘স্যার, আমরা ঘুরে দক্ষিণ উপকূলের দিকে যাচ্ছি।’ বলল কমান্ডার আব্দুল্লাহ আলী।
আহমদ মুসা কোনো জবাব দিল না।
কারণ তার চোখে তখন নাইট ভিউ গগলস ছিল না।
আহমদ মুসার দৃষ্টি সামনের অন্ধকারে নিবদ্ধ।
বাম চোখ ঘুরিয়ে আহমদ মুসা তাকাল পুবের নিকষ অন্ধকারের দিকে। ঐ অন্ধকারেই তো লুকিয়ে আছে সুবর্ণ দ্বীপ, দখলদারদের ভিক্টর আইল্যান্ড। যে অন্যায় এবং আগ্রাসন বয়ে নিয়ে এসেছে মানুষের জীবনে শতাব্দীর দীর্ঘ অভিশাপ। রক্তস্নাত ঐ দ্বীপের জন-জীবনে কবে ‘ আসবে শান্তির সুবাতাস, কবে মুক্ত হবে মানুষ অভিশাপের কালো কবল থেকে! এর মাঝেও আহমদ মুসার মন খুশিতে ভরে গেল। শত্রুর শীর্ষ ঘর থেকে আল্লাহর সাহায্য আসা শুরু হয়েছে। আল্লাহর সাহায্যই তাদের সম্বল। অপার্থিব এক প্রশান্তির হৃদয় উপচানো স্নিগ্ধ পরশ নামল তার হৃদয় জুড়ে। শান্তিতে চোখ দু’টি তার বুজে আসতে চাইল।
চেয়ারে গা এলিয়ে দিল আহমদ মুসা।
বোটটি আবার টার্ন নিয়েছে পুর্ব দিকে।
ছুটে চলেছে বোটটি তালিয়া নদীর উদ্দেশ্যে।
***